kalerkantho

বুধবার । ২৮ বৈশাখ ১৪২৮। ১১ মে ২০২১। ২৮ রমজান ১৪৪২

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সেচ ও খাবার পানির তীব্র সঙ্কট, মানুষের হাহাকার

আহসান হাবিব, চাঁপাইনবাবগঞ্জ   

২২ এপ্রিল, ২০২১ ১৮:০৬ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



চাঁপাইনবাবগঞ্জে সেচ ও খাবার পানির তীব্র সঙ্কট, মানুষের হাহাকার

কলস মাথায় নিয়ে এক শ মিটার ভারসাম্য দৌড় প্রতিযোগিতার দৃশ্য নয় এটি। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৪টি নদী দেখে মনে পড়ে যায় 'আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে' কবিতার কথা। বৈশাখ শুরুর আগেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের চার নদীতে কবিতার সেই হাঁটু জল ও খাবার পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দেওয়ায় পানীয় জল সংগ্রহে এমন দৃশ্য প্রায় সব খানেই। এমন দৃশ্য নদী ও খাল বিলের পানি শুকানোর পাশাপাশি পানির স্তর নেমে যাওয়া। পানীয় জল ও সেচের পানির জন্য হাহাকার মানুষের। গত ৭ মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পড়েনি এক ফোটা বৃষ্টির পানি। পানি সংঙ্কট ও দাবদাহে আমের ব্যাপক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

শিবগঞ্জ পৌরসভায় কয়েকদিন থেকে ট্রাকে করে খাবার পানি সরবরাহ করতে দেখা গেছে কয়েকটি ওয়ার্ডে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপরে নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, গত অক্টোবরের ৯ তারিখ থেকে টানা এক সপ্তাহ অনেক বৃষ্টিপাত হলেও এরপর আজ পর্যন্ত আর কোনো বৃষ্টির ফোটাও পড়েনি।

গোমস্তাপুর পরিস্থিতি

বাঙালির ৬ ঋতুতে ঐতিহ্য বহন করে নিয়ে আসে প্রকৃতিতে। গ্রীস্মের দীর্ঘ অনাবৃষ্টিতে গোমস্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় উপজেলার বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পানি সংকটে রীতিমত হাহাকার শুরু হয়েছে। রোজা ও করোনাকালে পানির জন্য অনেকের ভোগান্তি বেড়েছে। এ ছাড়াও বোরো ধানে সেচ দিতেও কৃষকরা পড়েছেন বিড়ম্বনায়।

গোমস্তাপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়ানের লাদুপাড়া, জিনারপুর, দীঘা, দেওপুরা, ভাটখৈর গ্রামের প্রায় অধিকাংশ টিউবওয়েল পানির স্তর নিচে নামায় অকেজো হয়ে পড়েছে। যান্ত্রীক মোটরের সাহায্যে থেমে থেমে পানি উঠছে। সব চেয়ে বেশী পানি শূন্য হয়ে পড়েছে এই ইউনিয়ানের লাদুপাড়া গ্রামটি সেখানে প্রায় ৪০০ জনসংখ্যার ৮০টি পরিবার। সেখানে সবগুলো টিউবওয়েল পানি শুন্য হয়ে পড়েছে। এই এলাকার মহিলারা মাথায় পাগড়ী বেঁধে কলসি করে প্রায় ১ কি.মি. দূর পার্শ্ববর্তী গ্রাম বিজিপুর থেকে পানি এনে কোনো রকম খাবার পানি সংগ্রহ করছে। রোজা ও এই করোনার সময় এ ভাবে পানি সংগ্রহ করা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ।

এদিকে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক এলাকার বোরো চাষিরা বিপাকে পড়েছেন। গত এক মাসের অধিক সময়ে উঁচু এলাকার বোরো চাষিরা ঠিকমত ধানে পানি দিতে পারছেন না। অনেকে বিকল্প হিসেবে নদী ও খাল থেকে পানি দেওয়ার চেষ্টা করছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের গোমস্তাপুর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম জানান, ভূগর্ভস্থ পানি বেশী উত্তোলনের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। যার কারণে শুষ্ক মৌসুমে অনেক এলাকায় টিউবওয়েলে পানি পাচ্ছে না। তবে বৃষ্টি হলে আশা করা যায় এ সমস্যা কেটে যাবে। আমরা জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে সার্ভিস ওয়াটার অর্থাৎ নদী ও খালের পানি এবং বৃষ্টির পানি বব্যহারের জন্য মানুষকে উৎসাহিত করছি।

আমের অবস্থা

এবার যে আমের উৎপাদন লমাত্রার কাছিকাছি পৌঁছতে বড় প্রতিবন্ধকতা দাবদাহ। খরা ও মাঝারী তাপদাহের কারণে আম পরিমাণ মতো উৎপাদন হবে কিনা কয়েকদিন যাবত এমন চরম ভয় ও শঙ্কায় শঙ্কিত আম চাষি ও বাগান মালিকরা। বাগানে বাগানে রাত-দিন চলছে সেচ প্রদান আম ঝরে পড়া থেকে খরার জন্য। এতে করে বাড়ছে উৎপাদন খরচও। অনেকেই পুঁজির অভাবে সেচ দিতে পারছেন না, অনেকেই তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে বৃষ্টির আশায়। স্যালো মেশিনে সেচ দিতে গিয়ে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় দুই থেকে তিন গুন সময় বেশী লাগছে সেচ দিতে। অনাবৃষ্টি ও তাপদাহের কারণে ঝরে পড়ছে আম।

আমচাষিদের অনেকেই জানান, ২০ দিন যাবত তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। তারা জানান, বাগানে বাগানে স্যালো মেশিন দিয়ে চলছে সেচ প্রদান,পানির স্তরও নেমে যাওয়ায় পানিও উঠছে না ঠিকমতো। বাগান মালিক জানান, আম বাগান মালিক ও উৎপাদনকারীদের আম উৎপাদনে বিনামূল্যে সার প্রদান ও সেচ প্রদানে প্রণোদোনা দেওয়া উচিত। আর তাহলে উৎপাদনে খরচ কিছুটা কমিয়ে আনতে পারা যাবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নজরুল ইসলাম জানান, জেলায় ৩৪ হাজার ৭৩৮ হেক্টর আম বাগানে এবার আম উৎপাদনের লক্ষমাত্রা রয়েছে আড়াই লক্ষ মেট্রিক টন।

নদীর অবস্থা

৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মহানন্দা হুৎপিন্ড বলে থাকেন অনেকেই। উৎসমুখে পানি কম পাওয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম বড় নদী মহানন্দা প্রতি বছর তার নাব্যতা হারাচ্ছে। পানি প্রাপ্যতা অনিশ্চিত হওয়ায় বছরে বছরে মহানন্দা নদীর পানিপ্রবাহ সর্বনিম্ন স্তরে এসে পৌঁছেছে। পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা আশঙ্কাজনক অবস্থায় উপনীত হয়েছে। উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে হুমকির মুখে পড়েছে সেচ প্রকল্প। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর বড় ধরনের তিকর প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। সেই সাথে পানির স্তওে সঠিক পরিমাণ পানি না পাওয়ায় পানীয় জল ও সেচের চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

মহানন্দা নদী মূলত হিমালয় কেন্দ্রীক নদী। ভারতের দার্জিলিং জেলার কুরসেউংগের পূর্বে চিমলির কাছে মহালদিরাম পাহাড়ের পাগলা ঝোরা জলপ্রপাত থেকে এটি উৎসারিত। বাংলাদেশে এটি দুই অংশে প্রবেশ করেছে। যার একটি পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া বাজার দিয়ে। অন্যটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলার গিলাবাড়ী বিওপি সংলগ্ন স্থান দিয়ে।

মহানন্দা শেষ হয়েছে গোদাগাড়ীর কাছে পদ্মায় মিলিত হওয়ার মাধ্যমে। ভোলাহাটের বিপরীতে ভারতের মালদা জেলায় মহানন্দা প্রবেশ করে দুটি অঞ্চলের সৃষ্টি করেছে। মহানন্দার মোট দৈর্ঘ্য ৩৬০ কিলোমিটার। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এর দৈর্ঘ্য ৯৬ কিলোমিটার। এটিই একমাত্র নদী যা জেলার পাঁচটি উপজেলার সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। মহানন্দা নদী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অনেক বেশি অবদান বলে বিবেচিত। বলা হয়ে থাকে মহানন্দা চাঁপাইনবাবগঞ্জের হৃৎপিন্ড।

