kalerkantho

রবিবার । ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৩ জুন ২০২১। ১ জিলকদ ১৪৪২

কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে 'নীলপূজা'

বেতাগী (বরগুনা) প্রতিনিধি   

১২ এপ্রিল, ২০২১ ১২:৪৮ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে 'নীলপূজা'

উপকূলীয় জনপদ বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলায় চৈত্র মাসের শেষের দিকে প্রত্যন্ত গ্রামবাংলায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ির উঠোন কিংবা হাটবাজারে দেখা মেলে নীল নাচের দলের পরিবেশনা। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এ দলগুলো বেশ সংকুচিত হয়ে এসেছে। নীল নাচ ও পূজার ঠিক আগের মতো যত্রতত্র দেখা মিলছে না।

জানা গেছে, হিন্দু ধর্মের পৌরাণিক ধর্মমতে দেবতা শিব সমুদ্র মন্থনে বিষপান করে নীল কণ্ঠ ধারণ করেছিলেন। আবার বৈদিক হিন্দু ধর্মমতে, সূর্য অস্ত গেলে চারিধার গাঢ় অন্ধকার হয়ে আসে। গাঢ় অন্ধকার নীল বর্ণের হয়। এখানে বছরের আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার প্রতীকী হলো এই নীল। চৈত্রসংক্রান্তির দিনে নীল পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সনাতনীদের শাস্ত্রীয় মতে, পুরনো বছরকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরে সংকট কেটে সুখ ও সমৃদ্ধির আশায় শিবের আরাধনা বা শিবের গাজন অনুষ্ঠিত হয়। চৈত্র শেষে শিবের গাজন উৎসবই হলো নীলপূজা।

প্রাচীন কাল থেকে বেতাগী উপজেলায় চৈত্র মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে এবং চৈত্র সংক্রান্তির দিন পূজার মধ্যে সমাপ্তি ঘটতো এই নীল পূজার। এ সময়টাতে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে 'নীল নাচ' দেখা মিলতো। প্রতিটি নীল নাচের দলে ১০/১২ জনের রাধা, কৃষ্ণ, শিব, পার্বতী, নারদসহ সাধু পাগল (ভাংরা) সেজে সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি নীল নাচ গান পরিবেশন করেন। গ্রাম বাংলার সকল মানুষের কাছে দারুণ উপভোগ্য এই নীল নাচ। নীল নাচ দেখার জন্য এলাকার সব ধর্ম-পেশার মানুষ জড়ো হতো। বিনোদনের এবং ধর্মীয় হিসেবে মনের যথাযথ চাহিদা মিটতো। চৈত্রসংক্রান্তি মেলার শেষ দিনে নীল পূজা শেষে শেষ হতো এ নীল নাচ। নীলপূজার জন্য নীল নাচের দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল, ডাল আর নগদ অর্থ সংগ্রহ করে। নীল পূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের (হিন্দু) ধর্মীয় উৎসব হলেও চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব একসময়  তা সর্বজনীন এক উৎসবে পরিণত হয়।

বেতাগীর কবিরাজবাড়ির মাঠে শত বছর ধরে গ্রামের নীলপূজা ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব মেলায় নীল নাচ পরিবশেন হয়েছে। নীল নাচ ঠিক আগের মতো যত্রতত্র দেখা মেলে না। কালের পরিক্রমায় বাঙালির এ ঐতিহ্যের সংস্কৃতি বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে।

এ বিষয় নীল নাচের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সদানন্দ দেবনাথ জানান, 'নীল নাচের শিল্পীদের সংগ্রহ করতে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয় তা এখন আর সংগ্রহ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে বন্ধ করে দিয়েছি নীল নাচ।'

এ নীল নাচের দলের শিল্পী  রমেশ দাস জানান, চৈত্র মাসের তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহ ধরে ১২/১৫ সদস্যের নীল দল গ্রামাঞ্চলে নাচ-গান করে মানুষের মনোরঞ্জন করে। নীলপূজা কমে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে নীল দলের নাচও তেমন আর দেখা মিলছে না। ঐতিহ্যের এ নীল নাচ ও পূজা ক্রমেই বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে।

এ বিষয় বেতাগী সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও বাংলা বিভাগের বিভাগী প্রধান মনোরঞ্জন বড়াল বলেন,'এক সময় এ অঞ্চলে চৈত্রের শেষে নীল নাচ ও পূজা হতো। কালের আবর্তে হারিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্টদের এ সংস্কৃতি ধরে রাখতে এগিয়ে আসা দরকার।'



সাতদিনের সেরা