kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

'মোর ক্যাও নাই, এখন হামরা কি খায়া বাঁচমো, বাবা!'

স্বপন চৌধুরী, রংপুর    

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০৯:৩৫ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



'মোর ক্যাও নাই, এখন হামরা কি খায়া বাঁচমো, বাবা!'

'মোর ক্যাও নাই বাবা। স্বামীধন মরি গেইচে অনেকদিন আগে। ছইলটাক নিয়ে জমি জিরাত আবাদ করি খাও। তাও এইবার আর হবার দিলো না। ভুঁইয়ের (জমির) ধানের ওপর গাড়ি দিয়া ধান নষ্ট করি দিচে। এখন হামরা কি খায়া বাঁচমো!' 

রংপুরের মিঠাপুকুরের মাটিয়াখোলা বিলে ভূমিহীনদের ক্ষেতের ফসল এসকাভেটর (ভেকু মেশিন) দিয়ে নষ্ট করে দেওয়ার পর কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন দুলালী নামের এক ভূমিহীন নারী।

কেবল দুলালী বেওয়া নয়, আবুল কালাম আজাদের ২৫ শতক, বাচ্চু মিয়ার ২৫ শতক, আবু সায়েদের ৫০ শতকসহ আরো অন্তত পাঁচ বিঘা জমির ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে ভেকু মেশিন চালিয়ে নিয়ে যান ইজারাদারের লোকজন। এতে মাটিয়াখোলা বিল নিয়ে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিলসংলগ্ন সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত বন্দোবস্ত নেওয়া জমি দখলে নিয়ে ভূমিহীনদের উচ্ছেদের চেষ্টা করছেন এলাকার প্রভাবশালীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার ভাংনী ইউনিয়নের মাটিয়াখোলা গ্রামে একটি সরকারি বিল রয়েছে। গ্রামের নামে নামকরণ হয়েছে বিলটির। বর্তমানে বিলের আয়তন তিন একর ৩৮ শতক। বিলের চারপাশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ আট একর ২০ শতক। ভূমিহীন ১১টি পরিবার ১৯৮৯ সালের দিকে বিলের ধারে আবাদযোগ্য ওই জমি ৯৯ বছরের জন্য বন্দোবস্ত করে নেন। সেই থেকে তাঁরা জমি চাষাবাদ করে আসছেন। প্রতিবছরই স্থানীয় ভূমি অফিস ওই বিলটি নামমাত্র টাকায় ইজারা দেয়। এবার এলাকার তিন প্রভাবশালী ব্যক্তি ফরিদ উদ্দিন, আসাদ মেম্বার ও মাসুদ মিলে বিলটি ইজারা নিয়েছেন। তাঁরা বিল খননের নামে ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত নেওয়া জমিও দখলে নিতে চাইছেন। এতে বাধা দেওয়ায় ভূমিহীনদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

ওই গ্রামের আবদুস সামাদ মিয়ার নামে ১১০ শতক জমি বন্দোবস্ত দিয়েছিল সরকার। তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী দুলালী বেওয়া সন্তানদেরকে নিয়ে ওই জমি ভোগদখল করে আসছেন। এবছর বোরো ধান চাষ করেছেন জমিতে। ধানের ফলনও হয়েছে আশাতীত। গত শুক্রবার বিল ইজারাদাররা তাঁর ধানের জমির ওপর দিয়ে স্কেবেটর (ভেকু) চালিয়ে দেয়। এতে দুলালীর ধানক্ষেতের ২৫ শতক জমির ধান নষ্ট হয়েছে। এছাড়া আবুল কালাম আজাদের ২৫ শতক, বাচ্চু মিয়ার ২৫ শতক, আবু সায়েদের ৫০ শতকসহ আরও অন্তত পাঁচ বিঘা জমির ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে ভেকু মেশিন চালিয়ে নিয়ে যান ইজারাদারের লোকজন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৯ এর দিকে ভূমিহীন ১১জনের নামে বিলের পাশে খাস খতিয়ানের সম্পত্তি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। তখন থেকে তাঁরা সংসারের বিভিন্ন প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী ওই বিলের পানি ব্যবহার করে আসছেন। কিন্তু এবার তিন প্রভাবশালী বিল ইজারা নিয়ে এলাকার মানুষের ওপর অত্যাচার শুরু করে দেন। বন্দোবস্ত নেওয়া ভূমিহীনদের জমিও দখল করে বিল করার চেষ্টা করছে।

তবে অভিযুক্ত ইজারাদার ফরিদ উদ্দিন বলেন, 'আমরা সরকারের কাছ থেকে বিল ইজারা নিয়েছি। খননের বিষয়টি সরকার দেখবে। অভিযোগকারীরা মিথ্যা বলছে'।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, 'মূলত ওই জমিগুলো বিলেরই। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে কোনো কারণে তাদের নামে বন্দোবস্ত হয়েছিল। ২০১৩ সালেই বন্দোবস্ত বাতিল হয়ে যায়। অভিযোগকারীরা অন্যায়আবে বিলের জমি দখল করে আছে। তাঁরা অনেকেই ভূমিহীন নন। সরকারি কাজে বাধা দেওয়ায় এর মধ্যে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে'।



সাতদিনের সেরা