kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাণ্ডবের এক মাস

ব্যর্থ প্রশাসন এখনো বহাল, এমপির চরম ক্ষোভ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি   

২৬ এপ্রিল, ২০২১ ০৭:৪৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ব্যর্থ প্রশাসন এখনো বহাল, এমপির চরম ক্ষোভ

২৬ মার্চ। সরকারি-বেসরকারিভাবে পালিত হচ্ছে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠান। হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। লাঠিসোঁটা হাতে চলে নারকীয় তাণ্ডব। করা হয় অগ্নিসংযোগ। এ অবস্থা চলে টানা তিন দিন। ২৮ মার্চের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় দেশের অন্যতম এ জেলা শহরটি। এক মাসেও আগের মতো করে দাঁড়াতে পারেনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা প্রদান বন্ধ রয়েছে। রেলস্টেশন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ট্রেন চলাচলও বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্তরাও এখন পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি।

তাণ্ডব দমাতে প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা আলোচনা হয় শুরু থেকেই। তাণ্ডবপরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার বিষয়েও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রবিবার (২৫ এপ্রিল) সকাল নাগাদ ৩৫৯ জন গ্রেপ্তার হলেও দুই ইমাম ছাড়া উল্লেখযোগ্য কাউকে এ তালিকায় দেখা যায়নি। ব্যর্থ ওই প্রশাসন এখনো রয়েছে বহাল। এ নিয়ে ক্ষোভ দিনকে দিন বাড়ছে।

এদিকে তাণ্ডবের এক মাস পূর্তিতে রবিবার বিকেলে স্থানীয় একটি অনলাইন পোর্টালের লাইভ অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঘটনার সময় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে শুরুর সময়ের মতো এখনো প্রশ্ন তোলেন। পাশাপাশি লাঠিসোঁটা হাতে তুলে নেওয়া মাদরাসাগুলোতে যেন কোনো ধরনের সহায়তা না করা হয় সে আহ্বানও তিনি জানান।

এদিকে হেফাজত ইসলামের তাণ্ডবের ঘটনায় গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতি নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানায়। প্রাথমিকভাবে ভিডিও ফুটেজে থাকা সরাসরি হামলায় অংশগ্রহণকারীদের গ্রেপ্তারের আওতায় আনা হবে। পরবর্তীতে ইন্ধনদাতাসহ অন্যান্যদেরও ধরা হবে। তবে সেটা হবে যথেষ্ট প্রমাণ ও সময়সাপেক্ষ।

তাণ্ডবের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে নজর দেওয়া হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ম্যাসেঞ্জারে। এর মধ্যেই এসবের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার বেশ কিছু তথ্য পুলিশের কাছে এসেছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এদিকে অভিযুক্তদের ধরতে প্রতিদিনই গ্রেপ্তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। শনিবার সকাল থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছয়জন। এ নিয়ে মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল ৩৫৯ জনে। যদিও গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে হেফাজত ইসলামের উল্লেখযোগ্য কোনো নেতা নেই। তবে শীর্ষ নেতাদের ধরতে একটি তালিকা করা হয়েছে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

তাণ্ডবের নিন্দা জানিয়ে সংগঠনের কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন হেফাজত ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সদস্য মুফতি আব্দুর রহিম কাসেমী। এ নেতার পদত্যাগ তাণ্ডবে হেফাজতের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলে এমন অভিযোগ এনে জেলা ছাত্রলীগের এক বিবৃতিতে হেফাজত ইসলামের জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে।

অপরদিকে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী অন্তত ১৫-২০টি ফেসবুক আইডি থেকে ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত হামলার উসকানি দেওয়া, গুজব ছড়ানোর কাজটি করা হয়। এসব আইডি থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার গুজব ছড়ানো হয়। কোনো কোনো আইডি থেকে বলা হয়, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গণহত্যার প্রস্তুতি নিয়েছে। পুলিশের দেহ থেকে মাথা আলাদা করে দেওয়া হয়েছে।

তাণ্ডবের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, 'ডানে একজন এসে বলছেন গুলি শেষ। বামেও আরেকজন বলছেন একই কথা। এ অবস্থায় সবাইকে মানসিকভাবে না ভেঙে পড়ার জন্য বললাম। কৌশল নিলাম বেশি বেশি হুঙ্কার ছাড়ার। সেই কৌশল অনুযায়ী হুঙ্কার ছেড়েই বিক্ষোভকারীদের মোকাবেলা করা হয়'। ২৭ মার্চ কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে হেফাজতের বিক্ষোভের সময় এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় বলে জানান তিনি।

তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে পুলিশের আরেক কর্মকর্তা বলেন, 'এক শিশুকে দেখি আমাদের দিকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ছে। কাছে গিয়ে না পারি তাকে মারতে না পারি ধরতে। তাকে আমি সরে যাওয়ার কথা বললেও সেটা না করে সে উল্টো আমাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করতে থাকে'।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'হামলাকারী প্রত্যেককেই গ্রেপ্তারের আওতায় আনা হবে। আমরা ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করছি। এ ছাড়া আরো কিছু বিষয় নিয়ে আমাদের কাজ চলছে'।

উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আসার প্রতিবাদে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত তিন দিন হেফাজতের কর্মসূচি চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাপক তাণ্ডব চালানো হয়। হামলা ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শতাধিক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর। সেবা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। তাণ্ডবের সময় হওয়া সংঘর্ষে মারা যায় অন্তত ১৩ জন।



সাতদিনের সেরা