kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ বৈশাখ ১৪২৮। ২০ এপ্রিল ২০২১। ৭ রমজান ১৪৪২

মঞ্চস্থ হলো 'কফিনবন্দি বাংলাদেশ'

পার্থ সারথী দাস, ঠাকুরগাঁও   

৮ মার্চ, ২০২১ ২২:২৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মঞ্চস্থ হলো 'কফিনবন্দি বাংলাদেশ'

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ উদযাপন ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে ঠাকুরগাঁও জেলা শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে দু দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হলো নাটক কফিনবন্দি বাংলাদেশ। সৈয়দ জাকির হোসেন রচিত ও নির্দেশিত এই নাটকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ দাফন নিয়ে যে অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছিল সেই কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। গত ৭ ও ৮ মার্চ ঠাকুরগাঁও জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয় নাটক কফিনবন্দি বাংলাদেশ। নাটকটিতে বিশজন অভিনেতা ও অভিনেত্রী বিভিন্ন চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। নাটক দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শক সমাগম হয়।

সত্য ঘটনাবলম্বনে নাটকের কাহিনিতে জানা যায়, শেখ আব্দুল হালিম, টুঙ্গিপাড়ার একজন সাধারণ মৌলবী ও শিক্ষক। যিনি স্বভাব কবিও বটে। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের কোনো এক রাতে মৌলবী সাহেব ঘুমন্ত অবস্থায় হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। শয্যা পাশে শোয়া স্ত্রী তার স্বামীর আচমকা কান্নায় ভয় পেয়ে চমকে উঠলেন। মৌলবী সাহেবের শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে। স্ত্রীর জিজ্ঞাসায় মৌলবী সাহেব জানায় যে গত কয়েক রাত ধরে একটি ভয়ঙ্কর স্বপ্ন তাকে তাড়া করছে। সাদাকাফনে জড়ানো অচেনা একটি লাশের দাফন করানোর জন্য কয়েকজন মিলিটারি তাকে বাধ্য করে। কিন্তু মৌলবী সাহেব সেই অচেনা লাশের মুখনা দেখে দাফনকার্য করতে সম্মত হয় না। এতে মিলিটারিরা তাকে নানাভাবে শারীরিক অত্যাচার করে। কিন্তু পরদিন রাতের স্বপ্নে মৌলবীসাহেব দেখলেন এই লাশতার খুব কাছের একজনের। কিন্তু লাশের চেহারাটা মনেকরতে পারছেন না।

১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট দুপুর। টুঙ্গিপাড়ায় একটি হেলিকপ্টার অবতরণ করে। মৌলবীসাহেবকে একটি লাশ দাফনের জন্য হঠাৎ তলব করা হয়। খবরটি শোনার পর আঁতকে ওঠে মৌলবী সাহেব। এ যে তার ভয়ঙ্কর স্বপ্নের নির্মম বাস্তবতা। কবরের নিকট পৌঁছে যখন জানতে পারেন যে কফিনবন্দি এই লাশ আর কারও নয়, এ যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ। এতে তিনি স্তব্ধ হয়ে যান এবং তার বুকের ভেতরে দম বন্ধ হয়ে আসে। মিলিটারিরা দশ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কফিনবন্দি লাশ মাটিচাপা দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়। কিন্তু মৌলবী সাহেব লাশের মুখ না দেখে দাফন কর্ম করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। এক পর্যায়ে মৌলবী সাহেব কফিনের ভিতরে শায়িত বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পেলেন।

এরপর নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর পবিত্র শবদেহকে পেরেক বন্দি কফিন থেকে উন্মুক্ত করা হয়। প্রয়াণের ত্রিশ-একত্রিশ ঘন্টার পর বঙ্গবন্ধুর দেহ গলে-খসে পড়ার মতো অবস্থা। গোসল করানো হয় পুকুরের পানিতে। গোসলে ব্যবহৃত হয় কাপড় ধোয়ানোর ৫৭০ বল সাবান। কাফনের জন্য ছিলনা অন্তত সাধারণ কোন কাপড়ের টুকরো। শেষ পর্যন্ত সেসময়ের মার্কিন সাদা থানকাপড় বঙ্গবন্ধুর পবিত্র শবদেহকে জড়ানো হয়।

মৌলবী সাহেব তার অবিচল সাহস এবং বুদ্ধিদীপ্ত প্রচেষ্টায় বঙ্গবন্ধুর লাশকে অন্তত ধর্মীয়রীতি মেনে দাফন করাতে সক্ষম হন। যেখানে বঙ্গবন্ধুর লাশকে বেওয়ারিশ লাশের মতো কোনো রকমে মাটিচাপা দেয়ার পায়তারা করছিলো হায়েনাদের দল। বঙ্গবন্ধুর মতো এক বিশাল হৃদয়ের মানুষকে এমনভাবে সমাহিত করা হলো যা ভেবে মৌলবী সাহেব কত রাত যে ঘুমাতে পারেননি তার হিসাব মেলেনি। তবে তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি কবিতা লিখলেন। যখন কঠিন বাস্তবতায় কেউ বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করতে  পারতোনা, সেইসময়ে। নিজ হস্তাক্ষরেরচিত সেই কবিতার পাতা তিনি বঙ্গবন্ধুর কবরে টানিয়ে রাখলেন। আর জীবন ভর বুকে ধারণ করলেন তার পঙ্ক্তিমালা।

