kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

একজন ‘মানবিক’ ইউএনও

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি   

৬ মে, ২০২১ ১৬:৩২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



একজন ‘মানবিক’ ইউএনও

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরীন চৌধুরী দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত। মঙ্গলবার (৫ মে) বিকেল ৪টার ঘটনা। হঠাৎ নিষ্পাপ চেহারা আর আদুরে একটি শিশু খালি পায়ে ইউএনওর কক্ষে প্রবেশ করে। শিশুর হাতে ছিল একটি ময়লা থলে। কক্ষে ঢুকেই সে ইউএনওর কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়। এতে অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন ইউএনও সাবরীন চৌধুরী। শিশুটির নাম শিহাব। 

কথা বলে জানতে পেরে সারা দিন অভুক্ত শিহাবের খাবারের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। দাপ্তরিক কাজ শেষে শিহাবকে নিয়ে ইউএনও বেরিয়ে পড়েছিলেন দক্ষিণ চরমোহনা ইউসুফ মেমোরিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায়। শিহাব বলেছিল সে স্কুলটির দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। 

ঈদের নতুন জামার লোভে শিহাব সবার কাছে টাকা চেয়েছে শুনে পথে গাড়ি থামিয়ে তার পছন্দমতো শার্ট-প্যান্ট ও এক জোড়া জুতা কিনে দিয়েছেন ইউএনও। অবশেষে শিহাবের মুখে শোনা স্কুলের সামনে পৌঁছল ইউএনওর গাড়ি। কিন্তু সেখানে কেউই শিহাবকে চেনে না। অনেক বোঝানোর পর শিহাব বলে ওঠে, তার বাড়ির নাম ‘বকুল হুজুরের বাড়ি/জিনাত আলী হুজুরের বাড়ি। সেখানকার লোকজন তখন ঠিকানাটি নিশ্চিত করে। সন্ধ্যার আগেই শিহাবের বাড়ি সদর উপজেলার দালালবাজার ইউনিয়নে উপস্থিত হন ইউএনও। মূলত শিহাবের বাড়ি রায়পুর নয়।

সেখানে গিয়ে ইউএনও জানতে পারেন- শিহাবের বাবা ছয়-সাতটি বিয়ে করেছে। অনেক আগেই তাদের ছেড়ে চলে গেছে। তার মা কোনোমতে মানুষের কাজ করে শিহাবকে নিয়ে বেঁচে আছে। কিন্তু ছেলে ভিক্ষা করুক এটি তার মা কখনো চায়নি। এর মধ্যেই তার মা ছেলেকে পাওয়া গেছে শুনে ছুটতে ছুটতে বাড়ি আসে। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ছেলের কর্মকাণ্ডে তিনি কাঁদতে থাকেন। এতে ইউএনওর মনও কেঁদে ওঠে। শিশুটির পুরো ঘটনাতে ইউএনওর মনে প্রশ্ন জেগেছে- এইটুকু শিশুর কাছে মাতৃমমতাপ্রবঞ্চিত হলো? এত ছোট বয়সে এতটা মিথ্যা সে কিভাবে রপ্ত করল? এত ছোট বয়সেই এতটা সাহসী সে কিভাবে হলো? এমন সব আবেগ আর প্রশ্নজড়িত শব্দ দিয়ে তৈরি বাক্যগুলো মঙ্গলবার (৫ মে) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ইউএনও তার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে পোস্ট করেছেন। 

ইউএনও সাবরীন চৌধুরীর পোস্ট থেকে নেওয়া আংশিক লেখা- ‘অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কার সঙ্গে এসেছ, এত ছোট বয়সে তুমি ভিক্ষাবৃত্তিতে কেন নেমেছ, কে শিখিয়ে দিয়েছে, বাবা-মা কোথায়, বাড়ি কোথায় ইত্যাদি। উত্তরে শিহাব জানাল, ‘সে একাই এসেছে, বাড়ি রাখালিয়া, বাবা নেই, মার নাম জানে না। খুব সকালে খেয়েছে, ক্ষুধা লেগেছে। শুনেই তাৎক্ষণিক তার খাবারের ব্যবস্থা করলাম।’ 

‘শিশুটিকে সামনে বসিয়ে হাতের কাজগুলো গুছানোর ফাঁকে মনে মনে চিন্তা করেছিলাম- ‘কেমন মা, কোলের শিশুটিকে এই পেশায় নামিয়েছে, কি এমন অবস্থা যে তাকে একলা ছেড়ে দিতে হলো। শিশুটির কোনো দুর্ঘটনাও ঘটতে পারত। খারাপ লোকের খপ্পরে পড়তে পারত। মা তো নিজেও আসতে পারত। এই শিশুটি বাড়ির ঠিকানা চেনে না, সে বাড়ি ফিরবে কিভাবে। আরো কত কি!’

‘সন্ধ্যায় শিহাব নিজ আঙিনায় পা রাখতেই আশপাশে তার সমবয়সী সব শিশু দৌড়ে এলো। সে-ও মহাখুশি, কিন্তু এদিকে তার ছোট ঘরটিতে তালা ঝুলছিল। তাতে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আশপাশের বাড়ির লোকজনকে ডাকা হলে মোটামুটি সবাই সাড়া দিল। এতক্ষণ পর্যন্ত শিশুটির জন্য একটা শঙ্কা, একটা কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু যখন জানতে পারলাম, শিশুটি আরো ছোট বয়স থেকেই এভাবে একা একা ভিক্ষা করতে বেরিয়ে যায়। বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে, কখনো চাঁদপুর, কখনো রামগতি চলে যায়। এর জন্য অনেক মারধর খেয়েছে তবুও সংশোধন হয়নি। বাবা ছয়-সাতটা বিয়ে করে এদের ফেলে রেখে চলে গিয়েছে। তার মা এদিক-সেদিক টুকটাক কাজ করে বেড়ায়, কিন্তু ছেলে ভিক্ষা করুক তা চায় না। বুঝলাম, পরিবার এবং পরিবেশ সত্যিকার অর্থেই একটি শিশুর বেড়ে ওঠার পেছনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে আল্লাহ যেন শিশুটিকে হেদায়েত করে মায়ের কষ্ট ও মমতাকে বোঝার বোধটুকু দান করে এ দোয়া করেন ইউএনও’।

ইউএনও সাবরীন চৌধুরী জানিয়েছেন, শিশুটিকে ভালো করে বুঝিয়েছি। তার মাকেও একটু সতর্কতা বাড়ানোর জন্য বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপহার খাদ্যসামগ্রী তার মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ভালো কোনো কিছুর ব্যবস্থা করে দিতে পারার আশায় তাদের ঠিকানা নিয়ে আসা হয়েছে।



সাতদিনের সেরা