kalerkantho

শুক্রবার । ৪ আষাঢ় ১৪২৮। ১৮ জুন ২০২১। ৬ জিলকদ ১৪৪২

নির্বিচারে গাছ কাটায় উজাড় হচ্ছে বন

অস্তিত্বসংকটে রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য

জাহাঙ্গীর আলম, চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ)   

১০ মে, ২০২১ ১৯:২৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অস্তিত্বসংকটে রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য

সুন্দরবনের পর দেশের বৃহত্তম প্রাকৃতিক বনভূমি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা অভ্যয়ারণ্য। এটি একটি শুকনো ও মিশ্র চিরহরিৎ বন। এই বন জীব ও উদ্ভিদবৈচিত্র্যে দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ এলাকা। ১৭৯৫.৫৮ হেক্টর আয়তনের এই বনভূমি থেকে প্রতিদিন উজাড় হচ্ছে মহামূল্যবান সব গাছ। বনের গাছ কেটে অবৈধভাবে কৃষি জমি বৃদ্ধি করছে এক শ্রেণির বন মজুর। বন বিভাগ দ্বারা কালেঙ্গা রেঞ্জের সামাজিক বনায়নের খাড়া গাছ টেন্ডারের মাধ্যমে  বিক্রি করার ফলে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে রেমা-কালেঙ্গা অভায়ারণ্য।

জানা যায়, কালেঙ্গা রেঞ্জ চারটি বিটে বিভক্ত। কলেঙ্গা, ছনবাড়ি, রশিদপুর ও রেমা বিট। নির্বিচারে গাছ কাটায় ইতিমধ্যে রশিদপুর বিট বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে। বাকি বিটের বনও হুমকির মুখে। এ অবস্থায় বনের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে।

সাম্প্রতিক এক জরিপে জানা যায়, ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, সাত প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা রেমা কালেঙ্গাকে সাজিয়ে তুলেছে। দেশের সবচয়ে বড় বন সুন্দরবনের উদ্ভিদবৈচিত্র্য মাত্র ৩৩০ প্রজাতিতে সীমাবদ্ধ। এখানকার বানরজাতীয় প্রাণির বৈচিত্র্য এ বনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য । বনের ছনবাড়ি, রেমা, কালেঙ্গার কিছু অংশে গেলেই রেসাস বানর, কুলু বানর, লাজুক বানর, চশমা হনুমান ও লালচে হনুমানের দেখা মেলে। আছে আন্তর্জাতিকভাবে বিপন্ন পাখি লালমাথা ট্রগন। রাজ ধনেশ, বিপন্ন স্তন্যপায়ীদের মধ্যে কাঁকড়াখেকো বেজি, কাঠবিড়ালী দেখা যায়।

বনে প্রবেশ করলেই চোখে আটকে যায়, এক-দেড় শ বছরের পুরনো প্রাকৃতিক মহীরুহ চাপালিশ, গর্জন, বনাক, জারুল, লাল আওয়াল, পাহাড়ি আওয়াল, লোহা, হারগাজা, বট, শ্যাউড়া, ডুমুর, গামাড়ি, বৈলাম, বনমালি, শাল ও সেগুনগাছ। আছে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে লাগানো সেগুন, আগর, বহেড়া, কাঁঠাল, মেহগনি, আমলকী। কিন্তু চোরদের হাত থেকে কোনো গাছই রেহাই পাচ্ছে না। বনের আশপাশের গ্রামের লোকজন জানান, প্রতি রাতেই বনের কোনো না কোনো অংশে কাটা হচ্ছে গাছ। এতে বৃক্ষসমৃদ্ধ এ বন লতা-ঝোপের জঙ্গল হতে চলেছে।

গত ২৪ এপ্রিল কালেঙ্গা রেঞ্জ অফিসের আধা কিলোমিটারের মধ্যে কালেঙ্গা বিটের তালতলা টিলা থেকে শতবর্ষী ১১টি গাছ কেটে ফেলেছে গাছ চোরেরা। এর মধ্যে পাহাড়ি মেহগনি ৫টি ও ৬টি ডাগি জামগাছ। বন বিভাগের লোকজন কাটা গাছগুলোর কিছু অংশ উদ্ধার করতে পারলেও চোরেরা বেশির ভাগ গাছই পাচার করে ফেলেছে। এ বিষয়টি নিয়ে সিলেট বন বিভাগে তোলপাড় চলছে।

অভিযোগ উঠেছে, কালেঙ্গা বিট অফিসার এ গাছগুলো শ্রীমঙ্গলের এক মহালদারের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। বন বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কাটা গাছের কিছু অংশ জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হলেও কোনো আসামি ধরা পড়েনি। কালেঙ্গা বিট থেকে প্রতিদিনই পাচার হচ্ছে সেগুনগাছ। অভিাযোগ আছে, শ্যামাপদ মিশ্র কালেঙ্গা বিট অফিসে যোগদানের পর থেইে এ বিটে বেড়ে গেছে গাছ পাচার।

