kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

সন্তানের কাঁধে মায়ের শ্বাস

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল    

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০১:২৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সন্তানের কাঁধে মায়ের শ্বাস

মোটরসাইকেলের পেছনে করোনায় আক্রান্ত মা। তার মুখে অক্সিজেন মাক্স। মাক্সের অপর প্রান্তে সিলিন্ডার। প্রায় ২০ কেজি ওজনের সেই সিলিন্ডার ছেলের পিঠে বাঁধা। মায়ের বাম হাত সেই বাঁধনের ভেতরে। আরেক হাতে শক্ত করে সিলিন্ডর ধরে আছেন। এমন পরিস্থিতিতে ছেলে মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটছেন।

সিলিন্ডার কাত হয়ে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, তা সামাল দিতে বাম পাশ ঘেঁষে আরেক ছেলে মোটরসাইকেলের গতিবিধি লক্ষ্য রাখছেন। তাদের গন্তব্য বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিট। এভাবেই ঝালকাঠীর নলছিটি থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম শেষে দুই ছেলে মাকে নিয়ে পৌঁছান করোনা ওয়ার্ডে।

সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন মা। এই ভাগ্যবান মা হচ্ছেন রেহানা পারভীন (৫০)। তিনি ঝালকাঠীর নলছিটি বন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। মাকে নিয়ে যে ছেলে মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন তিনি হচ্ছেন, জিয়াউল হাসান। তিনি ঝালকাঠি জেলা সদরের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক শাখার সিনিয়র অফিসার পদে কর্মরত রয়েছেন।

তার মোটরসাইকেল অনুসরণ করে পাশের মোটরসাইলে ছিলেন ছোট ভাই রাকিব হাসান। তিনি চট্টগাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যায়নরত। জিয়াউল হাসানের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল হাকিম মোল্লা। তিনি নলছিটি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার। ২০২০ সালের প্রথম রমজানে হাকিম মোল্লা মৃত্যুবরণ করেন। নলছিটি পৌরসভার সূর্যপাশা গ্রামের তাদের বসবাস।

শরীরে অক্সিজেনের সিলিন্ডার বেঁধে মাকে নিয়ে জিয়াউল হাসান মোটরসাইকেল যোগে শনিবার বিকেলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অতিক্রম করছিলেন। তখন সেখানে লকডাউনে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা মোটরসাইকেল আরোহীকে থামান। ঘটনা শুনে তারা দ্রুত মোটরসাইকেল চলে যেতে সাহায্য করেন। পাশাপাশি সেই দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। 

মায়ের জন্য ভালোবাসা
রেহানা পারভীনের মেঝ ছেলে জিয়াউল হাসান। তিনি জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তার মা জ্বরে ভুগছিলেন। করোনার সবগুলো উপসর্গ তার মায়ের ছিল। মা করোনা আক্রান্ত কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। কিন্তু ফলাফল পেতে বিলম্ব হওয়ায় মাকে নিয়ে ১৫ এপ্রিল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আরটি পিসিআর ল্যাবেও আসেন। কিন্তু শের-ই বাংলা মেডিক্যাল রিপোর্ট পেতেও বিলম্ব হচ্ছিল।

তবে রেন্টিজেন্ট পরীক্ষায় পজিটিভ আসায় বৃহস্পতিবার বাসায় একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়েছিলেন। মায়ের শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে যাওয়ায় বাসায় রাখা অক্সিজেন সিলিন্ডারে তার শ্বাস প্রশ্বাস চলছিল। প্রায় ৫ লিটার অক্সিজেন সিলিন্ডার যখন প্রায় শেষ হওয়ার উপক্রম, তখন দুই ভাই সিদ্ধান্ত নেন মাকে যে করেই হোক চিকিৎসা করাতে হবে।

কিন্তু লকডাউনে এবং করোনা রোগীর কারণে গাড়ি কিংবা অন্য পরিবহন যেতে চাচ্ছিল না। মাকে বাঁচাতে শেষে নিজের শরীরে অক্সিজেন সিলিন্ডার বেঁধে নেন জিয়াউল। তখনো মায়ের মুখে অক্সিজেন মাস্ক। পাশে আরেকটি মোটরসাইকেলে ছোট ভাই রাকিব। সন্ধ্যার আগে তারা প্রায় ১৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছান শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে। সেখানে তার মা চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পথে পথে লকডাউনের বিড়ম্বনা
জিয়াউল হাসান বলেন, শনিবার সকালের দিকে মায়ের অক্সিজেন লেভেলটি ৯৪-৯৩ নেমে যাচ্ছিল। দুপুরে দেখলাম সিলিন্ডারের অক্সিজেন প্রায় শেষ হয়ে আসছে। ভাবলাম মাকে বাসায় রেখে ঝুঁকিটা নেওয়া ঠিক হবে না। তাকে যেভাবেই হোক শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে নিয়ে আসতে হবেই। বরিশালে মাকে নিয়ে আসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। একটি মাহিন্দ্রা ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করেছি, তাও লকডাউনের কারণে আসতে চায়নি। একটা অটোরিকশা রিজার্ভ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু করোনা রোগীর কথা শুনে কেউ আসতে চায়নি।

তখনকার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে গিয়ে জিয়াউল হাসান বলেন, মাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সুতরাং আমাকে যেতেই হবে। মাকে বাঁচানো এছাড়া তো উপায় নেই। আমি দৌড়ে যেতে পারব না। চেষ্টা করেও কিছু করতে পারিনি। শেষে আমার গায়ের সঙ্গে অক্সিজেন সিলিন্ডার বেঁধে নিয়ে এসেছি। আমি বুঝতে পারছিলাম মায়ের কষ্ট হচ্ছে। আমি তখন মাকে একটি কথা বলেছিলাম, উপায় নেই মা। আমার মায়ের কষ্ট হচ্ছিল তা আমি সহ্য করতে পারিনি। যদিও মোটরসাইকেলের কথা শুনে মা প্রথম ভয় পাচ্ছিলেন।

নলছিটি থেকে বরিশাল আসতে গিয়ে দুই জায়গায় পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়েছে। প্রথমবার পুলিশ জিয়াউল হাসানকে থামিয়ে ছিল। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে গিয়ে জিয়াউল হাসান বলেন, বিশ্ববদ্যিালয়ের সামনে পুলিশ দেখে আমি অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে থেমে যাই। সেখানে অনেক পুলিশ লকডাউনের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

তখন নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিই, আমাকে পুলিশ থামাবেন না। কারণ আমার পেছনে রোগী আছে, আরো আছে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার। এটি অন্তত দেখে পুলিশ আমার সঙ্গে কোনো ঝামেলা বাঁধাবে না। রাস্তায় মোটরসাইকেল দাঁড়ানোর পর পুলিশ সদস্যরা আমার দিকে ছুটে আসেন। আমি পুলিশকে বলেছি, রোগী আমার মা। তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা আমাকে খুব একটা বিড়ম্বনা দেননি। তবে আমার ছোট ভাই ছিল পাশের আরেকটি মোটরসাইকেলে। তাকে থামিয়ে হেলমেটের বিষয়ে জানতে চেয়েছিল। আমি বলেছি, ওরা আমার (রোগী) সঙ্গে এসেছে। শেষে পুলিশ ওদের ছেড়ে দিয়েছে। তখন সেখানে অবস্থারত কেউ দৃশ্যটি মুঠোফোনে ধারণ করেন। ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠলে মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়।



সাতদিনের সেরা