kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ বৈশাখ ১৪২৮। ৭ মে ২০২১। ২৪ রমজান ১৪৪২

অর্থসংকটে লেখাপড়া অনিশ্চিত হতদরিদ্র মেধাবী মীমের

ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি   

২৭ এপ্রিল, ২০২১ ০৮:১১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অর্থসংকটে লেখাপড়া অনিশ্চিত হতদরিদ্র মেধাবী মীমের

বাবা-মায়ের সঙ্গে মাসুমা আক্তার মীম। ছবি: কালের কণ্ঠ

আর্থিক সংকট আর চরম দরিদ্রতায় দর্জি মিন্টু মিয়ার মেধাবী কন‍্যা মীমের পড়ালেখা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সে এখন নাগেশ্বরী সরকারি কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেলেও মীমের মুখে হাসি নেই। শঙ্কা আর উৎকণ্ঠায় দিন পার হচ্ছে তার। মীমের চোখে-মুখে বিষাদের ছায়া।

পড়ালেখা করে মীমের স্বপ্ন হচ্ছে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করা। কিন্তু চরম দরিদ্রতা আর অভাব-অনটনের মধ্যে সে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারবে কি না এ নিয়েই শঙ্কা পরিবারের। দরিদ্রতার চাপে পিষ্ট মীমের পরিবার এক বেলা খাবার জোগাড় করতেই যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে পড়ালেখার খরচ জোগাড় করবে কিভাবে? গত এক বছরে করোনার কারণে মীমের পরিবারের আয়-রোজগার একেবারে কমে যাওয়ায় আর্থিক সমস‍্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে।

ভুরুঙ্গামারী উপেজেলার আন্ধারীঝ্ড় ইউনিয়নের বামুনের কুঠি গ্রামের মেধাবী মুখ মাসুমা আক্তার মীম। চরম দরিদ্রতা আর বৈরী পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেড়ে উঠেছে সে। মায়ের কষ্ট আর বাবার ঘরে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছে। তার পরও হাল ছাড়েনি। অভাব তাকে দমাতে পারেনি। তার প্রমাণও দিয়েছে গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায়। জিপিএ-৫ পেয়ে এলাকার সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল মীম। কিন্তু আর্থিক সংকটে এখন পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

মীমের বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জন্মের পর থেকেই বাবা মাসুদুজ্জামান মিন্টু আর মা রাহেলা খাতুনের সঙ্গে মানুষের জমিতে ঘর তুলে থাকত। দুই বোনের মধ‍্যে মীম বড়। মীমের মা ন‍্যাশনাল সার্ভিসে চাকরি করে কিছু টাকা জমিয়েছিল আর বাবা রায়গঞ্জ বাজারে দর্জিগিরি করে যে আয় হতো তা দিয়েই চলে তাদের সংসার। এর মধ্যে তাদের মেয়ে বড় হতে থাকে। রাহেলা আর মিন্টুর স্বপ্নও বড় হয়। নিজেদের কথা না ভেবে মেয়ের লেখাপড়ার জন্য ত্যাগ স্বীকার করে যাচ্ছেন তারা।

মেয়েও দরিদ্রতা ও স্থানীয় সব বাধা-বিপত্তিকে পেছনে ফেলে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। মীম রায়গঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২০ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পান। সে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতেও বৃত্তি পেয়েছিল। মীমের উচ্চ শিক্ষা নিয়ে শঙ্কায় তার মা-বাবা। কারণ তাদের চিন্তা এখন মীমের উচ্চ মাধ্যমিক পাস করানো নিয়ে। তাতেও বাধ সেধেছে অর্থ আর দরিদ্রতা।

রাহেলা বেগম ও মিন্টু বলেন, 'আমরা গরিব তবুও স্বপ্ন দেখছি মীমকে নিয়ে। কিন্তু মীমের পড়ালেখা ও প্রাইভেট পড়ানোর খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছি। দর্জি পেশায় সামান‍্য আয় দিয়ে পরিবারের খাবারের খরচ জোগাতেই হিমশিম খেতে হয়, সেখানে দুই মেয়ের পড়ালেখার খরচ জোগাই কিভাবে? তার মধ‍্যে করোনা মহামারিতে লকডাউনের কারণে দোকানপাট বন্ধ থাকায় আমাদের সমস‍্যা আরো প্রকট হয়েছে। ঘর করার জায়গাটুকু ছাড়া আর কোনো জমি নাই আমাদের। এত দিন ছিলাম অন‍্যের জায়গায়। এখন নিজের সামান‍্য জমিতে একটি ঘর করে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছি।

মীমের পড়াশোনাও খুব ভালো। কিন্তু মীমকে নিয়ে ডাক্তার বানানো আমাদের এত বড় স্বপ্ন পূরণ করতে পারব কি না সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। এ কথা বলতেই তাদের দুচোখ বেয়ে অঝোর ধারায় ঝরতে থাকে অশ্রু। আমাদের বর্তমানে যে অবস্থা তাতে মীমের এইচএসসি পর্যন্ত পড়ানোই দুষ্কর হয়ে পড়েছে, তার মধ‍্যে এত বড় স্বপ্ন দেখছি, আল্লাহ জানেন আমাদের কপালে কী লেখা আছে?

রায়গঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) বলেন, 'মীম অনেক মেধাবী। কিন্তু তাদের থাকার ঘরও নেই বলা যায়। অনেক কষ্ট করে মেয়েকে স্কুলে পড়িয়েছে তার বাবা-মা। এসব কারণে মীমের কাছ থেকে কখনও স্কুলের বেতন ও পরীক্ষার ফি নেইনি। স্কুল কর্তৃপক্ষ ও আমরা শিক্ষকরা সব সময় মীমকে সহযোগিতা করতাম। মেয়েটি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশের মান রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।' ভবিষ্যতেও মীম যাতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বাবা-মায়ের দুঃখ ঘোচাতে পারে সে জন্য সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।



সাতদিনের সেরা