kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

এখানে একদিন নদী ছিল!

আছাদুজ্জামান খন্দকার, পাকুন্দিয়া (কিশোরগঞ্জ)   

২৬ এপ্রিল, ২০২১ ১৭:৪৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এখানে একদিন নদী ছিল!

‘আমায় ভাসাইলিরে, আমায় ডুবাইলিরে...অকুল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে। কুল নাই-কিনার নাই, নাইকো দরিয়ার পাড়ি। সাবধানে চালাইয়ো মাঝি আমার ভাঙা তরীরে...। অকুল দরিয়ার বুঝি কুল নাইরে---।’ নদীমাতৃক এ দেশে একসময় নদীকে ঘিরে এরকম অনেক গান লেখা হয়েছে এবং গাওয়াও হয়েছে। কিন্তু হৃদয় নিংড়ানো ওইসব গান এবং নদীর সেই গর্জন দুই-ই এখন কেবলই স্মৃতি। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে সেই ভাটিয়ালি গান আর নদীর সেই জৌলুস। বেশিরভাগ নদীরই এখন কুল আছে, কিনার আছে। নেই শুধু পানি আর ঢেউ। নদীর বুক চিড়ে আর আসা-যাওয়া করে না পাল তুলা নৌকা।

নদীর রূপ-যৌবন আজ আর কিছুই নেই। সব যেন হারিয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে পলি জমে নাব্যতা হারিয়ে পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। ঠিক তেমনি একটি নদীর নাম নরসুন্দা। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া এক সময়ের খরস্রোতা নদীটির পাকুন্দিয়ার অংশে এখন আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। কৃষকরা করছেন ধান চাষ।

জেলা কার্যালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন নদীর মধ্যে একটি নদী নরসুন্দা। এটি পার্শ্ববর্তী হোসেনপুর উপজেলার প্রবাহমান ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপন্ন হয়ে পাকুন্দিয়া উপজেলার চরকাওনা এলাকার মধ্য দিয়ে এসে পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে আরেকটি নদীর সৃষ্টি হয়েছে। এটিই নরসুন্দা। প্রায় ৬০কিলোমিটার দৈর্ঘ্য’র এ নদীটি কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ইটনা উপজেলার ধনু নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এই নদী থেকেই আবার পাকুন্দিয়া উপজেলার চরকাওনা এলাকা থেকে আরেকটি শাখা বের হয়ে জাঙালিয়া ও চরফরাদী ইউনিয়নের বুক চিড়ে চরকুর্শা গ্রামের টেকেরবাড়ির পাশ দিয়ে পাকুন্দিয়া উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে পড়েছে। প্রায় ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য’র এ অংশটুকুই পাকুন্দিয়ার অংশ। নদীটির তখন নাব্যতাও ছিল ভালো, ছিল খরস্রোতাও।

এলাকাবাসী জানান, এ নদী দিয়ে একসময় পাল তুলা নৌকা চলাচল করতো। মাঝি-মাল্লারা ভাটিয়ালি সুরে গান গাইতো। জাহাজে বিভিন্ন পণ্য বোঝাই করে ব্যবসায়িরা নদীপথে নিয়ে যেত বিভিন্ন অঞ্চলে। তখন নদীতে রুই, কাতল, মৃগেল, শোল, বোয়াল, গজার, শিং, মাগুরসহ নানা জাতের দেশীয় মাছে ভরপুর ছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে শতশত মানুষ এসে মাছ ধরতো। আশপাশের জেলেরা এ নদীর ওপর নির্ভরশীল ছিল। হাবুডুবু খেলায় মেতে উঠতো শুশুক। স্বাধীনতার আগেও এ নদীর গভীরতা ছিল ২০-২৫ফুট। নদীর এই জৌলুস হারিয়েছে প্রায় ২০-২৫ বছর আগে। কালের আবর্তে নদীটি পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। নদীর বুকে জেগে ওঠা চড়ে প্রায় এক যুগ ধরে ইরি-বোরো ধান চাষ করছেন কৃষকরা। পাকুন্দিয়া উপজেলায় এ নদীর প্রায় আট কিলোমিটার অনেক আগেই বিলীন হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নদীর বুকে গড়ে ওঠেছে ঘর-বাড়ি। পাকুন্দিয়ার মানচিত্র থেকে দিনে দিনে মুছে যাচ্ছে এ নদীর নাম। অথচ এ নদী দিয়েই বাংলার বার ভূঁইয়ার প্রধান মসনদে আলা বীর ঈশা খাঁ (১৫২৯-১৫৯৯) পাকুন্দিয়ার এগারসিন্দুর থেকে করিমগঞ্জের জঙলবাড়ি দুর্গে নৌবিহারে গিয়েছিলেন। 

উপজেলার চরটেকী বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ছোট সময় নৌকা দিয়ে এই নদী পার হয়ে চরফরাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পরবর্তীতে ১৯৮২-৯০সাল পর্যন্ত পাকুন্দিয়া ডিগ্রি কলেজে গিয়ে পড়াশোনা করেছি। তখন নদীটির পুরোপুরি জৌলুস ছিল। তখন নদীতে প্রচুর পরিমাণে বোয়াল, শোল, গজার, শিং, মাগুর, রুই, কাতলসহ দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন পানির অভাবে মাছ তো দূরের কথা, নদীটিই আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। তাই নরসুন্দা নদীটির পুনঃখনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবি)এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো.ইয়াসিন খান বলেন, ‘‘৬৪জেলার অভ্যন্তরীণ ছোট নদী, খাল, জলাশয় খনন ‘দ্বিতীয় পর্যায় শীর্ষক প্রকল্প’র আওতায় এ নদীটিকেও অন্তর্ভূক্ত করে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি পাস হয়ে এলেই খনন কাজ শুরু হবে।’’



সাতদিনের সেরা