অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশের একমাত্র কুমারী বন হিসেবে পরিচিত বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী সংরক্ষিত বন। শতবর্ষী মাতৃগাছ কেটে জুম চাষ, অবৈধ কাঠ পাচার, ইটভাটার জ্বালানি সংগ্রহ এবং বন রক্ষায় প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণে প্রায় দেড় শ বছরের পুরনো এই প্রাকৃতিক বন ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনে শুধু কয়েক হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থলই নয়; এটি দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের জলবায়ু, নদীর পানিপ্রবাহ এবং জীববৈচিত্র্যের অন্যতম ক্ষেত্র। অথচ বছরের পর বছর ধরে এ বন উজাড় করার প্রক্রিয়া চললেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।
জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৮৮০ সালে সরকার প্রায় ৮২ হাজার ৮০ একর বনভূমিকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করে। এই বন দেশের একমাত্র কুমারী বনাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে এটি সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট নামে পরিচিত। বনাঞ্চলটি তিন্দু, রেমাক্রী, বড় পাথর, বড় মদক, ছোট মদক, নারিশ্যা ঝিরি, ইয়াংরিং, লিক্রি, আন্ধারমানিক, মাতাদুসরি, ব্রুংক্ষিয়াং, তংক্ষিয়াং, লাগপাই, থাকব্রো ঝিরি হয়ে মায়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত।
থানচি উপজেলার দুর্গম সীমান্তবর্তী লিক্রি এলাকা মূলত এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাঙ্গু সংরক্ষিত বনে কত শতাংশ গাছপালা রয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে বন বিভাগের প্রতিবেদন ও বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় দেখা যায়, জুম চাষ ও অবৈধভাবে গাছ কেটে পাচারের কারণে এখানে গাছের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। সম্প্রতি স্যাটেলাইট চিত্রে বনের বিভিন্ন অংশ উজাড় হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় বন বিভাগ, পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিভিন্ন জরিপ সূত্রে জানা গেছে, শুধু সাঙ্গু সংরক্ষিত বনেই প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার থেকে তিন হাজার হেক্টর নতুন পাহাড় কেটে জুম চাষের জমি প্রস্তুত করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, থানচিতে চলতি বছর প্রায় দুই হাজার ৮০০ হেক্টর এলাকায় জুম চাষ করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, জুম চাষের জন্য প্রথমে পাহাড়ের সব গাছ কেটে ফেলা হয়। কয়েক মাস শুকানোর পর পুরো পাহাড়ে আগুন লাগিয়ে ছাইয়ের ওপর বীজ বপন করা হয়। এতে কয়েক মাসের জন্য ফসল মিললেও ধ্বংস হয়ে যায় শত বছরের বন।
বিভিন্ন সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকের পর থেকে সাঙ্গু সংরক্ষিত বনের গভীরে গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশতাধিক পাহাড়ি পাড়া। বর্তমানে লিক্রি, আন্ধারমানিক, মিলিঙ্গা পাড়া, ম্রংগং পাড়া, ডুংডুং পাড়া, নরীষা ঝিরি, বড় মদকসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষের স্থায়ী বসতি রয়েছে। এসব পরিবারের প্রধান জীবিকা জুম চাষ।
জুম চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো পাহাড়ে একবার জুম চাষ করার পর সেই জমি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য হতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। ফলে প্রতিবছর নতুন পাহাড় নির্বাচন করতে হয় জুম চাষিদের।
সম্প্রতি থানচি উপজেলার দুর্গম সীমান্তবর্তী সাঙ্গু সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ লিক্রি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আদি পদ্ধতির এই চাষাবাদে বনের সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে শতবর্ষী মাদার ট্রি বা মাতৃগাছ কেটে ফেলার কারণে। কয়েকটি জায়গায় ঘুরে দেখা যায়, জুমচাষের জন্য তৈরি জমিতে চাষাবাদ হলেও চারদিকে কাটা অবস্থায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে অসংখ্য শতবর্ষী মাতৃগাছ।
লিক্রির ৪৫ মাইল এলাকায় নিজের জুমক্ষেতে ফসলের পরিচর্যায় ব্যস্ত ছিলেন জুমচাষি থোয়াই হ্লা মং মারমা। শতবর্ষী মাতৃগাছগুলো কেন কেটে ফেলেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বড় বড় গাছের ঘন ছায়ায় জুম তেমন ভালো হয় না। তাই জমি প্রস্তুত করতে গাছগুলো কাটতে হয়েছে।
কাটা গাছগুলো তো জমিতে পড়ে থাকলে পচে নষ্ট হয়ে যাবে—এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, নষ্ট হবে কেন। কাঠগুলো বেপারীদের কাছে বিক্রি করে দেবো।
স্থানীয়রা জানায়, প্রতিবছর জুম চাষের জন্য জমি তৈরির সময় নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে-গর্জন, গোদা, চাপালিশ, চম্পা, জারুল, গুটগুটিয়ার মতো বহু মূল্যবান শতবর্ষী গাছ। এই গাছগুলোই বন পুনর্জন্মের প্রধান উৎস।
পরিবেশবিদরা বলছেন, একবার এসব মাতৃগাছ হারিয়ে গেলে পুরো বন তার স্বাভাবিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জুমের জন্য কাটা সব গাছ আগুনে পোড়ানো হয় না। সবচেয়ে মূল্যবান অংশগুলো স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। পরে ব্যবসায়ীরা বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় নানা কৌশলে সেসব কাঠ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাচার করেন।