পাঁচ বছরের রেকর্ড থেকে দেখা যায়, মহানন্দায় ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল সর্বনি¤œ পানির উচ্চতা ছিল ১১.৫২ মিটার, ২০১৪ সালের ১ মে উচ্চতা ছিল ১১.৬১ মিটার, ২০১৫ সালের ২৯ মার্চ উচ্চতা ছিল ১১.৯৬ মিটার, ২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল ছিল ১১.৬০মি, ২০১৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১১.০৫ মিটার আর সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ১১.৩৫ মিটার। এই পরিসংখ্যানে প্রতীয়মান হয় শুষ্ক মওসুমে মহানন্দায় পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে পরপর দুইবার পানির উচ্চতা সর্বনিম্ন স্তরে উপনীত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডে সূত্রে জানা গেছে, উজানে ভারত ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করায় পানি প্রাপ্যতা অনিশ্চিত এবং পানি শুকিয়ে নাব্যতা হারানোর কারণে মহানন্দা খালে পরিণত হয়েছে। উৎসমুখে ভারতীয় পশ্চিম দিনাজপুরের মহানন্দায় রাবার ড্যাম তৈরির কারণে শুষ্ক মওসুমে পানির অভাব হচ্ছে। এদিকে বৃষ্টিপাতও কমে গেছে। যে বৃষ্টিপাত হয় তাতে পানিপ্রবাহে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় না। তা ছাড়া নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। সাধারণত পানির স্তর রিচার্জ হয় গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জের মাধ্যমে। এটারও হার কমে গেছে। একই কারণে মহানন্দার চিরায়ত অবয়ব দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। নদীটির গড় প্রস্থ যেখানে ছিল প্রায় ৫০০ মিটার সেখানে বর্তমানে এটির পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৫০/৪০ মিটারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৯৬ কিলোমিটার। দীর্ঘ নদীর চলমান প্রবাহ স্তিমিত হওয়ার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। কোথাও এর হাঁটুপানি। কোথাও প্রবাহহীন অবস্থা, আবার কোথাও কোথাও বালুর চর জেগে উঠেছে। এ রকম দশায় পানির নাব্যতা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ায় মহানন্দায় পানি সংরণ ব্যবস্থা যেমন হুমকির মুখে পড়েছে তেমনি মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে নদীকেন্দ্রিক অসংখ্য পানি সেচ প্রকল্প। চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহানন্দায় ৬০টি সমিতিভুক্ত পানি সেচ প্রকল্প ছাড়াও অসংখ্য ক্ষুদ্র সেচ স্কিম রয়েছে। সারা বছর ধরেই মহানন্দার পানি দিয়ে সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে শুষ্ক মওসুমে এসব প্রকল্প পুরোটাই নদীনির্ভর হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত পানির অভাবে সেচ প্রকল্পগুলোর আওতায় অন্তত প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমি সেচসঙ্কটে উপনীত হয়েছে।

এদিকে ১৫৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় গৃহীত মহানন্দা নদী খনন ও রাবার ড্যাম নির্মাণ প্রকল্পটির পরিকল্পনা ২০১৮ তে শুরু হয়। সাধারণত ড্রেজিং মওসুম ধরা হয় নভেম্বর ফেব্রুয়ারি মাসকে। সে সময় পানির গড় প্রবাহ ভালো থাকে। ড্রেজিংয়ের জন্য কমপে দুই মিটার পানির উচ্চতা থাকতে হয়। যা এ মুহূর্তে নেই।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম জানান, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অধীনে নারায়ণগঞ্জ ডক ইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি চালিত হচ্ছে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে গোমস্তাপুরের চৌডালা ব্রিজ পর্যন্ত সুবিধাপ্রাপ্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হবে। রাবার ড্যাম সম্পন্ন হলে মহানন্দার ধারে অতিরিক্ত তিন হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে। প্রায় সাত হাজার হেক্টর জমি সেচের অওতায় আসবে। এই সাথে প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর আম বাগান সেচ সুবিধা প্রাপ্ত হবে। অতিরিক্ত ৫৫ কোটি টাকার বাড়তি ফসল উৎপাদিত হবে। মহানন্দা তীরবর্তী যে ২৫ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে তার মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টরই উপকৃত হবে। পুরো প্রকল্প এলাকায় চার মিটার পানি ধরে থাকবে বলেও তিনি জানান।

এদিকে পরিবেশবিদরা জানান, প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে বর্ষায় উজান থেকে প্রচুর পরিমাণে পলি এসে মহানন্দা ভরাট হচ্ছে। এতে করেও নাব্যতা হারাচ্ছে মহানন্দা। তাদের মতে নদীতে পানিশূন্যতায় জীব বৈচিত্র্যও পরিবেশের ওপর বড় ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে।

এপ্রিল-মে-জুন মাস হচ্ছে মাছসহ অনান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন সময়। কিন্তু পানির অভাবে প্রজনন ব্যাহত হয়ে মৎস্যসঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে দেশীয় বিভিন্ন জলজ প্রাণী। যাদের মধ্যে অনেক জাত ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে মত প্রকাশ্যে উঠে আসে এসব চিত্র।



সাতদিনের সেরা