kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ বৈশাখ ১৪২৮। ২০ এপ্রিল ২০২১। ৭ রমজান ১৪৪২

হাকালুকি হাওরে অতিথি পাখি শিকারে ছিটানো বিষটোপে মারা যাচ্ছে হাঁস

মাহফুজ শাকিল, কুলাউড়া থেকে   

১৯ মার্চ, ২০২১ ২৩:২৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হাকালুকি হাওরে অতিথি পাখি শিকারে ছিটানো বিষটোপে মারা যাচ্ছে হাঁস

এশিয়ার বৃহত্তম হাওর ও অতিথি পাখিদের সবচেয়ে বড় সমাগমস্থল হাকালুকিতে বিষটোপে ও ফাঁদ পেতে অতিথি পাখি নিধন করা হচ্ছে। সেই ফাঁদে পড়ে অবাধে মারা যাচ্ছে সাধারণ খামারিদের হাঁসও। বৃহস্পতিবার (১৮ মার্চ) রাতে হাকালুকি হাওরের ভাটেরা অংশে শিংগাইরজুর বিলে বিষটোপ দিয়ে অতিথি পাখি মারার জন্য বিষ দিয়েছিল শিকারী চক্ররা। সেই বিষে আক্রান্ত হয়ে ৩নং ভাটেরা ইউনিয়নের নওয়াগাঁও গ্রামের আশিক আহমদ নামের একজন হাঁস খামারির প্রায় ২০০ হাঁস মারা গেছে।

হাঁস খামারি আশিক আহমদ জানান, হাকালুকি হাওরের বিভিন্ন স্থানে একাধিক সংঘবদ্ধচক্র বিষটোপ ও ফাঁদ পেতে অতিথি পাখি শিকার করে থাকেন। প্রায় প্রতিদিনই শিকারিরা এ ধরনের অপকর্মটি করে থাকে। এই চক্রের কারণে হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় গত ৩-৪ মাসে অতিথি পাখি ছাড়াও অন্তত দেড় থেকে ২ হাজার হাঁস মারা গেছে বিষটোপে। প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় পাখি শিকারি চক্রটি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। 

হাঁস খামারিরা জানান, কারা বিষটোপে পাখি নিধনের সঙ্গে জড়িত প্রশাসন খোঁজ নিলেই পেয়ে যাবে। এদেরকে তালিকা করে যদি আইনের আওতায় আনা যায়, তাহলে হাওরে অতিথি পাখি আসবে। আর অতিথি পাখি আসলে পাখির বিষ্ঠায় মাছের খাবার হবে। এতে মাছের উৎপাদন বাড়বে। হাওরের বিলগুলোয় মাছ বাড়লে সরকারের যেমন রাজস্ব বাড়বে সেই সঙ্গে হাওরের জীবন জীবিকা নির্বাহকারী জেলেরাও উপকৃত হবে।

মূলত হাওরটিতে কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত না হওয়াতে অরক্ষিত এই হাওরে শুধু বিষটোপে অতিথি পাখি নিধন ছাড়াও মৎস্য অভয়াশ্রম থেকে অবাধে চলছে মাছ লুট। পরিবেশ মন্ত্রীর এলাকার এই সর্ববৃহৎ হাওরটি অন্তর্ভুক্ত হয়নি হাওর উন্নয়ন প্রকল্পেও।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাকালুকি হাওরে কিছু অসাধু শিকারিদের কারণে হাওরের দিন দিন অতিথি পাখির আগমন ক্রমশই কমছে। পাখি শুমারিতে প্রাপ্ত ফলাফল অনুসারে এবার হাকালুকিতে দেখা মিলেছে ৪৫ প্রজাতির মাত্র ২৪ হাজার ৫৫১ পরিযাযী ও দেশীয় প্রজাতির পাখি। অথচ এই হাওরে অতিথি পাখি শুমারিতে ২০১২-১৩ সালে ১ লাখ ৩০ হাজার পর্যন্ত পাখি গণনা করা হয়েছিল। মাত্র ৮ থেকে ১০ বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা এক লাখের ওপরে কমে গেছে। যা হাওরের ইকো সিস্টেমের জন্য উদ্বেগজনক। 

হাকালুকি হাওরটি কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় অরক্ষিত হাওরে বিষটোপ আর ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করায় দিন দিন অতিথি পাখির সমাগম কমছে। সেই ফাঁদের কারণে  অবাধে মারা যাচ্ছে হাঁসও। মৎস্য অভয়াশ্রম থাকলেও সেই অভয়াশ্রমগুলোতে শিকারিরা হানা দেয়। শীতকালে এসব বিলকে ঘিরে পরিযায়ী পাখিদের বিচরণে মুখরিত হয়ে উঠে গোটা হাওরাঞ্চল। হাওরের ইকো সিস্টেম রক্ষায় অবিলম্বে হাওরকে উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি হাওর তীরের মানুষের। ১৯৯৯ সালে সরকার এ হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া বা ইসিএ) ঘোষণা করে।

দেশের খ্যাতিমান পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক জানান, হাকালুকিতে গত কয়েক বছর শুমারিকালে হাওর, খাল ও বিলে অনেক মৃত হাঁস পাওয়া গিয়েছিল। শীত মৌসুমে দুর্বৃত্তরা হাওরে বিষটোপ দিয়ে পাখি নিধন করত। বিষটোপের কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি পাখি মারা যায়। সেই ফাঁদে পড়ে অবাধে মারা যাচ্ছে খামারিদের হাঁসও। এর কারণে পাখিরা তাদের জীবন বিপন্ন মনে করলে আর ওই হাওরে ভিড় করে না।

তিনি আরো বলেন, পাখি শিকারিদের অবাধ নিধনযজ্ঞে হাওরে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী ও অতিথি পাখি হুমকির মুখে আছে। দিন দিন পাখির সংখ্যা কমছে। পাখির সংখ্যা বাড়াতে হলে বিষটোপে শিকার বন্ধ করতে হবে এবং নিরাপদ অভয়াশ্রম করে তা সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অথচ একটা সময় ছিলো যখন হাওরে লাখেরও বেশি পাখির সমাগম হতো। পাওয়া যেত বিপন্ন প্রজাতির পাখির দেখা। এটা প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় হাওরের জন্য অবশ্যই উদ্বেগের কারণ। বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে হাওরে মাছের ও পাখির অভয়াশ্রম গড়ে না তুললে এক সময় অতিথি পাখির সমাগম শুন্যের কোটায় নেমে আসবে। তাতে মাছের উৎপাদন কমবে। যখন ইকো সিস্টেমে ব্যত্যয় ঘটবে তখন তা মানুষের জীবন জীবিকায় প্রভাব ফেলবে। তাই আমাদের এই বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে।

এ বিষয়ে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ টি এম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হবে। এছাড়া হাওরে অবাধে পাখি শিকার বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে। 

জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, বিষটোপে হাঁস মারার বিষয়ে অবগত হয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউএনও এবং থানার ওসিকে নির্দেশনা দিয়েছি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা