kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

কক্সবাজার আওয়ামী লীগ

প্রার্থী তালিকায় দণ্ডিত আসামি, যুদ্ধাপরাধীর ছেলে, ‘বিএনপি নেতা’

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

১৩ মার্চ, ২০২১ ০৩:৪১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রার্থী তালিকায় দণ্ডিত আসামি, যুদ্ধাপরাধীর ছেলে, ‘বিএনপি নেতা’

কক্সবাজারের পেকুয়া থানার একটি অস্ত্র মামলায় জেলার ১ নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ১০ বছরের সাজা হয় টৈটং ইউনিয়নের হাজির পাড়ার হাবিবুল্লাহর ছেলে জুবাইদুল্লাহ লিটনের। এই মামলায় লিটন গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন জেলও খেটেছেন। উচ্চ আদালত তাঁকে স্থায়ী জামিন দিলেও বহাল রয়েছে সাজা। কিন্তু আগামী ১১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত পেকুয়ার টৈটং ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দলীয় তথা নৌকার মনোনয়ন দিতে কেন্দ্রে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের পাঠানো পাঁচজনের তালিকায় লিটনের নামও আছে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর তা জমাও দিয়েছেন লিটন। এ ছাড়া পাঠানো হয়েছে গত ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী মো. শহীদুল্লাহর নাম। তবে বাদ দেওয়া হয়েছে গত নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও বর্তমান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর নাম। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে জেলায় তোলপাড় চলছে।

দলীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় দলীয় মনোনয়নের জন্য পাঁচজনের নামের তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এ জন্য গত ৬ মার্চ কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. ফরিদুল আলম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় মনোনয়ন পেতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের সাক্ষাৎকারসহ জীবনবৃত্তান্ত জমা নেন। এর আগে টৈটং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ এবং পেকুয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত তিনজনের নামের পৃথক দুটি তালিকা রেজল্যুশনসহ জেলা আওয়ামী লীগের কাছে পাঠানো হয়। এই  তিনজন হলেন টৈটং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী, সভাপতি সরওয়ার কামাল ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হাজি সাহাব উদ্দিন। এই তালিকা ও রেজল্যুশনে লিটনের নাম ছিল না।

থানা সূত্র জানায়, লিটনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে পেকুয়া থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির বাদী হয়ে অস্ত্র আইনের ১৯(এ) ধারায় মামলাটি করেন। মামলায় ২০০৮ সালের ৩০ মার্চ কক্সবাজারের ১ নম্বর স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে লিটনের ১০ বছরের সাজা হয়। পেকুয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জুবাইদুল্লাহ লিটন বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি ছিল সাজানো এবং ষড়যন্ত্রমূলক। নিজেকে আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কর্মী দাবি করে তিনি বলেন, টৈটং ইউপি নির্বাচনে তিনি নৌকার মনোনয়ন পেতে চেষ্টা চালাচ্ছেন।

পেকুয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলীয় গঠনতন্ত্র, কেন্দ্রের নির্দেশনা এবং নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী নৈতিক স্খলনজনিত কোনো মামলায় দুই বছরের বেশি সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবে না। তাই জেলা আওয়ামী লীগের কাছে আমাদের পাঠানো প্রথম তালিকায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি জুবাইদুল্লাহ লিটনের নাম দিইনি। তবে জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল জ্যেষ্ঠ নেতাদের চাপের মুখে আরো দুজন তথা মেহেদী হাসান ফরায়েজী ও লিটনের নাম যোগ করে আরেকটি তালিকা দিতে বাধ্য হই। এখন শুনছি, জেলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রে পাঠানো তালিকায় লিটনের নাম আছে। বাদ দেওয়া হয়েছে আমাদের তালিকায় ১ নম্বরে থাকা জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর নাম।’

জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দলীয় প্রতীকে গত নির্বাচনে বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই। কিন্তু দলীয় এমপির পক্ষে থেকে আমার এলাকার মানুষের সেবা করার বিষয়টি জেলা আওয়ামী লীগ ভালো চোখে দেখে না। একটি ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলার আসামি হওয়ায় আমার নাম একেবারে কেটে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রে প্রেরিত জেলা আওয়ামী লীগের তালিকা থেকে, যে মামলায় আমি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছি এবং মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। অথচ ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি জুবাইদুল্লাহ লিটনের নাম পাঠিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ। বিষয়টি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের জানানো হয়। পরে তাঁদের নির্দেশনায় আমিও দলীয় প্রতীক পেতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে কেন্দ্রে জমা দিয়েছি।’

সূত্র জানায়, একই তারিখে (১১ এপ্রিল) টেকনাফের সাবরাং ইউপি এবং মহেশখালী পৌরসভার নির্বাচন। সাবরাং ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দিতে কেন্দ্রে পাঠানো তালিকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামের পাশে বর্তমান চেয়ারম্যান নূর হোসেনকে গতবারের বিদ্রোহী প্রার্থী উল্লেখ করা হয়। কিন্তু টৈটং ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় জেলা আওয়ামী লীগ কেন্দ্রে পাঠানো তালিকায় শহীদুল্লাহর নামের পাশে গত নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী উল্লেখ করেনি।

অন্যদিকে মহেশখালী পৌরসভার মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী মহেশখালী উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি মো. শাহজাহান কালের কণ্ঠকে অভিযোগ করেন, বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগ সিন্ডিকেট রাজনীতিনির্ভর হয়ে পড়েছে। এ কারণে কেন্দ্রে পাঠানো মেয়র পদে দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় যুদ্ধাপরাধীর ছেলে, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীর নামও রয়েছে। এমনকি জেলা আওয়ামী লীগের তালিকায় কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে বিএনপির সাবেক এমপি আলমগীর মো. মাহফুজউল্লাহ ফরিদের ভাগ্নের নাম পাঠানো হয়েছে নৌকা প্রতীক দিতে।

কেন্দ্রে তাঁর নাম না পাঠানোতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে শাহজাহান বলেন, ‘আমি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছি। এরই মধ্যে দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে জমাও দিয়েছি। বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের জানিয়েছি।’

এ ব্যাপারে বক্তব্য নিতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয় জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. ফরিদুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে। এই প্রতিবেদক নিজের পরিচয় দিলে ফরিদুল বলেন, ‘তুমি যে কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি, তা আমি কী করে বুঝব।’ এই বলে সংযোগ কেটে দেন। পরে কল করা হলে তিনি তা ধরেননি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা