kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

ভাসমান মানুষের শেষ ঠিকানা হোটেল আল-গণি

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার   

২০ এপ্রিল, ২০২১ ০৫:০৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভাসমান মানুষের শেষ ঠিকানা হোটেল আল-গণি

আল-গণির নিজস্ব অর্থায়নে দুস্থদের মাঝে প্রতিরাতে সেহরি বিতরণ

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সবাইকে ঘরে থাকার কথা বলা হলেও কক্সবাজার শহরে অনেকেরই থাকার জায়গা নেই। এ শহরেও আছে ভাসমান এবং ছিন্নমূল মানুষ। আছে অসংখ্য পথশিশু। তাদের কেউ ফুটপাতে ঘুমান, কারো কারো বসবাস যাত্রী ছাউনি কিংবা বন্ধ মার্কেটের বারান্দা। এসব মানুষের খাবারের জোগান দিতে কক্সবাজার শহরের ঐতিহ্যবাহী রেস্টুরেন্ট আল-গণি প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও রমজান মাসের সেহরি বিতরণ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে।

করোনার প্রাদুর্ভাবে সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকলেও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হোটেল আল-গণি খোলা রয়েছে। নিজেদের অর্থায়নে প্রতি রাতে রোজাদার মানুষের মাঝে ইফতার ও সেহরি বিতরণ করে হোটেল কর্তৃপক্ষ।

শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভাসমান মানুষের শেষ ঠিকানা এখন হোটেল আল গণি। সন্ধ্যার সময় ইফতার ও রাতে সেহরি বিতরণ করে অসহায় মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছে ঐতিহ্যবাহী আল-গণি। তাদের এই কর্মসূচি নতুন নয় বলে জানান মালিকপক্ষ। তারা প্রতিবছর অসহায়-দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ান। রাস্তায় বা পাড়া-মহল্লায় ভ্রাম্যমাণ কর্মসূচির মাধ্যমেও ইফতার-সেহরি বিতরণ করে থাকে।

আল-গণির অন্যতম মালিক মো. রুবেল উদ্দিন বলেন- ‘মহামারি এই করোনার সময় শহরের হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকার কারণে অনেক অসহায় মানুষের সেহরি খাওয়া হয় না। ফলে অনেক ভাসমান মানুষ ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও রোজা রাখতে পারে না। বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পরই রমজান মাসে তাদের ইফতার ও সেহরি বিতরণের সিদ্ধান্ত নিই।’

তিনি জানান, এমনিতেই প্রতি বছরের রমজান মাসে পরিবারের পক্ষ থেকে ইফতার ও সেহরি বিতরণ কর্মসূচি চলে আসছে। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপটটি ভিন্নতর বিধায় তারা এবার চার বেলা খাবারই দিচ্ছে ক্ষুধার্ত মানুষদের।

আল-গণির মালিক রুবেল জানান, তারা সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে দৈনিক ‘চার বেলা’ খাবার বিতরণ করে আসছে। দুপুরে ছিন্নমূল পথশিশু এবং ভারসাম্যহীন ব্যক্তি যারা রোজা রাখতে পারে না তাদের মাঝেও খাবার দেওয়া হয়। বিকেলে শহরে দায়িত্বরত পুলিশ প্রশাসনের সদস্যদের মাঝেও দেওয়া হয় খাবার। সন্ধ্যায় বিতরণ করা হয় রোজাদার ব্যক্তিদের মাঝে ইফতার এবং রাতের শেষে রোজাদার অসহায়-ভাসমান মানুষদের সেহরির খাবার বিতরণ করা হয়।

তিনি জানান, এভাবে প্রতিদিন ৩৫০ জনেরও বেশি মানুষের খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। গত বছর এই কর্মসূচি টানা ৫৬ দিন অব্যাহত ছিল। পুরো রমজান জুড়েই অব্যাহত থাকবে এ কর্মসূচি। খাবারের কোনো অর্থ নয়, বরং সকলের দোয়া কামনা করেন পরিবারের পক্ষে।

ইফতার ও সেহরি খাবারের সুবিধাভোগী আলি হোসেন নামের এক ব্যক্তি বলেন- ‘শৈশব থেকে বড় হয়েছি রাস্তাঘাটেই। এ পৃথিবীতে দু'মুঠো ভাত দেওয়ার মতো কোনো স্বজন নেই। কাজ করতে পারলেও এরকম ভাত জুটে না কপালে। অসুখ হয়ে পথে পড়ে থাকলেও দেখার মতো কেউ নেই।’ 

আলী হোসেন বলেন, এখন চলছে লকডাউন ও রমজান মাস। এ কারণে সব কিছু বন্ধ। কাজও নেই কোথাও। তাই সারা দিন অনাহারে থাকতে হয়। এই দুঃসময়ে তাদের মতো ছিন্নমূল মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে আল-গণি। তারা দিচ্ছে বলেই খেতে পারছে বলেন তিনি।

কাজের সন্ধানে সুদুর কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে এসেছেন জয়নাল হোসেন নামের এক হতভাগা। এসেই পড়েছেন লকডাউনের কবলে। তিনি বলেন- ‘দৈনিক মজুরি হিসেবে আয় থাকলেই টাকায় খেতে পারতাম। কিন্তু এখন লকডাউনের কারণে বাড়িতেও যেতে পারছি না। কোনো কাজ-কাম নাই, খাওয়া-দাওয়ার জন্যও পকেটে টাকা নাই। 

সেহরির সময় হলে আল-গণির সামনে আসি। তাদের প্যাকেট নিয়ে এক দিকে বসে খাই।’ তিনি বলেন, হোটেল আল-গণি কর্তৃপক্ষ এই ব্যবস্থা না করলে তাদের মতো অসহায় যারা আছে তাদের কী অবস্থা হতো তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।

আরিফ নামের অপর একজন দিনমজুর বলেন- ‘দিনমজুরির কাজ করি। এখন সবকিছু বন্ধ। কেউ কাজ করতে ডাকে না। ৪ সদস্যের সংসার চালাতেও খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। আল-গণি সেহরী বিতরণ করলে আমার বাচ্চা সঙ্গে এনে একটা প্যাকেট বেশি চেয়ে নিই। তারপর বাসায় গিয়ে সবাই ভাগ করে খাই।’

এভাবে প্রতিদিন অনাহারির মুখে খাবার তুলে দিয়ে মানুষের নজর কাড়ছে আল-গণি। লকডাউন সময়ে অর্থনৈতিক সংকটে সবকিছু বন্ধের মাঝেও গরিব-দুস্থদের জন্য প্রতিনিয়ত ইফতার-সেহরি বিতরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি। তাদের এই মহৎ কাজকে সমাজের সকল পর্যায়ের লোকজন সাধুবাদ জানিয়ে আসছে। 



সাতদিনের সেরা