kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

মদ-গাঁজা-ইয়াবায় ভরপুর ঈশ্বরদী, উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা

ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি   

৭ এপ্রিল, ২০২১ ২০:৩৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মদ-গাঁজা-ইয়াবায় ভরপুর ঈশ্বরদী, উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প (আরএনপিপি) ঘিরে রাশিয়ানসহ বিভিন্ন বিদেশি নাগরিকদের ঈশ্বরদী-রূপপুর-দিয়াড় সাহাপুরে বসবাস। তাদের সঙ্গ দিচ্ছেন এ দেশীয় শ্রমিক ও দোভাষিরা। বিগত সময়ের তুলনায় বর্তমানে ঈশ্বরদীতে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে মদ, চোলাই মদ, গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদক। রাশিয়ানদের হাত হয়ে নানা রকম মদ যাচ্ছে বাঙালিদের হাতে। আর বাঙালিদের হাত হয়ে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল যাচ্ছে রাশিয়ানসহ আরএনপিপিতে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের হাতে। কিশোর, যুবক, মধ্য বয়সীসহ ছাত্রদের হাতেও দেখা যাচ্ছে মদের বোতল। তাতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় অভিভাবকরা।

বর্তমানে মাদকে ভরপুর হয়ে গেছে গোটা ঈশ্বরদী। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নারী ও জুয়া ব্যবসা। আর তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এর মধ্যেই স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঈশ্বরদীর খুবই আলোচিত রিসোর্ট মালিককে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু রিসোর্টে রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাংবাদিকসহ বিশেষ ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের নানা সময় আমন্ত্রণ জানিয়ে ভুরিভোজের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন রিসোর্টের চতুর মালিক।

রূপপুর পুলিশ ফাঁড়ি, থানা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ঈশ্বরদী সার্কেল অফিস সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে (আরএনপিপি) রাশিয়ানসহ বিভিন্ন বিদেশি ও এ দেশীয় কর্মকর্তা, শ্রমিক এবং দোভাষিসহ প্রায় ২০ হাজার লোক ২৪ ঘণ্টা কর্মরত রয়েছেন। এদের টার্গেট করে ঈশ্বরদী শহর, জয়নগর, সাহাপুরে কয়েকজন ব্যক্তি থ্রি স্টার, ফাইভ স্টার হোটেলের আদলে রিসোর্ট নির্মাণ করেছেন। সেখানেই চলছে রমরমা মদ, জুয়া ও নারী ব্যবসা। এ জন্য এসব রিসোর্টে রাশিয়ানসহ বিদেশি নাগরিক ও দোভাষিদের ব্যাপক ভিড়। রিসোর্টে তাদের কদরও খুবই বেশি। প্রতিদিনই এসব রিসোর্টে বিদেশি নাগরিকদের নিয়ে বসছে মনোরম জলসা। চলে মদ ও নারীর তীব্র উন্মাদনা। আর বিশেষ বিশেষ দিবসগুলোতে রিসোর্টগুলো হয়ে ওঠে মদ, নারী ও জুয়ার বালাখানা। ফোটানো হয় হরেক রকমের বাজি। বাজানো হয় খুবই উচ্চ কম্পনশীল বাজনা। তখন রিসোর্টগুলোর আশপাশে বসবাসকৃত পরিবারগুলো শব্দে ও উন্মাদনায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। বিভিন্ন মহলে অভিযোগ করেও রিসোর্টের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে প্রশাসনকে দেখা যায়নি। উল্টো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ঈশ্বরদী সার্কেলের এক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, বিগত ২০২০ সালে ৩১ ডিসেম্বরকে টার্গেট করে ঈশ্বরদীর আলোচিত রিসোর্ট মালিক কয়েক কোটি টাকার মদ আমদানি করেন। সেই সময় তিনি বেশ ঝামেলায় পড়েন। তখন প্রায় ১৭ লাখ টাকা ব্যয় করে সেই ঝামেলা থেকে মুক্ত হন সেই রিসোর্ট মালিক।

মাদককে না বলুন (মানাব) সভাপতি ও কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সভাপতি মাসুম পারভেজ কল্লোল জানান, ঈশ্বরদীতে বর্তমানে মদসহ মাদকের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। রূপপুর প্রকল্পে কর্মরত রাশিয়ানদের সাংস্কৃতি অনুসারে তাদের নিকট লাইসেন্সপ্রাপ্ত মদ বিক্রেতা মদ বিক্রয় করবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ওই দোকান ও রিসোর্টের নামে অবৈধভাবে বাঙালি যুবসমাজের নিকট মদ বিক্রয় করাটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। এভাবে যার তার নিকট মদ বিক্রয় করা অব্যহৃত থাকলে যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ঈশ্বরদী সার্কেলের পরিদর্শক ছানোয়ার হোসেনের অনুপস্থিতিতে সহকারী পরিদর্শক (এসআই) মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত রাশিয়ানসহ বিদেশি নাগরিকদের কথা বিবেচনা করে সরকার উপজেলার চর সাহাপুরে মদের একটি বারের লাইসেন্স দিয়েছে। তার পাশেই রাশিয়ানদের মালিকানাধীন অর্গানাগোস্তরায় নামক একটি কম্পানির পক্ষ থেকে রেসপবলিকা নামক একটি মদের বার ও ক্লাব চালু করা হয়েছে। সেটার কোনো লাইসেন্স নেই। সেখানে শুধু মাত্র ২৮০ জন রাশিয়ানসহ বিদেশি নাগরিক মদ পান করেন। এ ছাড়া ঈশ্বরদীসহ নতুনহাট, চর সাহাপুর, সলিমপুর ও জয়নগরের যেসব জায়গায় মদ বিক্রয় করা হচ্ছে সেগুলো অবৈধ।

তিনি আরো জানান, এসব রিসোর্টে বিদেশিরা অবস্থান করেন। অভিযান চালিয়ে মদ জব্দ বা আটক করা হলে সেগুলো নিজেদের বলে দাবি করেন বিদেশিরা। তখন সেগুলো ছেড়ে দিতে হয়। কারণ তাদের পাসপোর্টে মদ বহনের অনুমোদন রয়েছে। তা ছাড়া সরকারিভাবে প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য বিশেষ সুযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে ঈশ্বরদীতে মাদকদ্রব্যের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায়ই অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন এই কর্মকর্তা। 

রূপপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (এসআই) আতিকুল ইসলাম আতিক কালের কণ্ঠকে জানান, প্রকল্পে কর্মরত রাশিয়ানসহ বিদেশি নাগরিকরা তাদের সঙ্গে কাজ করা এ দেশের কিছু শ্রমিক ও দোভাষির মাধ্যমে গাঁজা গ্রহণ করছে। এই সুবাদে এ দেশের শ্রমিক ও দোভাষিরা রাশিয়ানদের নিকট থেকে মদ নিচ্ছে। এই কারণে এলাকায় মাদকের ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারিতে রেখে প্রায়ই মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করে মামলা প্রদান করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। 

ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফিরোজ কবির কালের কণ্ঠকে জানান, সম্প্রতি মাদক কারবারিরা পুলিশের বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দপ্তরে লিখিতভাবে অভিযোগ করছে। সেই অভিযোগগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে পুলিশ সদস্যরা। বর্তমানে মাদকের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এই সুযোগটিই মাদক কারবারিরা গ্রহণ করেছে। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকার মতো ঈশ্বরদীতেও মাদকের প্রখরতা কিছুটা বেড়েছে। তবে মাদক প্রতিরোধে পুলিশ জিরো টলারেন্স। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান। খুবই শিগগিরই এই অভিযান জোরদার করা হবে। 

তিনি আরো জানান, রিসোর্ট নির্মাণ করে বিদেশিদের নিকট অবৈধভাবে মদ বিক্রয় করার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। বিদেশি নাগরিকদের কথা বিবেচনা করে অবৈধভাবে মদ বিক্রয় না করার জন্য প্রাথমিকভাবে রিসোর্ট মালিককে সতর্ক হয়েছে। তাতে কাজ না হলে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা