kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট

আগে জেনেও ঠেকাতে ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন

দুই মামলা ২২ জন আটক

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

২০ মার্চ, ২০২১ ০৩:২০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আগে জেনেও ঠেকাতে ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন

সুনামগঞ্জের শাল্লায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের অনুসারীরা হামলা ও লুটপাট চালানোর আগের রাতেই বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছিল গ্রামবাসী। কিন্তু পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজন ঘটনাস্থলে যেতে দেরি করায় হামলাকারীরা অবলীলায় তাণ্ডব চালিয়ে ফিরে যায়। তাণ্ডব চালিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় হেফাজতকর্মীদের হ্যান্ড মাইকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এদিকে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২২ জনকে আটক করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার রাতে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহমদ। তবে আটককৃতদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। হামলার ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। ফেসবুকে মামুনুল হককে এক যুবকের কটূক্তির অভিযোগ তুলে বুধবারের এ হামলার ঘটনার পর এখনো অনেক পরিবারের নারী ও শিশুরা গ্রামে ফেরেনি।

গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৫ মার্চ হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক দিরাই উপজেলায় সমাবেশে বক্তব্য দেন। এতে তিনি ভারতের মুসলমানদের নির্যাতনে মোদিসহ হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক তরুণ মামুনুল হককে কটাক্ষ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়। এর জের ধরে মামুনুল হকের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় উসকানি দিয়ে অনলাইন ও অফলাইনে লেখালেখি করে। এতে উত্তেজনা তৈরি হতে দেখা দেয়। গত মঙ্গলবার রাতে উপজেলার কাশিপুর গ্রামের হেফাজত নেতার অনুসারীরা পাশের নাচনী চণ্ডিপুর গ্রামের লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এই সুযোগটি লুফে নেয় নাচনী গ্রামের ইউপি সদস্য স্বাধীন মিয়া। নোয়াগাঁও গ্রামের মানুষের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে তিনি নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা করতে আরো উৎসাহ দেন। রাতেই বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা মসজিদের মাইক ব্যবহার করে নোয়াগাঁও গ্রামবাসীর ওপর হামলার উসকানি দেয়। রাতেই হাজারো মানুষ সংগঠিত হয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে নোয়াগাঁও আসতে চাইলে প্রশাসন বাধা দেয়। এ সময় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় গ্রামবাসী নিজেরাই ঝুমনকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে শান্তিতেই রাত পার করেন।

পরদিন মঙ্গলবার ভোরে আবারও মসজিদের মাইক ব্যবহার করে নোয়াগাঁও গ্রামে আসতে আহ্বান জানানো হয়। এই আহ্বানে দিরাই উপজেলার নাচনী, চণ্ডিপুর, সন্তোষপুর, ধনপুর, সরমঙ্গল, শাল্লার কাশিপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামের দিকে রওনা দেয়। এ সময় গ্রামের অনেকেই মোবাইল ফোনে স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানায়। ক্ষুব্ধ হেফাজত অনুসারীরা প্রায় তিন কিলোমিটার দূর থেকে হামলা করতে আসে। হামলাকারীদের সামনের সারিতে ইউপি সদস্য স্বাধীন মিয়া, নাচনী গ্রামের ফক্কন মিয়া এবং তাঁর ছেলে ও স্বজনরা নেতৃত্বে ছিলেন। সশস্ত্র লোকদের এগিয়ে আসার দৃশ্য দেখে তাত্ক্ষণিক প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে জানায় গ্রামবাসী। কিন্তু এক ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রশাসনের লোকজন। তখন চলে যায় হামলাকারীরা। এ সময় সশস্ত্র একদল হামলাকারীকে হ্যান্ড মাইকে নিবৃত্ত হওয়ার আহ্বান জানান উপজেলা চেয়ারম্যান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মুক্তাদীর হোসেন, ওসি নাজমুল হোসেনসহ প্রশাসনের লোকজন। এ সময়ও তারা সশস্ত্র ছিল।

গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমরা আগের রাতেই প্রশাসনকে হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলাম। সকালেও তারা (হেফাজতকর্মী) যখন মাইকের মাধ্যমে আহ্বান জানিয়ে হামলা করতে আসছিল, তখনো জানিয়েছি। কিন্তু প্রশাসন পৌঁছতে দেরি করায় আগেই তারা আমাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করে চলে যায়। প্রশাসন সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এমন তাণ্ডব ঘটত না।’

গ্রামের বৃদ্ধা শেফালি দাস বলেন, ‘মঙ্গলবার সকালেই আমাদের গ্রামের পুরুষরা হামলার আশঙ্কার কথা প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসন আসছে পরে। এর মধ্যে তারা ঘরবাড়ি সব লুটপাট করে চলে গেছে। প্রশাসন সঠিক সময়ে আসলে হামলার ঘটনা ঘটত না।’ গ্রামের বৃদ্ধা পুষ্পরাণী দাস বলেন, ‘আমরা ঝুমনরে ধইরা আগের দিন আইনে দিছি। এর পরও রাইতে তারা মাইকে ঘোষণা দিয়া হামলা করতে চাইছিল। সকালেও মাইকে ঘোষণা দিয়া হামলা করতে আসে। আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম। প্রশাসন পরে আসছে।’

শাল্লা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অবনী মোহন দাস গ্রামে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বলেন, ‘মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলা হয়েছে। গ্রামবাসী প্রশাসনকে জানিয়েছিল। কিন্তু প্রশাসন যথাসময়ে আসেনি।’

