kalerkantho

বুধবার । ২ আষাঢ় ১৪২৮। ১৬ জুন ২০২১। ৪ জিলকদ ১৪৪২

মির্জাপুরে কালচারাল অফিসার হত্যা

যৌতুক দিতে অস্বীকৃতি হত্যার কারণ বলে দাবি পরিবারের

টাঙ্গাইল ও মির্জাপুর প্রতিনিধি   

২৯ মার্চ, ২০২১ ০৯:১৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যৌতুক দিতে অস্বীকৃতি হত্যার কারণ বলে দাবি পরিবারের

ঘাতক স্বামী মিজান ও নিহত রেদওয়ানা

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে জেলা কালচারাল অফিসার খন্দকার রেদওয়ানা ইসলামক শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় মির্জাপুর থানায় মামলা করা হয়েছে। শনিবার রাতেই নিহতের ছোট ভাই খন্দকার মো. আরশাদুল আবিদ বাদী হয়ে রেদওয়ানার স্বামী মো. দেলোয়ার হোসেন মিজানকে আসামি করে এই মামলা দায়ের করেন।

চাহিদামত যৌতুকের দাবী পূরণ করতে না পারায় সৃষ্ট দাম্পত্য কলহের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে মামলার বাদী ও পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন।

২২ মার্চ কন্যাসন্তান প্রসবের পর শনিবার (২৭ মার্চ) বিকেলে মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালের দোতলায় ১১ নম্বর কেবিনে রেদওয়ানা ইসলামকে বালিশ চাপা ও গলায় ওড়না পেচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পালিয়ে যায় পাষণ্ড স্বামী দেলোয়ার।

দেলোয়ার পাবনা সদর উপজেলার হেমায়েতপুর চার ভাঙ্গারিয়া গ্রামের মো. এলাহী মোল্লার ছেলে। তিনি সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ভোলা সদরের মহাজনপট্টি শাখায় কর্মরত বলে জানা গেছে।

নিহত রেদওয়ানা ইসলাম রংপুর সদর থানার ইসলামপুর হনুমানতলার মৃত খন্দকার রফিকুল ইসলামের মেয়ে।

রেদওয়ানার ছোট বোন খন্দকার ফাদওয়ানা ইসলাম ও ছোট ভাই খন্দকার আরশাদুল আবিদ জানান, দেলোয়ার ২০০৪ সালে প্রথম বিয়ে করেন। তাদের সংসারে ১২ বছরের আরনাফ নামে এক পুত্র সন্তান রয়েছে। সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক টাঙ্গাইল শাখায় কর্মরত থাকাবস্থায় ২০১৯ সালের ১৮ মে তাদের বোন রেদওয়ানা ও দেলোয়ার নিজেদের পছন্দে বিয়ে করেন। এটা ছিল উভয়ের দ্বিতীয় বিয়ে। বিয়ের কিছুদিন যেতেই দেলোয়ার হোসেন মিজানের আসল চেহারটা ফুটে উঠে। প্রায়ই সে বিভিন্ন অজুহাতে রেদওয়ানার নিকট টাকা দাবি করত। চাহিদামত টাকা দিতে না পারলেই চলত শারিরিক ও মানসিক নির্যাতন। বিয়ের দুই বছরে রেদওয়ানার কাছ থেকে দেলোয়ার ১৫ লাখ টাকা নিলেও সম্প্রতি আরো ৪০ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকার জন্য দেলোয়ার একটি ফাঁকা চেকে রেদওয়ানার স্বাক্ষর নিয়ে রাখে। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শুরু হয় দাম্পত্য কলহ। এরইমধ্যে রেদওয়ানার অন্তঃসত্ত্বা হওয়াটা দেলোয়ার মানতে পারেনি। যে কারণে রেদওয়ানার গর্ভপাত ঘটানোর চেষ্টাও করে স্বামী দেলোয়ার।

সোমবার (২২ মার্চ) সকালে প্রসব ব্যাথা নিয়ে রেদওয়ানা ইসলাম কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি হন। ওইদিন সকাল ১০টায় সিজারিয়ান অপারেশনের মধ্যেমে তিনি একটি মেয়ে শিশুর জন্ম দেন। শুক্রবার (২৬মার্চ) হাসপাতাল থেকে তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। তবে মেয়ে কিছুটা অসুস্থ থাকায় তিনি ছুটি না নিয়ে হাসপাতালের দু’তলার ১১ নম্বর কেবিনে থেকে যান। আর শিশুটিকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের তিনতলায় থাকা ইনকিবিউটরে রাখা হয়। রেদওয়ানা ইসলামকে দেখভালের জন্য সঙ্গে থাকা তার মামী খোদেজা বেগম ও তার শিশু সন্তানের দেখভালের জন্য মর্জিনা বেগম কাছে থাকতেন। শনিবার দুপুরে স্বামী আসায় শিশুটিকে মায়ের বুকের দুধ খাইয়ে খোদেজা ও মর্জিনা পুনরায় তিনতলায় নিয়ে যান। সাড়ে তিনটার দিকে বাচ্চাকে পুনরায় দুধ খাওয়ানের জন্য খোদেজা বেগম ফিরে এসে কেবিনের দরজার তালা আটকানো দেখেন। ডাকাডাকির পরও ভেতর থেকে কেউ দরজা না খোলায় কর্তব্যরত সেবিকাকে তিনি বিষয়টি জানান। পরে কেবিনটির ইনচার্জ সেবিকা অনুরাধা এসে দরজা অতিরিক্ত চাবি দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকে মরদেহ দেখতে পান।

এদিকে রেদওয়ার প্রসব করা ছয়দিন বয়সের কন্যাসন্তানটি শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধী রয়েছে। শিশুটির অবস্থা ভাল রয়েছে বলে কুমুদিনী হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।

অপরদিকে টাঙ্গাইল শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজে রেদওয়ানার ময়নাতদন্ত শেষে টাঙ্গাইল শিল্পকলা একাডেমীতে রবিবার বাদ জোহর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তার মরদেহ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। রংপুরে তার দ্বিতীয় জানাজা শেষে রাতে দাফন করা হয়েছে।

সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ভোলা মহাজনপট্রি সদর শাখার শাখা ব্যবস্থাপক মো. জামাল হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, দেলায়ার হোসেন মিজান গত বছর মার্চ মাসে টাঙ্গাইল সদর শাখা থেকে আমার শাখায় যোগদান করেন। তার পারিবারিক ঝামেলা ছিল বলে আমাদের জানিয়েছিলেন। স্ত্রীর ডেলিভারির কথা বলে ২২ মার্চ তিনদিনের ছুটি নিয়ে মির্জাপুরে যান। আজ কর্মস্থলে যোগদানের কথা থাকলেও আসেননি। কর্মস্থলে যোগদানের জন্য তার ঠিকানায় পত্র পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মির্জাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাহজাহান খান বলেন, এ ঘটনায় নিহতের স্বামী মিজান পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের লাশ পরিবারের কাছে হন্তান্তর করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ ছিল। বিরোধ মিমাংসা করতে জেলা কর্মকর্তারা একটি উদ্যোগও নিয়েছিলেন। সেই কলহের জের ধরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখছি। আসামি মিজানুর রহমানকে ধরতে আমরা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।

মির্জাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রিজাউল হক বলেন, শনিবার রাতে নিহতের ছোট ভাই বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। ঘাতক দেলোয়ার হোসেন মিজানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।



সাতদিনের সেরা