kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

শ্যামনগরে সড়ক নির্মাণে পুকুরচুরি!

মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরা    

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ১১:৩৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শ্যামনগরে সড়ক নির্মাণে পুকুরচুরি!

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পরানপুর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের 'মেজর মেইনটেন্যান্স' কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সড়ক নির্মাণের প্রতিটি ধাপ দায়সারাভাবে সম্পন্ন করার পর কার্পেটিংয়ের ক্ষেত্রে রীতিমতো পুকুর চুরির ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ইটসহ নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের পাশাপাশি 'শিডিউল' অনুযায়ী প্রাইম কোর্ট (পিচ দেয়ার আগে তরল পিচের হালকা প্রলেপ) পর্যন্ত লাগানো হয়নি। গুণগত মান রক্ষা না হওয়ায় সদ্যই সম্পন্ন হওয়া উপজেলা সদরের সঙ্গে কৈখালী ইউনিয়নের যোগাযোগ রক্ষাকারী এ সড়ক বর্ষার আগেই নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেনের সহায়তায় কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদার এমন তুঘলকি কাণ্ড ঘটিয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের শুরু থেকে বার বার ঠিকাদার ও প্রকৌশলীকে 'শিডিউল' অনুযায়ী কাজের অনুরোধ করা হলেও তাঁরা গুরুত্ব দেয়নি। ফলে কাজ শেষ হওয়ার সপ্তাহ পার না হতেই কয়েকটি স্থানে পাথরের টুকরো উঠে যেতে শুরু করেছে। ঠিকমতো পিচ না দেওয়ায় অনেক জায়গায় পাথরের টুকরোর মধ্যে বিস্তর ফাঁক রয়েছে এবং কোনো কোনো স্থানের এজিং (রাস্তার দুই পাশে বসানো ইটের সারি) দেবে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে কৈখালী ইউনিয়নের পরানপুর বাজার এলাকায় ১৫০০ মিটার রাস্তায় 'মেজর মেইনটেন্যান্স' কাজ অনুমোদন হয়। টেন্ডার আহ্বানের পর সড়কটির কাজের দায়িত্ব পায় খুলনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিলান ট্রেডার্স। সময়মতো কাজ শুরু করা হলেও তড়িঘড়ি করে তিন-চার দিন আগে মোট ৫৫ (চুক্তি ৫২) লাখ টাকার কাজটি সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

অভিযোগ উঠেছে, অধিক মুনাফার লোভে ১৫০০ মিটারের মধ্যে প্রায় ৬০০ মিটার রাস্তার 'থিকনেস' (পুরুত্ব) ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেওয়া হয়েছে। সিডিউল অনুযায়ী ৪০ মিলি পুরুত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা সত্ত্বেও প্রায় ৬০০ মিটার জায়গায় পুরুত্ব রাখা হয়েছে ২৫ থেকে ২৭ মিলিমিটার।

স্থানীয়দের দাবি, 'পুরুত্ব কম রেখে কাজ করার সময় কাকতালীয়ভাবে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকৌশলীসহ তাঁর দপ্তরের কেউ কর্মক্ষেত্রে ছিলেন না। শেষ অংশের কাজ করার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দ্রুততার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে স্থানীয়রা অভিযোগ তোলেন, উপজেলা ইঞ্জিনিয়রের সঙ্গে ঠিকাদারের যোগসাজশে এমনটি হয়েছে'।

শেষ অংশের কাজ রাতের বেলা হয়েছে দাবি করে তাঁরা জানান, নিম্নমানের ইট ব্যবহারসহ ম্যাকাডাম (বালি মিশ্রিত খোয়া বা পাথর)-এর সময় নিচের রাস্তা ভালোভাবে গুঁড়িয়ে নেওয়া হয়নি। কোনো কোনো স্থানে আগের পিচের ওপর পিচ দিয়ে নামমাত্র প্রাইম কোর্ট করা হয়েছে।

পরানপুর বাজারের আব্দুল জলিল বলেন, শুরু থেকেই ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ারকে বার বার বলা সত্ত্বেও তাঁরা রাস্তা নির্মাণে মারাত্মক ফাঁকিবাজি করেছেন। পরানপুর হাই স্কুলের সামনের রাস্তায় তাঁরা আগের পিচের রাস্তা যেনতেনভাবে খুঁড়ে পিচ ঢেলে রোলিং করেছেন।

কাটাখালী গ্রামের আব্দুর রশিদ জানান, কোনো রকমে এজিং সম্পন্নের পর ম্যাকাডাম করে শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে রাতের বেলা কার্পেটিং শেষ করা হয়েছে। ১৫০০ মিটার রাস্তার সর্বত্র সমানভাবে 'থিকনেস' রক্ষা করা হয়নি। কাজের মধ্যে অভিযোগ উঠলে বাইরের কয়েকজন এসে পরীক্ষা করে প্রায় ৬০০ মিটার রাস্তায় নামমাত্র কার্পেটিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।

বর্ষাকাল আসতে আসতে এ রাস্তা আবারো নষ্ট হবে দাবি করে স্থানীয় খোরশেদ আলম বলেন, 'শুরু থেকে রাস্তা নির্মাণে গুণগত মান রক্ষা করা হচ্ছিল না। এ সময় এলাকার মানুষ এভাবে কাজ না করার অনুরোধ জানালেও ঠিকাদার বা ইঞ্জিনিয়র তাতে কর্ণপাত করেননি। কোনো  কোনো ক্ষেত্রে পিচের ওপর দিয়ে পিচ দিয়ে গেছে, তাই ৭ দিন পার না হতেই পিচ উঠে যাচ্ছে বলেও দাবি তাঁর।

স্থানীয় কৈখালী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম জানান, শুরুতে নিম্নমানের ইট দিয়ে কাজ করা হয়। একপর্যায়ে পরিষদের পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হলেও কাজ হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাইম কোট ঠিকমতো মারা হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, গুণগত মান রক্ষা না করায় বর্ষা মৌসুম শেষ হতেই রাস্তা পূর্বের অবস্থায় ফিরতে শুরু করবে। বিষয়টি তদন্তের জন্য তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

অভিযোগ উঠেছে, যেসব স্থানের কাজে ন্যূনতম মান রক্ষা পায়নি, ওইসব অংশের কাজের সময় কৌশলে উপজেলা প্রকৌশলীর দপ্তরের প্রতিনিধিরা অনুপস্থিত থেকেছে। দুই পক্ষের আপসরফায় এমন তুঘলকি কাণ্ডে স্থানীয়দের কোনো আপত্তিকে কানে তোলা হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।

গোটা অনিয়মের সঙ্গে কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী ও শ্যামনগরে অতিরিক্ত দায়িত্বরত উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেন জড়িত বলে অভিযোগ তুলে স্থানীয়রা জানান, এর পূর্বে ওই সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক প্রকল্প গায়েবের অভিযোগ ওঠে। ঠিকাদারের সঙ্গে  যোগসাজশে তিনি ২০১৯-২০ অর্থ বছরে কালিগঞ্জ উপজেলায় এডিপির আওতায় রতনপুর এলাকার দুটি কাজের বিল আত্মসাৎ করেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বিল উত্তোলনের ১০ মাস পর একটি ভাঙা ব্রিজের সংস্কার কাজ শুরু করে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।

সংশ্লিষ্ট কাজের দায়িত্বে থাকা জিলান ট্রেডার্সের মালিকের মুঠোফোনে একাধিকবার রিং করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

পরানপুর বাজার এলাকার রাস্তার কাজে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্বে শ্যামনগর) জাকির হোসেন বলেন, 'এর মধ্যে তদন্ত করে দুই শ মিটার জায়গায় 'থিকনেস' ২০ মিলি পর্যন্ত পাওয়া গেছে'। ঠিকাদারের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, 'দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঠিকাদার কাজটুকু করে দেবেন'।



সাতদিনের সেরা