কালেঙ্গা বিট অফিসার শ্যামাপদ মিশ্র বলেন, ১৯ এপ্রিল বিকেল চারটায় তিনি খবর পান গাছ কাটছে চোররা। খবর পেয়ে তিনি রেঞ্জ অফিসারকে নিয়ে ঘটনা স্থলে এলে চোররা পলিয়ে যায়। এ ঘটনায় ১৯ এপ্রিলই মামলা হয়েছে।

সম্প্রতি বন বিভাগ কালেঙ্গা ফরেস্ট এলাকায় সামাজিক বনায়নের খাড়াগাছ লডের মাধ্যমে মহালদারদের কাছে বিক্রি করেছে। অভিযোগ আছে, মহালদারদের সাথে আঁতাত করে বনের পুরাতন মা গাছগুলো পাচার করছে এক শ্রেণির অসাধু বনকর্মী।

কালেঙ্গা রেঞ্জ কর্মকর্তা খলিলুর রহমান বলেন, গাছ পাচারের সাথে বনবিভাগের লোক জড়িত এমন অভিযোগ সত্য নয়। কালেঙ্গা বিটে ১১টি গাছ কাটার ঘটনায় মামলা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কিছু অসাধু বনবিভাগের লোক, বনবিভাগ দ্ধারা লালিত ভিলেজার (চুক্তি ভিত্তিক বনপ্রহরী) স্থানীয় প্রভাবশালী সরকার দলীয় লোকজন এবং জনপ্রতিনিধিরাই মূলত রেমা-কালেঙ্গা ধ্বংসের পেছনে দায়ী। তাদের সহযোগিতায়ই বছরের পর বছর ধরে প্রকাশ্যে চলছে গাছ পাচারের মহোৎসব। একসময় এই বনে ৫০০ প্রজাতির গাছ থাকলেও অব্যাহতভাবে গাছ কাটার কারণে এখন অনেক প্রজাতির গাছই বন থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে গাছপাচারের ইস্যুতে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্য আমাদের লোকবল কম।

বন পাহারা ও ব্যবস্থাপনার জন্য ফরেস্টে এলাকার আশপাশের গ্রামের লোক নিয়ে কো-ম্যানেজমেন্ট (সহব্যবস্থাপনা) কমিটি ছিল। কালেঙ্গা বন অফিসকে সহায়তা করার জন্য কামিটির সদ্যরা পালা করে রাতে বনরক্ষীদের সাথে টহলে বের হতো। তবে এখন এদের কাজ বন্ধ।

বন বিভাগের নেতৃত্বে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, স্থানীয় প্রশাসন, সাংবাদিক, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বন ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের নিয়ে ৫৫ সদস্যের একটি নির্বাহী কমিটি আছে। তারা ২২ সদস্যের একটি কার্যকরী কমিটি তিন বছরের জন্য গঠন করে দেন। এদের দায়িত্ব প্রতি মাসে বনের অবস্থা পর্যালোচনা করে উন্নয়নের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ৫ বছর ধরে চুনারুঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আকবর হোসেন জিতু রেমা-কালেঙ্গা  সহব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে আছেন। এ কমিটির দায়িত্ব কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে নেই।

হবিগঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেন, সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। সামাজিক বনায়নের গাছ টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। বিক্রির টাকার ৪৫ ভাগ পাবে সরকার, ৪৫ ভাগ পাবে উপকারভোগী, ১০ ভাগ টাকা দিয়ে পুনরায় বাগান সৃজন করা হবে। সামাজিক বনায়নের গাছের সাথে সংরক্ষিত বনের গাছ পাচার কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বন বিভাগের লোকজন গাছপাচার রোধে শতভাগ আন্তরিক।

চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার সত্যজিত রায় দাস বলেন, রেমা-কালেঙ্গা সহব্যবস্থাপনা কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে আমি শুনেছি। লকডাউনের পর এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শত শত বছরে গড়ে ওঠা এ ধরনের বনভূমি যে খাদ্য-শৃঙ্খল তৈরি করে টিকে ছিল, তার অনেকটাই রেমা-কালেঙ্গা বনে ভেঙে পড়েছে। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে বনের বেশির ভাগ টিলা ন্যাড়া হয়ে যেতে পারে।

এলাকার লোকজন বলেন, রেমা-কালেঙ্গা বনে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ত নানা প্রজাতির বানর, কাঠবিড়ালী । শোনা যেত পাখির কিচিরমিচির শব্দ। গাছ কেটে ফেললে ভবিষ্যতে তো কাঠবিড়ালীরও দেখা পাব না।



সাতদিনের সেরা