থানচির স্থানীয় বাসিন্দা থোয়াই মং প্রু মারমা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাঙ্গু সংরক্ষিত বন থেকে গাছ কাটা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা প্রথমে বন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় কাঠ জব্দ দেখায়। পরে নিলামের মাধ্যমে সেই কাঠ আবার বাইরে নিয়ে যায়। এভাবে চলছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ পাচার।
থানচির স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পাঁচ-সাত বছর আগে আনিসুর রহমান সুজন নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব ব্যবহার করে সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্টসংলগ্ন এলাকায় একটি অবৈধ ইটভাটা গড়ে তোলেন। সেখানে প্রতিবছর হাজার হাজার মণ কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার বড় অংশই আসে সাঙ্গু সংরক্ষিত বন থেকে।
বান্দরবান পরিবেশবিষয়ক সংস্থা (তাজিংডং)-এর নির্বাহী পরিচালক চিং সিং প্রু মারমা বলেন, বন উজাড়ের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়, পানি সংকট বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি ঘটছে।
২০১১-২০১৫ সাল পর্যন্ত সাঙ্গু বনাঞ্চলে জরিপ চালায় ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ)। ২০১৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে উদ্বেগজনক তথ্য। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বন উজাড় ও জুম চাষাবাদের আগুনের কারণে অন্তত ১১৩ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী, বিরল পাখির আবাসস্থল মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ২০১৬-২০২০ সাল পর্যন্ত সাঙ্গু বনাঞ্চলের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে।
গবেষণায় দেখা যায়, সাঙ্গু অববাহিকার এক হাজার ২৩৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ১৪ শতাংশ বনভূমি উজাড় হয়েছে। একই সময় প্রাকৃতিকভাবে বন সৃষ্টি হয়েছে মাত্র তিন শতাংশ এলাকায়। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, বন উজাড়ের প্রধান কারণ হিসেবে জুম চাষই সবচেয়ে বেশি প্রতীয়মান হয়েছে।
বাংলাদেশ স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং অর্গানাইজেশন (স্পারসো)-এর বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রগুলো থেকে দেখা যায়, বড় বনাঞ্চলের অন্তত ২৪টি স্পট থেকে গাছ কাটা হয়েছে।
স্পারসোর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা সাঙ্গু সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ৮৬৭ হেক্টর (দুই হাজার একরও বেশি) এলাকার একটি চিত্র বিশ্লেষণ করেছেন। যার মধ্যে অন্তত ৪০ হেক্টর (প্রায় ১০০ একর) জায়গার সব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ২০১৬, ২০১৯ এবং ২০২০ সালে তোলা ছবিগুলো দেখলে এটা স্পষ্ট হয় যে প্রতি বছরই গাছ কেটে বন খালি করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বান্দরবানের দুই জ্যেষ্ঠ বন কর্মকর্তা জানান, পাহাড়ের গায়ে গাছ কেটে আগুন দিয়ে জুম চাষের কারণে সংরক্ষিত বনের বিশাল অংশ এখন অনুর্বর হয়ে পড়ছে। তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি, ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা এবং বিভিন্ন পাহাড়ি সংগঠনগুলোর নানা বাধার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই বনবিভাগ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না।
বান্দরবান মৃত্তিকাসম্পদ কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহবুবুল ইসলাম বলেন, সাঙ্গু নদীর উৎপত্তি এই বন থেকেই। বন ধ্বংসের ফলে ঝিরিগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে; নদীর পানিপ্রবাহ কমছে, ভূমিক্ষয় বাড়ছে, মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বিলীন হচ্ছে ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ছে।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, অবিলম্বে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্টে নতুন জুম চাষাবাদ নিষিদ্ধ করতে হবে। বনভূমির ভেতরের অবৈধ কাঠ পাচার বন্ধ করতে হবে। সংরক্ষিত বন এলাকায় থাকা অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ করতে হবে। বন বিভাগের দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত করতে হবে। পাহাড়িদের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে।
সম্প্রতি জুমচাষের জন্য লিক্রি এলাকায় মাতৃগাছ কেটে ফেলার ঘটনা স্বীকার করে বান্দরবান বিভাগের বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বন উজাড় রোধে বন বিভাগ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, উজাড় হওয়া এলাকায় পুনর্বনায়নসহ নানা সংরক্ষণমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তৌফিকুল ইসলাম বলেন, জুমচাষ পার্বত্যাঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই বিকল্প টেকসই জীবিকার ব্যবস্থা ছাড়া শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে স্থানীয় প্রশাসন, পার্বত্য জেলা পরিষদ, বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্টে বসতি বৃদ্ধি প্রসঙ্গে এই বন কর্মকর্তা বলেন, সেখানে বাইরে থেকে নতুন করে বসতি স্থাপন করছে-বিষয়টি তেমন নয়। বরং বহু আগে থেকে বসবাসরত পরিবারের সদস্য সংখ্যা ও প্রজন্ম বৃদ্ধির কারণে বসতির পরিধি বাড়ছে।