kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ বৈশাখ ১৪২৮। ৭ মে ২০২১। ২৪ রমজান ১৪৪২

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তাণ্ডব: খোলস পাল্টে হামলাকারীরা 'গায়েব'!

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া    

১১ এপ্রিল, ২০২১ ১২:৩৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তাণ্ডব: খোলস পাল্টে হামলাকারীরা 'গায়েব'!

ফাইল ছবি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকায় ভ্রাম্যমাণ দোকানি (হকার) এখন অনেকটাই কম। খালিচোখে মনে হতে পারে, লকডাউনের আদলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা চলতে থাকায় শহরে হকারের সংখ্যা কমে গেছে। প্রশাসনের ভয়ে কিংবা কম বিক্রির চিন্তা থেকে হয়তো তারা দোকান নিয়ে বসতে চাইছেন না।

তবে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন তথ্য। হেফাজতের তাণ্ডবের সময় বিশেষ করে ২৮ মার্চ হরতালের দিন তাণ্ডবে অনেক হকার অংশ নিয়েছিলেন। আর ওই হকাররা এখন ‘খোলস’ পাল্টিয়ে নিজেদেরকে বাঁচানোর চেষ্টায় ব্যস্ত। 

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, ওই হকাররা এখন বিভিন্ন তাবলীগের দলে যোগ দিয়েছেন। পুলিশের কাছেও এ বিষয়ে তথ্য রয়েছে। যেকোনো সময় তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান হতে পারে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে কিছু বলা হচ্ছে না। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৮ মার্চ পুলিশ লাইনসে হামলাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলায় হেফাজত ইসলাম নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বহিরাগতরা অংশ নেন। তাদের অনেকেই প্যান্ট-শার্ট পড়ে অংশ নেন হামলায়। ওই হামলাকারিরা জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী হবে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশও ওই সূত্র ধরে কাজ শুরু করে। হামলায় সদর উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের লোকজনও নেন বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়। হামলাকারীদের বেশিরভাগই ওইসব গ্রামের লোকজন, যারা মূলত হকার হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি কিছু অটোরিকশা চালকও রয়েছেন। মূলত তারা হামলার পাশাপাশি লুটপাটে অংশ নেন। 

একাধিক সূত্র মতে, তাণ্ডবের ঘটনায় সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণের পর ওই হামলাকারীরা কিছুটা ভড়কে যান। এ অবস্থায় তারা গাঢাকা দিতে শুরু করেন। গ্রেপ্তার এড়াতে তাদের অনেকে এখন তাবলীগ জামায়াতে অংশ নিতে শুরু করেছেন। 

এদিকে, হেফাজতের তাণ্ডবের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ তাদের ‘শক্তি’ বাড়াতে শুরু করেছে। যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই থানাসহ জেলার ২৭টি পুলিশের স্থাপনায় বিশেষ নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়েছে। আনা হয়েছে ‘আধুনিক’ অস্ত্র ও গুলি। বাড়ানো হচ্ছে পুলিশের জনবল।  

ছিনিয়ে নেয়া গুলি উদ্ধার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তাণ্ডবের সময় লুটে নেয়া ২০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- সদর উপজেলার সুহিলপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ কেন্দুবাড়ির মৃত ছামির আলীর ছেলে আরব আলী ও সুহিলপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার মৃত রমিজ মিয়ার ছেলে মো. মনির মিয়া।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. রইছ উদ্দিন গুলি উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গুলি ছিনতাইয়ের ঘটনায় মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের নায়েক মো. মহিউদ্দিন বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় মামলা করেছিলেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, গত ২৭ মার্চ বিকেলে মৌলভীবাজারের দুই পুলিশ সদস্য সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে আসামি নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরে যাচ্ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নন্দনপুরে হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় অটোরিকশাটি আটকে পুলিশকে মারধর করে ২০ রাউন্ড গুলি ছিনিয়ে নেয়া হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরম্ন করে পুলিশ। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার দুজনকে গ্রেপ্তার ও গুলি উদ্ধার করা হয়। 

অতিরিক্ত সচিবের পরিদর্শন
হেফাজতের তাণ্ডবের সময় ভাঙচুর ও আগুনে পুড়িয়ে দেয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভাসহ সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) দীপক চক্রবর্তীর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। গতকাল শনিবার দুপুরে প্রতিনিধি দলটি পুড়িয়ে দেয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা কার্যালয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাব ভবন, সুর সম্রাট দি আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গন, সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তন, সদর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) এর কার্যালয়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বর, জেলা পরিষদ কার্যালয়, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যালয়সহ তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত  বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শনকালে অতিরিক্ত সচিব দীপক চক্রবর্তী উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এরই আলোকে আমরা পরিদর্শনে এসেছি। এর আগে জেলা প্রশাসক, পৌরসভা ও জেলা পরিষদ থেকে পাঠানো রিপোর্ট আমরা পর্যালোচনা করেছি। আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকারের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবো।
 
পরিদর্শনকালে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. তানভীর আজম সিদ্দিকী, জেলা পরিষদ শাখার উপ-সচিব মো. ফারুক হোসেন, পৌরশাখার উপসচিব শায়লা ফারজানা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খাঁন, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর সভার মেয়র নায়ার কবির, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আল-মামুন সরকার, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পঙ্কজ বড়ুয়া, জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা অঞ্জন দাস, সহকারি কমিশনার (ভূমি) এ বি এম মশিউজ্জামান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সচিবের কাছে ক্ষতির বর্ণনা তুলে ধরা হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত ২৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত হেফাজত ইসলামের তাণ্ডবের ঘটনা ঘটে। ওই তিন দিনের তাণ্ডবে প্রায় একশ'র মতো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সহযোগী নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় পুলিশের গুলিতে অন্তত ১৩ জন মারা যায়। এসব ঘটনায় ৪৯টি মামলা হলে পুলিশ দুই হেফাজত কর্মীসহ ৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করে। তবে মামলায় দুই শতাধিক এজাহারনামীয়সহ অজ্ঞাতনামা ৩৫ হাজার জনকে আসামি করা হয়।



সাতদিনের সেরা