নিশ্চিন্তপুর থিয়েটারের সভাপতি ও নাটকে  মেজর মহি উদ্দিন আহমেদ চরিত্রে অভিনয়কারি রাশেদুল আলম লিটন জানান, বঙ্গবন্ধুর জীবনের উপর নির্মিত নাটকে তিনি কখনো অভিনয় করেন নাই। এই প্রথম এমন একটি নাটকে অভিনয় করতে পেরে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করেন। 

নাটকের মূল চরিত্র মৌলবী সাহেব হিসেবে অভিনয় করেন শাপলা নাট্য গোষ্ঠির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা রূপকুমার গুহ ঠাকুরতা। তিনি জানান, দির্ঘ প্রায় তিনমাস ধরে সকলে এই নাটকে নিয়মিত মহড়া করেছেন। নাটকটি গতানুগতিক যে সব মঞ্চ নাটক হয় তা থেকে একেবারেই ভিন্ন। নাটকটিতে বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ দাফন নিয়ে যে নির্মম কাহিনি তা সকলের জানা উচিত। 

নাটকের দর্শক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মনোতষ কুমার দে জানান, নাটকে অংশগ্রহণকারি সকলেই তাদের অভিনয়ের মাধ্যমে সত্য এই ঘটনাটিকে দর্শকের মধ্যে সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন। যার ফলে এই নাটকটি দেখে অনেক দর্শক তাদের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন নাই। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিত এমন নাটক এই জেলায় আর কখনো মঞ্চায়ন হয় নাই। দেশের ও জাতির পিতার এই ইতিহাস এ নাটকটি জেলায় আরো মঞ্চায়ন করা হলে নতুন প্রজন্মসহ সকলে সঠিক ইতিহাস জানতে পারবেন।  

নাটকের অপর দর্শক ঠাকুরগাঁও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সাবেক কমান্ড বীর মুক্তিযোদ্ধা বদরুদ্বোজা বদর জানান, ইতিহাস কখনোই মুছে ফেলা যায়না। যার জন্য এই দেশ স্বাধীন হয়েছে সেই জাতির পিতাকে হত্যার পর হত্যাকারিরা বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্ঠা করা হয়েছিল। অমানবিক ভাবে বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ মাটিচাঁপা দিতে চেয়েছিল হত্যাকারিরা। সুষ্ঠুভাবে তাঁর যানাজা ও দাফন করতে দেয়া হয়নাই। এই নাটকে সেই বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। ইতিহাসের এমন ঘটনাটি অনেকের জানা নেই। এই নাটকের মাধ্যমে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এই নাটকটি দেখে তিনি তার দুই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন নাই।

নাটকের রচয়িতা ও নির্দেশক জেলা কালচারাল অফিসার সৈয়দ জাকির হোসেন জানান, নাটকে অংশগ্রহণকারি সকলের ঐকান্তিক চেষ্ঠায় প্রায় তিনমাস মহড়ার পর এই নাটকটি মঞ্চস্থ করা হলো। বিশেষ করে জেলার গুরুত্বপূর্ণ নাট্য সংগঠন নিশ্চন্তপুর থিয়েটার , শাপলা নাট্যগোষ্ঠি সহ অন্যান্য সংগঠন অনেক সহযোগিতা করেছে। এ ছাড়াও ঠাকুরগাঁও এক আসনের সাংসদ রমেশ চন্দ্র সেন এমপি, জেলা প্রশাসক ড. কেএম কামরুজ্জামান সেলিম ও শিল্পকলা একাডেমির সাধারন সম্পাদক পার্থ সারথী দাস সহ মুক্তিযোদ্ধা জেলা কমান্ড এই নাটকটি করতে বিশেষ সহযোগিতা করেছেন। 

জেলা প্রশাসক ড. কেএম কামরুজ্জামান সেলিম জানান, মুজিব বর্ষে বছরব্যাপি বিভিন্ন কর্মসুচির মধ্যে বঙ্গবন্ধুর উপর নির্মিত এই নাটকটি উল্ল্যেখযোগ্য। এই নাটকটির মাধ্যমে নতুনপ্রজন্মসহ সকলে সত্য ইতিহাস জানছেন। নাটকের দুই দিনই হাজার হাজার দর্শকদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। অনেক দর্শক তাদের পরিবার আত্মিয়স্বজনদের দেখাতে এই নাটকটি আবারো মঞ্চায়নের অনুরোধ করেছেন। তাই মুজিব বর্ষে এই নাটকটি আবারো মঞ্চায়ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। তিনি আরো বলেন, শুধু ঠাকুরগঁওয়ে নয় বঙ্গবন্ধুর এমন ইতিহাস সারা বাংলাদেশের মানুষকে জানাতে ও দেখাতে প্রত্যেকটি জেলায় এই নাটকটি মঞ্চায়ন করা উচিত।

ঠাকুরগাঁও এক আসনের সাংসদ রমেশ চন্দ্র সেন এমপি জানান, ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। ঘাতকেরা ইতিহাস থেকে জাতির পিতার নাম মুছে ফেলতে চেয়েছিলো, কিন্তু পারে নাই। কারণ বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের বুকের মধ্যে বঙ্গবন্ধু রয়েছে। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবে প্রতিটি মানুষের মধ্যে। বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ নিয়ে কুচক্রিরা যে অমানবিক আচরণ করেছিল তা কফিনবন্দি বাংলাদেশ নাটকে সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু ও বাংদেশের স্বাধীনতা নিয়ে আরো বেশি বেশি করে নাটক রচনা করা উচিত। এতে করে যেমন নাট্যচর্চা বেগবান হবে ঠিক তেমনি দেশের মানুষ করে সঠিক ইতিহাস নাটকের মাধ্যমে দেখতে পাবেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা