kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বোরোর ক্ষেতে কৃষকের বৈশাখ

হাওরে ধান কাটার ধুম, ৪ হাজার শ্রমিকের সঙ্গে ব্যস্ত ২৪৩টি যন্ত্র

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ    

১৪ এপ্রিল, ২০২১ ১২:০৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হাওরে ধান কাটার ধুম, ৪ হাজার শ্রমিকের সঙ্গে ব্যস্ত ২৪৩টি যন্ত্র

দেশের বোরো ভাণ্ডারখ্যাত সুনামগঞ্জ। জেলার প্রায় আড়াই লাখ চাষি পরিবার বোরো চাষে জড়িত। হাওর থেকে বছরে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিকটন চাল উৎপাদন হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অর্ধেকেরও বেশি চাল উদ্বৃত্ত থাকে। তাই কোনো দুর্যোগে হাওরের ফসলহানি ঘটলে জাতীয়ভাবে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। তাই করোনার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে পয়লা বৈশাখেও হাওরে নেমেছে কৃষক। কষ্টের ধান গোলায় তুলতে তাদের পরিবারের সদস্যরাও মাঠে নেমেছেন। 

সরকারি হিসেবে আজ বুধবার পর্যন্ত জেলায় চাষাবাদের মোট প্রায় ৫ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে বিভিন্ন স্থানে ধানকাটা ব্যাহত হচ্ছে বলে কৃষকরা জানান। তবে হাওরের ধান যাতে দ্রুত কাটা হয় সে লক্ষ্যে এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ২৪৩টি ধান কাটার মেশিনসহ বাইরের জেলা থেকে ৪ হাজারেরও অধিক শ্রমিক হাওরে নিয়ে আসা হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই হাওরে ধান কাটার ধুম পড়বে বলে জানান কৃষকরা।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নব্বই দশক পর্যন্ত ধান কাটার মৌসুমে সুনামগঞ্জে বাইরের জেলার হাজার হাজার মৌসুমি শ্রমিক ধান কাটতে আসতেন। এখন তাদের আর্থসামাজিক উন্নতির কারণে শ্রমিক আসা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। গত বছর করোনা মহামারির কারণে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বাইরের জেলা থেকে শ্রমিক নিয়ে আসা হয়। এবারও সরকারিভাবে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, পাবনাসহ কয়েকটি জেলা থেকে ৪ হাজার ১০৩ জন শ্রমিক এসেছেন হাওরে। আরো কয়েকটি জেলার শ্রমিকরাও কিছুদিনের মধ্যে এসে হাওরে ধান কাটায় যুক্ত হবেন বলে জানা গেছে। সরকার মহামারি করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে যে লকডাউন ঘোষণা করেছে, হাওরের শ্রমিকদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে তা কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।

জানা গেছে, এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেকোনো মূল্যেই হাওরের বোরো ধান কাটতে সব ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন। হাওরে বোরো ফসল রক্ষায় তিনি এ বছর ১৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার পর এখন ফসল পাকার উপক্রম হয়েছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় কৃষকের কষ্টের ধান যাতে শ্রমিকের অভাবে ক্ষেতে নষ্ট না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রতিদিনই কৃষি মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা হাওরে ঘুরছেন। 

এর মধ্যে হাওরের ধান কাটতে সরকারিভাবে ৮৯টি ধান কাটার মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। গতবারের বিতরণকৃত আরো ১২৯টি মেশিনও হাওরে কাজ করছে। তা ছাড়া কৃষকদের অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরো ২৫টি মেশিন হাওরে নামিয়েছেন। স্থানীয় ১ লাখ ৮৩ হাজার শ্রমিকও ধান কাটছেন বিভিন্নভাবে। তা ছাড়া স্থানীয় বালু ও পাথর মহাল বন্ধ থাকায় সেখানকার শ্রমিকরাও হাওরের ধানকাটায় এসে যুক্ত হবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হাওরের কৃষকরা জানিয়েছেন, এ বছর মৌসুমি বৃষ্টি না হওয়ায় ধানের ফলন কমেছে। অনেকের ক্ষেত পরাগায়ণের সময় গরম বাতাসে হয়ে নষ্ট গেছে। তা ছাড়া কমবেশি সব কৃষকের জমিতেই বৃষ্টির অভাব বাম্পার ফলনের সম্ভাবনাটা নষ্ট করেছে বলে জানিয়েছেন তারা। তবে কৃষি বিভাগ বলেছে, বাম্পার ফলনে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। পুরো ফসল গোলায় তুলতে পারলে লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে না।

কৃষি বিভাগের মতে, জেলায় চলতি বছর ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত করা হলেও আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৩০ হেক্টর। এর মধ্যে বিআর ২৮ ধান ৬৭ হাজার হেক্টর এবং বিআর ২৯ ধান আবাদ হয়েছে ৬৩ হাজার হেক্টর জমিতে। বাকি ধান হাইব্রিডসহ কিছু দেশীয় প্রজাতিও রয়েছে। বর্তমানে বিআর ২৮ ও দেশি প্রজাতির ধান কাটছেন কৃষকরা। আগামী সপ্তাহের মধ্যে পুরোদমে ধান কাটার ধুম পড়বে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাসমূহের গাণিতিক মডেল পর্যালোচনা করে পূর্বাভাস দিয়েছে, ১১ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের উত্তরপূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত হবে। হাওরের মাথার ওপর অবস্থিত আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়েও বৃষ্টিপাত হবে। এতে হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা হতে পারে। কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভারতের মেঘালয় ও আসামে ভারী বৃষ্টিপাত হলে সুনামগঞ্জে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পানি বৃদ্ধি পায়। এই পানি হাওরে প্রবেশ করে বোরো ফসলকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। যে কারণে হাওরে ফসলহানির আশঙ্কা থাকে। যার ফলে কৃষকরাও উদ্বিগ্ন থাকেন।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরের বাহাদুরপুর গ্রামের কৃষক নূরুল হক বলেন, আমি এক সপ্তাহ আগেই বিআর ২৮ ধান কাটতে শুরু করেছি। ধীরে ধীরে আমার অন্য ক্ষেতের ধানও পাকছে। তবে কাঙ্ক্ষিত শ্রমিক মিলছে না। তিনি বলেন, এ বছর বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ধানে কিছুটা চিটা দেখা যাচ্ছে। এখন দিন ভালো থাকলে আশা করি সব ফসল কাটতে পারবো।

শাল্লা উপজেলার উদগল হাওরের রামপুর গ্রামের কৃষক ঝান্টু কুমার দাস বলেন, আমাদের হাওর এখনো প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগের মুখে পড়েনি। আমি ৬০ শতক দেশি বোরো ও ৯০ শতক হাইব্রিড ধান কেটেছি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই আমাদের হাওরে ধান কাটার ধুম পড়বে।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ফরিদুল হাসান বলেন, ধান কাটতে বাইরের জেলা থেকে শ্রমিক নিয়ে আসার পাশাপাশি প্রায় আড়াই শ ধান কাটার মেশিন হাওরে রয়েছে। এ মাসের মধ্যেই আমরা আশা করছি ৮০ ভাগ ধান কাটা শেষ হবে। তিনি বলেন, অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টিতে কিছু চিটা হয়। তবে এবার হাওরের গড় ফলনে এতে কোনো প্রভাব পড়বে না। শ্রমিকেরও অভাব হবে না। প্রাকৃতিক বড় দুর্যোগ না এলে এবারও কাঙ্ক্ষিত ফলন আসবে হাওর থেকে। আজ পয়লা বৈশাখেও দলে দলে কৃষকরা মাঠে নেমেছেন।

সুনামগঞ্জ-৩ আসনের এমপি ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাওরবাসীর প্রতি খুবই আন্তরিক। হাওরের ফসল গোলায় তুলতে সব ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, একসময় বাইরের জেলার শ্রমিকরা আসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু গত বছর থেকে তারা আবার আসতে শুরু করেছেন। তাই আমাদের ফসল কাটার উদ্বেগ কমেছে। এবারও হাওরবাসীর মুখে হাসি ফোটাবে বোরো ধান।



সাতদিনের সেরা