গ্রামবাসীর এই অভিযোগের বিষয়ে সংহতি জানিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বলেন, ‘দিরাইয়ে সমাবেশের অনুমতি কিভাবে মৌলবাদীরা পেল আমরা জানি না। প্রশাসনও আমাদের এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। এই সমাবেশে বাবুনগরী ও মামুনুল উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে গেছেন।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল মুক্তাদীর হোসেন বলেন, ‘আমরা খবর পেয়েই ছুটে গিয়েছিলাম। না এলে আরো খারাপ অবস্থা হতো।’

সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘গ্রামের একটি পাড়ায় প্রশাসন সঙ্গে সঙ্গে কাজ করছে। তাই ক্ষতি হয়নি। আমরা সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ নিয়েছি। মামলা নিয়েছি। যারা জড়িত তাদের তথ্য আমাদের কাছে আছে। তাদের একজনকেও ছাড়ব না।’

হামলাকারীরা আওয়ামী লীগের দুই সভাপতির গ্রামের লোক : জানা গেছে, বাবুনগরী ও মামুনুল হকের সমাবেশের প্রস্তুতিসভা হয় দিরাই পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র আজিজুল হক বুলবুলের বাসায়। দিরাইয়ে হেফাজতের সমাবেশে উপস্থিত হন এবং মঞ্চে ওঠেন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত মেয়র বিশ্বজিৎ রায়। নোয়াগাঁও গ্রামের হামলাকারী অনেকের বাড়ি নাচনী চণ্ডিপুর গ্রামে, সেই গ্রামেই বাড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মতিউর রহমানের। যদিও তিনি গ্রামে বসবাস করেন না। আবার হামলাকারী অনেকের বাড়ি পাশের কাশিপুর গ্রামে, সেই গ্রামে বাড়ি শাল্লা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. অলিউল হকের। এই দুটি গ্রাম থেকেই বেশি হামলাকারী এসেছিল। এ বিষয়ে শাল্লা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অলিউল হক বলেন, ‘আমি বৃদ্ধ মানুষ। শত শত লোকজনকে আটকানোর চেষ্টা করেছি। কেউ আমার কথা শোনেনি। তবে আমার গ্রাম এমনকি আমার সন্তানও যদি এমন কাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকে আমি তারও শাস্তি চাই।’

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি।

হামলার পর এখনো গ্রামে ফেরেনি অনেক নারী ও শিশু

হামলার পর অনেক পরিবার ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছে। বিশেষ করে কয়েকটি পরিবারের নারী ও ছোট শিশুরা বাড়িতে ফেরেনি। গ্রামের স্বপ্না রাণী দাস বলেন, ‘আমার মেয়েদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়েছি। তারা এখনো বাড়িতে ফেরেনি।’ তিনি বলেন, ‘আমার নগদ দুই লাখ টাকা ও তিন ভরি স্বর্ণ লুট করে নিয়ে গেছে তারা।’

একই গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা জগত্চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমাদের গ্রামে হামলার পর অনেক নারী ও শিশু বাড়ি ফেরেনি। তারা ভয় পেয়ে আছে। যদিও গ্রামে পুলিশ ও র্যাবের দুটি ক্যাম্প বসানো হয়েছে।  গ্রামবাসী যে ভয় পেয়েছে তা দূর হতে সময় লাগবে।’

গ্রামবাসীকে সহায়তা : গতকাল সকালে বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান ও পুলিশের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহমদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তাঁরা নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে মতবিনিময় করেন। এ সময় প্রশাসন ৯১টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে ৩৭টি পরিবারকে পাঁচ হাজার করে টাকা ও বাকিদের তিন হাজার করে নগদ টাকা দেন। এ ছাড়া হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির, ঘরবাড়ি সংস্কারে টিন ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানান। প্রশাসন ছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ ও  যুবলীগের পক্ষ থেকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সংগঠন কিছু সহায়তা দিয়েছে। গ্রামে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন করে হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে।

যা বলেছেন বিভাগীয় কমিশনার ও ডিআইজি : ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তাত্ক্ষণিক খবর পেয়ে পুলিশ পাঠিয়েছি। ওসি-ইউএনও ঘটনাস্থলে ছুটে এসেছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘এ দেশে জঙ্গি, সন্ত্রাসের কোনো স্থান নেই। পুলিশ বারবার জঙ্গি সন্ত্রাসের নাম নিশানা মুছে দিয়েছে।’ ডিআইজি বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে দুটি মামলা হয়েছে। মামলায় ২২ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। দুজন এজাহারভুক্ত আসামিও আছে।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা ভীত হবেন না। আমরা আপনাদের পাশে আছি, থাকব।’ আসামিদের ধরতে তিনি গ্রামবাসীর সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ‘প্রকৃত অপরাধীদের নাম-ঠিকানা দিন। আমরা একে একে সবাইকে আইনে সোপর্দ করব।’

বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে হামলা হয়েছে। হামলাকারী কারা, ভাবতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা জড়িত, সবাইকে ধরা হবে। অভিযুক্ত স্বাধীন মেম্বারই নয়, সবাইকেই ধরা হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের আসা এখানেই শেষ নয়। আপনাদের পাশে সার্বক্ষণিক আছি। কোনো অবস্থাতেই শঙ্কিত হবেন না। সরকার সমস্ত ফোর্স নিয়ে আপনাদের পাশে থাকবে। আপনারা মাথা উঁচু করে থাকবেন, কোনো জঙ্গি, সন্ত্রাসী সাম্প্রদায়িক শক্তি এ দেশে থাকতে পারবে না। সন্ত্রাসীদের কোনো জাত নেই, ধর্ম নেই। এরা দেশ ও মানুষের শত্রু।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা