kalerkantho

রবিবার। ২৮ চৈত্র ১৪২৭। ১১ এপ্রিল ২০২১। ২৭ শাবান ১৪৪২

শিক্ষা আইনের খসড়া চূড়ান্ত

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়ক বই বিনামূল্যে দেওয়ার দাবি

আবদুল কাদির, পার্বতীপুর (দিনাজপুর)   

২০ মার্চ, ২০২১ ১৭:৩৫ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়ক বই বিনামূল্যে দেওয়ার দাবি

‘পাঠ্যপুস্তকের বিষয় অনুমোদন ছাড়া পত্রিকায় প্রকাশ নয়’। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এই শিরোনামে জাতীয় একটি দৈনিকের শেষের পৃষ্ঠায় শিক্ষা আইনের খসড়া বিষয়ক একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে। এই দিন দৈনিক কালের কণ্ঠ, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনসহ জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রায় সকল দৈনিকে শিক্ষা আইনের খসড়া বিষয়ক সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনামে ভিন্নতা থাকলেও মূল বিষয়বস্তু প্রায় একই রকম। 

প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে আলোচনার পর প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে সহায়ক বই, কোচিংসহ  যে বিষয়গুলো নিয়ে এতদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে, সেই বিষয়গুলো রেখেই খসড়া চূড়ান্ত হচ্ছে। এতে সরকারের অনুমোদন ও নিবন্ধন নিয়ে সহায়ক বই ও কোচিং চালানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। 

পত্রিকায় প্রকাশের আগের দিন ১৬ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) বেলা সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যে ৬টা পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষা আইন প্রনয়ন করতে সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষা মন্ত্রী ডা. দীপু মণি। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব, কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিব, অতিরিক্ত সচিব প্রমুখ।

উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, দীর্ঘ বৈঠকের পর অবশেষে শিক্ষা আইন -২০২০ এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। ছোটখাটো বানান ছাড়া আর কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। শিগগিরই এটি মন্ত্রিপরিষদ সভায় পাঠানো হবে।এরপর ভাষাগত সংশোধনের জন্য আইন মন্ত্রণালয় হয়ে জাতীয় সংসদে উত্থাপন হবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে এটি কার্যকর হবে। 

এদিকে, বৈঠকসূত্র বলেছে, কোনো ধরনের নোট বই, গাইড বই মূদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত করা যাবে না। কেউ এই বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে নোট গাইড বই বন্ধ করা হলেও সরকারের অনুমোদন নিয়ে সহায়ক পুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত করা যাবে। 

এ ব্যপারে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের সহায়ক বই ক্রয়ে বা পাঠে বাধ্য করতে পারবে না। এমনটি করলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে। এ বিষয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পৌর এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. আনছার আলী বলেন, শিক্ষকদের সব ছাত্রছাত্রী সমীহ করে থাকে। তাই তাদের সব কথা শিরোধার্য মনে করে পালন করে থাকে। তবে, শিক্ষকেরা যা বলে থাকেন তা প্রধানশিক্ষক অথবা কমিটির সাথে প্রকাশণির চুক্তির মধ্যে পড়ে বলে অভিভাবকেরা মনে করে থাকেন। 

পার্বতীপুর শহরের একটি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান শিক্ষক তার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, নোট গাইড বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে ১৯৮০ সালে। কিন্তু নোট গাইড বই বা সহায়ক পুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত করতে কখনওই কোথাও বড় ধরনের বাধার সম্মুখিন হতে হয়নি। প্রকাশনিগুলো তাদের নাম ঠিকানা সবকিছু উল্লেখপূর্বক সহায়ক বই মুদ্রণ ও বাঁধাই শেষে সারা দেশে স্কুলসমুহে তালিকাভুক্ত করেছে। একাজ তারা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে করেছে, নাকি লক্ষ লক্ষ টাকা অবৈধভাবে লেনদেনের মাধ্যমে করে এসেছে সেটি জানা দরকার। 

২০১০ সাল থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি হতে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত সরকার এনসিটিবি প্রকাশিত সব পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে সরবরাহ করছে সারা দেশের সকল শিক্ষার্থীদের। তার মধ্যে বাংলা ব্যাকরণ ও ইংরেজি গ্রামার বইও রয়েছে। প্রতি বছর ১ জানুয়ারি সারাদেশে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ হয়ে এসেছে উৎসবমুখর পরিবেশে। কিন্তু সরকারের দেওয়া ইংরেজি গ্রামার ও বাংলা ব্যাকরণ এ দু’টি বই স্কুল থেকে নিয়ে শিক্ষার্থীরা ফেলে রেখেছে বাসা বাড়ির কোনাকাঞ্চি অথবা পরিত্যাক্ত ঘরে। কারণ বই দু’টি পাঠদান করা হয়নি। পাঠদান করা হয়েছে ৫ থেকে ৬ টি প্রকাশণির গ্রামার ও ব্যাকরণ বই। কোন কোন প্রকাশনি একাধিক নামে গ্রামার, ব্যাকরণ বই প্রকাশ করে বাজারজাত করে থাকে। এটা এক ধরনের প্রতারণা বলে মনে করেন এই প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। 

তিনি জানান, এই ভয়াবহ দুর্নীতির সাথে কারা কিভাবে জড়িত তা জানার জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত টিম গঠন করতে হবে। কিন্তু কোন প্রকাশনি কোন বছরে কি পরিমাণ গ্রামার, ব্যাকরণ বই প্রকাশ করেছে সে তথ্য বের করা খুব বেশি কঠিন হবে না। 

এই প্রধান শিক্ষক কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ২০১০ সাল থেকে পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে দেওয়ার সময় থেকে নতুন করে সহায়ক বই নিষিদ্ধের কথাটি আবারও সামনে চলে আসে। সৃজনশীল ও অনুশীলন কাঠামোর বই প্রকাশের পর প্রকাশনির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল শিক্ষকেরা এ পদ্ধতি রপ্ত করতে না পারায় তাদের সহায়ক বইগুলো শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটাবে। সৃজনশীল পদ্ধতি ১১ বছর ধরে চলছে। এ সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সকল শিক্ষককে প্রশিক্ষন প্রদান করা হয়েছে। এরপরও যদি কেউ বলেন, শিক্ষকেরা এখনও এ পদ্ধতি বুঝতে সক্ষম হননি, তাহলে আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি, এ পদ্ধতি আর কখনোই তারা বুঝতে পারবেন না। 

নোট গাইড বই বা সহায়ক পুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ ও বাজারজাত করলে জেল, জরিমানা অথবা উভয়দণ্ডের কথা বলা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, এগুলো অত্যান্ত ক্ষতিকর। আবার নিবন্ধন, অনুমোদন নিয়ে নোট গাইড প্রকাশ করলে তা জাতে উঠে যাবে। এর মধ্য দিয়ে যে ম্যাসেজ দেওয়া হয়েছে তার অর্থ দাঁড়ায়, এগুলোর প্রয়োজন রয়েছে।

প্রবীণ এই অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরবরাহ করায় দেশের সব শ্রেণিপেশা, ধর্মবর্ণ ও  রাজনীতি নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়ে আসছে। কিন্তু সহায়ক বইগুলো অভিন্ন মানের না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের অভিন্ন মেধা বিকাশে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। এই প্রবীণ শিক্ষক আরও বলেছেন, যারা শিক্ষা আইনের খসড়া চূড়ান্তকরণে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন তারা যদি মনে করেন সহায়ক বইয়ের প্রয়োজন রয়েছে, তাহলে মূল পাঠ্যপুস্তকের সাথে এনসিটিবি প্রকাশিত একটি করে সহায়ক বইও বিনামূল্যে দেওয়ার সুপারিশ করুন। 

মাধ্যমিকের  আরেকজন অবসরপ্রাপ্ত সহকারি শিক্ষক কালের কণ্ঠকে বলেছেন, সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত সমস্ত বই বিনামূল্যে সরবরাহ করেন, তারমধ্যে বিনামূল্যের গ্রামার, ব্যাকরণ বই শিক্ষার্থীদের কেন পাঠদান করা হয়নি, কারস্বার্থে রাষ্ট্রীয় অর্থের বিনাশ করা হয়েছে সে তথ্য দেশবাসীকে জানানো হোক। 

আরও একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অভিাবক বলেছেন, ১৯৯৬ সালে আমার ৫ ছেলে মেয়ে স্কুলে পড়তো। আমি তখন একটি বাজারের ২০/২৫ টি দোকানের নাইটগার্ড ছিলাম। খুবকষ্টে চলতো আমার সংসার। সে বছর প্রতিটি পাঠ্যপুস্তকের দাম ৪ থেকে ৫ গুণ বেড়ে যায়। এমনিতে আমার ছেলে মেয়েরা পুরাতন বই দিয়ে লেখাপড়া করতো। দুই একটি করে বই কিনে দিতে হতো। আমি মনে করি বিনামূল্যে  বই দিয়ে সরকার যুগান্তকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, শিক্ষা আইন প্রতি মাসে প্রনীত হবে না। তাই সার্বিক স্বার্থে খসড়া চূড়ান্ত ও আইনে পরিণত হওয়া দরকার। কোচিংয়ের ব্যপারে আরও আলোচনা, পর্যালোচনার কথা বলেছেন তিনি। আর পত্রিকায় প্রকাশ করা না করার বিষয়টি পত্রিকা সংশ্লিষ্টদের বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে আছে ৬৯ টি হাইস্কুল, ৬টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ৫টি কলেজ, ৩৯টি দাখিল মাদরাসা এবং ২০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রাথমিকের অর্ধেকেরও বেশি স্কুলে পাঞ্জেরী পাবলিকেশনের গাইড বই পাঠ্য করা হয়েছে। অন্যগুলোতে চলছে লেকচার পাবলিকেশন, কাজল ব্রাদার্স লি. ও উৎসব প্রকাশনির সহায়ক বই। এছাড়াও ৩/৪টি বাদে সব হাই স্কুলে পাঞ্জেরী, অক্ষরপত্র, লেকচার পাবলিকেশন, কাজল ব্রাদার্স লি. এর সহায়ক বই ও  গ্রামার, ব্যাকরণ বই পাঠ্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও এসব বই কেনা বেচা চলছে যথারীতি। 

পাবতীপুরের সদ্য বিদায়ী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. মিরাজুল ইসলাম এই বিষয়ে কিছুই বলতে চাননি কালের কণ্ঠের কাছে। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাশিদ কায়সার রিয়াদ বলেছেন, আমি এরই মধ্যে দুই কোচিং সেন্টার ও এক লাইব্রেরিতে অভিযান চালিয়েছি। জরিমানাও করেছি ৩ জনকে। অবৈধভাবে কোনো প্রকাশনির গ্রামার, ব্যাকরণ ও  গাইড নোট, পাঠদান করতে দিবেন না বলে জানা তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা