kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

ইউটিউব দেখে মাচায় তরমুজের চাষ, উৎসাহী অন্য চাষিরাও

শেরপুর ও শাজাহানপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি   

৬ মে, ২০২১ ১৮:৪৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইউটিউব দেখে মাচায় তরমুজের চাষ, উৎসাহী অন্য চাষিরাও

আব্দুস সালাম পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক। তবুও শখের বসে মাচায় তরমুজ চাষ করেছেন। যা দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে মাচায় লাউ-কুমড়া ঝুলছে। কিন্তু কাছে গেলে দেখা মিলবে এক নতুন উদ্ভাবনের। ইউটিউব দেখে নতুন উদ্ভাবনে চাষ করা তরমুজ ফসলই এখন স্বপ্ন দেখাচ্ছে ওই স্কুল শিক্ষককে। তিনি ‘ব্লাক বেবি’ ও ‘ব্লাক কুইন’ এই দুই জাতের তরমুজ চাষ করে রীতিমতো এলাকায় সাড়াও ফেলেছেন। এই প্রথম বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের বড়াইদহ গ্রামে নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করে মৌসুমী ফল তরমুজ চাষ করা হয়েছে।

সরেজমিনে বড়াইদহ গ্রামে গেলে কথা হয় চাষি আব্দুস সালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিকল্প আয়ের সন্ধানে ইউটিউব দেখে মাচায় তরমুজ চাষের পদ্ধতি শিখে এবাই প্রথম ৮৬ শতক জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। তবে তার দেখাদেখি একইগ্রামের আরো তিনজন ব্যক্তি উদ্বুদ্ধ হয়ে এই ফসল চাষ করেছেন। ফলে মোট ছয় বিঘা জমিতে এই নতুন পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, তার ৮৬ শতক জমিতে তরমুজ চাষাবাদে খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। সব কিছু ঠিক থাকলে এই জমির তরমুজ চার লাখ টাকায় বিক্রি করা যাবে। বর্তমানে এসব জমির উৎপাদিত ফলের বয়স ৪৬ দিন পার হতে চলেছে। আর মাত্র দুই সপ্তাহ পরেই বাজারজাত শুরু হবে। তখন প্রতিটি তরমুজের ওজন হবে তিন থেকে চার কেজি। তাই বড় ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে বেশ লাভবান হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন সখের বসে তরমুজ চাষি আব্দুল সালাম।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মাসুদ আলম বলেন, নতুন জাতের ফসল চাষ হওয়ায় ওইসব চাষিদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখছি। সেই সঙ্গে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যাতে করে ওই ফসলি জমিতে রোগবালাই ধরতে না পারে। আর চাষিরাও যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

উপজেলা ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, শেরপুর উপজেলায় এই প্রথম মাচায় নতুন পদ্ধতিতে দুই হেক্টর জমিতে ব্লাক বেবি ও ব্লাক কুইন নামের দুই জাতের তরমুজ চাষ হয়েছে। তার দপ্তরের পক্ষ থেকে পরামর্শের পাশাপাশি সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে বেশ লাভবানও হবেন তারা। ফলে আগামীতে এই জাতের তরমুজ চাষ আরো বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে বগুড়ার শাজাহানপুরে উৎপাদিত বিদেশি জাতের তরমুজ স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সিন্ডিকেটের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে সহজলভ্য মূল্যে ক্রেতা সাধারনের হাতে পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছেন চাষিরা।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া, গোহাইল, মাদলা ও খোট্টাপাড়া ইউনিয়নের তিন একরের অধিক জমিতে বিদেশি জাতের গোল্ডেন ক্রাউন, মধু মিতা (হলুদ) ও ব্লাক কিং জাতের তরমুজ চাষ করা হয়েছে। মিষ্টি ও সুস্বাধু বেশী হওয়ায় এবং লাভজনক হওয়ায় এই জাতের তরমুজ চাষে দিন দিন কৃষকদের মাঝে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের বামুনিয়া চাঁদবাড়িয়া গ্রামের কৃষক মোকছেদ আলী জানান, তিনি তার বিশ শতাংশ জমিতে বিদেশি জাতের তরমুজ গোল্ডেন ক্রাউন, মধু মিতা (হলুদ), ব্লাক কিং চাষ করেছেন। জমি তৈরি থেকে শুরু করে বীজ বপন, সার, মাচা তৈরি, তরমুজের গায়ের জাল টানিয়ে দেওয়াসহ তার ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। জমিতে প্রায় ১ হাজার পিস তরমুজ পরিপক্ক হয়েছে। এই ফসল থেকে লক্ষাধিক টাকা লাভবান হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

একই এলাকার মিজানুর রহমান নামে এক যুবক জানান, গণমাধ্যমে জানতে পেরে আকৃষ্ট হয়ে উপজেলা কৃষি বিভাগের পরামর্শে তিনি ২০ শতক জমিতে প্রথমবারের মতো এই জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। বাজার সিন্ডিকেটের কারণে ক্রেতাদের বেশী দামে তরমুজ কিনতে হচ্ছে। অথচ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এই বিদেশি জাতের তরমুজ স্থানীয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

শাহজাহানপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে আলম জানান, তরমুজ এখন আর মৌসুমী ফল নয়। সারা বছরই তরমুজ চাষ করা যায়। এ অঞ্চলের মাটিতে এই বিদেশি জাতের তরমুজ সুমিষ্ট হয়। বপনের ৪০ দিনের মাথায় ফুল আসে। আর ফুল থেকে পরিপুষ্ট তরমুজ হতে সময় লাগে ৩০-৩৫ দিন। গাছের গোড়ায় পানি জমলে গাছে পচন ধরতে পারে। তাই একটু উঁচু জমিতে এই জাতের তরমুজ চাষের পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে নতুন পদ্ধতিতে মাচায় তরমুজ চাষ দেখতে প্রতিদিনই আশপাশের এলাকার কৃষকরা তার কাছে আসছেন। কীভাবে আগামীতে তারা নিজ নিজ জমিতে তরমুজ চাষ করবেন সে সম্পর্কে পরামর্শ নিচ্ছেন।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, সরকারি সহযোগিতা ও পরামর্শ পেলে এই পদ্ধতিতে তরমুজের চাষের বিস্তার ঘটবে। সেইসঙ্গে বেশি পরিমাণ জমিতে তরমুজের চাষ হলে এলাকার মানুষ কম দামে এই ফল খেতে পারবে। বাজারে তরমুজের ব্যাপক চাহিদা থাকায় কৃষকও লাভবান হবেন।



সাতদিনের সেরা