kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

ভূমিহীন আজাহার আলীর আক্ষেপ

মুই তো একখান ঘর পাইলাম না!

মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট)   

১৪ এপ্রিল, ২০২১ ১৮:৩৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুই তো একখান ঘর পাইলাম না!

হুনছি পোরদান মোনতিরি (প্রধানমন্ত্রী) গরিবগো ঘর দ্যায়। মোর তো কোনো জায়গাজমি নাই। মুইতো একখান ঘর পাইলাম না। রাস্তার পাশে থাহি। কেউ তো মোর খোঁজও লয় না। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে সরকারি ঘর পেয়েছে বহু মানুষ। অথচ ভূমিহীন হয়েও সরকারি ঘর জোটেনি আজাহার আলী হাওলাদারের (৮০) ভাগ্যে। তাই এমন আক্ষেপ করে বলেলন কথাগুলো।

বাগেরহাটের শরণখোলার খোন্তাকাটা ইউনিয়নের মঠেরপাড় বটতলা এলাকার মহাসড়কের পাশে ছোট্ট একটি ঝুপড়ি ঘর। তার মধ্যে ১৮ বছর ধরে বসবাস করছেন ভূমিহীন আজাহার আলী। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় সড়কের পাশে পরিবার নিয়ে এখন মানবেতর দিন কাটছে তার।

এদিকে, বেশ কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার হচ্ছে আজাহার আলীর এই অসহায় দিনযাপনের চিত্র। ফেসবুকে ব্যাপক আলোচিত এই বিষয়টি। বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের ফেসবুক ওয়ালে সচিত্র তুলে ধরে মানবিক সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। তবে, এখন পর্যন্ত, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি বা ধনাঢ্য কেউ উঁকিও দেননি তার ঝুঁপড়িতে।

আজাহার আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তার এই ঝুঁপড়ি ঘরটি এ পর্যন্ত ৪-৫বার উচ্ছেদ করা হয়েছে। নিজের কোনো জমি নেই। সে কারণে উচ্ছেদের পর জোড়াতালি দিয়ে আবার সেখানেই ঝুঁপড়ি তোলেন। কয়েকমাস আগে বালু বোঝাই একটি ট্রলি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তার ঘরে মধ্যে ঢুকে পড়ে। তাতে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরটি। আবার কখন যে বাস-ট্রাক চাপা দিয়ে যায় সেই ভয়ে থাকেন সবসময়। তাছাড়া, সামনে ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম। ভাঙা ঘরে কিভাবে থাকবেন এই চিন্তায় পড়েছেন আজাহার ও তার স্ত্রী আসমা বেগম।

উপজেলার খোন্তাকাটা ইউনিয়নের মঠেরপাড় গ্রামের বটতলা এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে একচালা ছোট্ট একটি ঘর। পুরনো টিনের চাল-ব্যাড়ার সমস্ত জায়গায় অসংখ্য ফাঁকফুটো। তার মধ্যে স্ত্রী আসমা বেগম (৫০) এবং ছেলে আল-আমিনকে (১১) নিয়ে থাকেন বৃদ্ধ আজাহার আলী। স্ত্রী মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে যা পান তাই দিয়ে কোনোমতে চলে তিনজনের সংসার।

আজাহার আলী সেখানে একটি পাঞ্জেগানা মসজিদের দেখভাল করেন। আযান দেন, নামাজও পড়ান তিনি। কিন্তু কোনো পারিশ্রমিক নেন না সেখান থেকে। ছেলেটি পাশের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। কিন্তু টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়াতে পারেন না। ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে চান। সেই স্বপ্ন আদৌ পূরণ হবে কি না তাও জানেন না তারা।

একসময় উপজেলা সদর রায়েন্দা বাজারে রুটির দোকান ছিল আজাহার আলীর। ছোটবড় সবার এই ‘আজাহার ভাই’ যৌবনে খুবই রসিক মানুষ ছিলেন। বাঁশি বাজাতেন, মারেফাতি গানও গাইতেন। বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যেমন খুশি তেমন সেজে আনন্দ দিতেন মানুষকে। সেই রসিক ও সংস্কৃতিমনা মানুষটির শরীর এখন আর চলছে না। বার্ধক্যে এখন লাঠিই তার চলার একমাত্র অবলম্বন।

স্ত্রী আসমা বেগম বলেন, সরকারতো অনেক কিছুই দ্যায়। মোরাতো পাই না। রাস্তার পাশে ভাঙ্গা ঘরে রাইতে ঘুম আয় না (আসেনা)। এইরহম ঘরে কি কোনো মানুষ থাকতে পারে? সরকার যদি মোগো একখান ঘর দেতো তাইলে না খাইয়া থাকলেও শান্তিতে ঘুমাইতে পারতাম।

মঠেরপাড় গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য মো. সহিদুল ইসলাম আকন বলেন, আজাহার আলী স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে আছেন। সড়কের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন। সরকারের কাছে এই অসহায় ভূমিহীন পরিবারকে একটি ঘর দেওয়ার দাবি জানাই।

খোন্তাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন খান মহিউদ্দিন বলেন, আহাজার আলীর ঘরটি যখন বালুর ট্রলির আঘাতে ভেঙে যায়, তখন তাকে গৃহহীন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু তার যে জমিজমা নেই তা জানা ছিল না। তাকে এবার বয়স্কভাতার কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ এলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাকে ঘর দেওয়া হবে।

শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



সাতদিনের সেরা