kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা

মধু শূন্য হয়ে পড়েছে সুন্দরবন!

মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট)   

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ১৮:০১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মধু শূন্য হয়ে পড়েছে সুন্দরবন!

মধু শূন্য হয়ে পড়েছে সুন্দরবন! অন্যান্য বছর বনের যেসব এলাকায় পাশাপাশি অসংখ্য মৌচাক পাওয়া যেতো। কিন্তু এ বছর গহীন বনের মধ্যে মাইলেকে মাইল হেঁটেওও মৌচাকের দেখা মিলছে না। দু-একটি চাক পাওয়া গেলেও তাকে তেমন মধু যাওয়া যাচ্ছে না। মধুর রঙ কালো বর্ণের। স্বাদও ভালো না। গাছের ফুল শুকিয়ে ঝরে পড়ছে। ফুলেও মধু নেই। প্রথম গোনে (ট্রিপ) মাত্র দেড়-দুই মণ করে মধু পেয়েছে একেকটি নৌকায়। কাঙ্খিত মধু না পেয়ে অনেকটা হতাশ হয়েছেন মৌয়ালরা। বৃষ্টি না হওয়ার কারণে পূর্ব সুন্দরবনে মধুর এমন আকাল দেখা দিয়েছে। বনবিভাগ ও মধু সংশ্লিষ্টদের সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

বনবিভাগের তথ্য মতে, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে (গত মৌসুমে) শরণখোলা রেঞ্জের বনাঞ্চল থেকে ৭১১ দশমিক ৫০ কুইন্টাল মধু এবং ২১৩ দশমিক ৪৫ কুইন্টাল মোম আহরিত হয়। যা থেকে রাজস্ব আসে ৯ লক্ষাধিক টাকা। সেখানে এ বছর ৮০০ কুইন্টাল মধু এবং ২৫০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধাণ করা হয়েছে। তবে, মধুর পরিস্থিতি ভালো না হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কিত বনবিভাগ।

প্রথম গোন শেষে ফিরে আসা কয়েকজন মৌয়ালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একেকটি নৌকায় ১৫ দিনে তাদের ৪০ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। একেক দলে ১০-১২ জন করে থাকেন তারা। বনবিভাগ থেকে পাস নেওয়া, রাজস্ব, খাওয়া খরচসহ সব মিলিয়ে এই টাকা ব্যয় হয় তাদের। গতবছর এই সময়ে প্রথম গোনে তারা প্রতি নৌকায় নিচে ১০মণ এবং কোনো কোনো নৌকায় ১৫ মণ করে মধুও পেয়েছেন। কিন্তু এবার বেশিরভাগ নৌকায় দেড় মণ থেকে সর্বোচ্চ পেয়েছেন ৩ মণ করে মধু।

মৌয়ালরা জানান, প্রতিবছর এপ্রিল মাসের এক তারিখে তারা বনবিভাগ থেকে ১৫ দিনের পাস নিয়ে বনে যান মধু সংগ্রহে। পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কটকা, কোকিলমুনি, শ্যালা, ভেদাখালী, কবরখালী, আড়ুয়া গাঙ, মোরগমারী, হরমল, গাজীপুরা, ছপড়াখালী, চাঁনমিয়াখালী এলকা মধুর জন্য প্রসিদ্ধ স্থান। এসব এলাকায় আগে কিছু দূর পর পর গাছে গাছে অসংখ্য মৌচাক ঝুলতে দেখা গেছে। একেকটি চাক থেকে মধু পাওয়া যেতো ৪-৫ কেজি করে। কিন্তু এবার সেসব এলাকায় মাইকে মাইল হেঁটেও মৌচাকের দেখা মিলছে না। আর দু-একটি চাক পেলেও তাতে আধাকেজি-এক কেজি মধু পাওয়া যাচ্ছে। এখন খলিসা ও গরাণ ফুলের মওসুম। এসব গাছে একটু নাড়াচাড়া লাগলেই ফুল ঝড়ে পড়ছে। তবে, নদীর পাড়ে পানির কাছাকাছি কিছু এলাকার মৌচাকগুলোতে মধু পরিমাণে বেশি পেয়েছেন কিছু মৌয়াল। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে বনের সবখানেই সমানভাবে মধু পাওয়া যেতো বলে জানান মৌয়ালরা।

শরণখোলা গ্রামের মৌয়াল ওলি হাওলাদার জানান, তার দলে ১০ জন ভাগী (সদস্য)। গতবছর প্রথম গোনে ১২মণ মধু পেয়েছিলেন। এবার পেয়েছেন মাত্র পৌনে দুই মণ।

খুঁড়িয়াখলী গ্রামের মৌয়াল জামাল ফরাজী জানান, গতবার পেয়েছিলেন ১৫ মণ। আর এবার পেয়েছেন মাত্র দুই মণ। তারা মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে সুন্দরবনে মধু আহরণ করতে যান। এ বছর তারা দাদনের টাকা শোধ করবেন কিভাবে সেই চিন্তায় পড়েছেন।

খুড়িয়াখালী গ্রামের মধু ব্যবসায়ী মো. রাসেল আহমেদ জানান, তিনি এবার তিনটি নৌকায় দুই লাখ টাকা দাদন দিয়েছেন। কিন্তু প্রথম চালানের মধুতে হতাশ তিনি। সারা মওসুমেও তার দাদনের টাকা উঠবে কি না সন্দেহ। ফেদৌস খান জানান, তিনিও তিনটি নৌকায় দিয়েছেন আড়াই লাখ টাকা। তার এক নৌকায় পেয়েছে ৭০ কেজি আরেকটিতে দুই মণ।

এই ব্যবসায়ীরা জানান, গতবছর প্রথম চালানের মধু মৌয়ালদের কাছ থেকে মণ কেনা পড়েছে ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা দরে। এবার শুরুতেই ২৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা মণ দিতে হচ্ছে। যা সমস্ত খরচ নিয়ে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা দরে বিক্রি না করলে কোনোভাবেই পোষানো যাবে না। এভাবে খরা আর অনাবৃষ্টি চলমান থাকলে শেষ দিকে সুন্দরবনের মধু সোণার হরিণে পরিণত হবে।

পূর্ব বনবিভাগের শরণখোলা স্টেশন কর্মকর্তা (এসও) মো. আব্দুল মান্নান বলেন, সুন্দরবনাঞ্চলে এবছর বৃষ্টিপাত না হওয়ায় গতবারের তুলনায় এবার মধু আহরণের পরিমাণ তিনের একভাগে নেমে এসেছে। ফুল ঝড়ে যাচ্ছে। যে কারণে মৌচাক এবং মধু দুটোই কম। প্রথম চালানে যে মধু এসেছে তার রঙ কালো বর্ণের, স্বাদও খারাপ। এমন পরিস্থিতিতে বনবিভাগের নির্ধারিত মধু আহরণ এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পুরণ নিয়ে শঙ্কিত সবাই।



সাতদিনের সেরা