kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

দুষ্টচক্রের চক্কর গাজীপুরে

কথিত বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এখন তারা আরো বেপরোয়া

শরীফ আহেমদ শামীম, গাজীপুর   

৬ মার্চ, ২০২১ ০২:২৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুষ্টচক্রের চক্কর গাজীপুরে

বয়স ১৪ থেকে ২০। কেউ নামকাওয়াস্তে ছাত্র, কেউ বা টোকাই। তাদের আড্ডায় থাকে ছিনতাইকারী, থাকে বখাটে। দল বেঁধে বাইক নিয়ে দাপুটে ঘোরাঘুরি, রাস্তায় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, চুরি-ছিনতাই, মারধর, মাদক সেবন আর লোকজনকে হয়রানি করা তাদের নিত্যকাজ। একসময় এসব মাস্তানি গিয়ে ঠেকে খুনাখুনিতে। গাজীপুর শহরে এভাবে গ্রুপভিত্তিক নানা অপরাধের চক্করে জড়িয়ে পড়ছে উঠতি বয়সের একশ্রেণির কিশোর-তরুণ। এসব কিশোর দুষ্টচক্রকে আবার আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে কথিত বড় ভাইয়েরা। তাদের আশকারায় এখন এরা আরো বেপরোয়া।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে কিশোরদের বিজয় গ্রুপের হাতে খুন হয়েছেন শহরের মধ্য ছায়াবীথি এলাকার স্যানিটারি মিস্ত্রি সাদেক আলী (৩২)। এ ঘটনায় পুলিশ গত শুক্রবার কিশোর গ্যাং বিজয় গ্রুপের প্রধান বিজয়সহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে।

খুন হওয়া সাদেকের স্ত্রী সাবিনা বেগম বলেন, ‘বিজয় গ্রুপের ছেলেরা মধ্য ছায়াবীথি মোড়ের পাশের খালি জায়গায় দিন-রাত আড্ডা দেয়। প্রকাশ্যে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন সেবন করে। বিজয়ের চাচা পুলিশের বড় কর্তা। ওই দাপটে তার গ্রুপের ছেলেরা কাউকে পরোয়া করে না। সালাম না দেওয়ার জেরে আমার স্বামীকে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে কাওসার। এ সময় কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল বিজয়। দুই শিশুসন্তান ও আমার চোখের সামনেই ঘটেছে এ ঘটনা।’

মধ্য ছায়াবীথি এলাকায় গেলে প্রথমে কেউ ভয়ে মুখ খুলতে চায়নি। সাবিনা মুখ খোলার পর অনেকেই সাহস করে এগিয়ে আসেন। কথা হয় পিকআপচালক ফরিদ আলীর (৪০) সঙ্গে। তিনি বলেন, ছিনতাই, মাদক কারবার, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, কথায় কথায় ছুরি মারাসহ নানা অপরাধে জড়িত বিজয় গ্রুপের সদস্যরা। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর কাওসার ও মোবা। ১৫ দিন আগে সালাম না দেওয়ার অপরাধে আমার নবম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে শরীফকে পেটে চাকু মারে কাওসার। হাসপাতালে নিয়ে ছয়টি সেলাই দিতে হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটাচ্ছে তারা। পুলিশ প্রশ্রয় না দিলে এরা এত বেপরোয়া হতে পারত না।’

কাওসারের পুরো নাম কাওসার আহমেদ আকাশ (২১)। শহরের পশ্চিম ভুরুলিয়া এলাকার মো. শফিকুল ইসলামের ছেলে কাওসার এ বছরের অটো এইচএসসি পাস। মায়ের সঙ্গে মধ্য ছায়াবীথির ভাড়া বাসায় থাকে। মায়ের বিরুদ্ধেও রয়েছে অনৈতিক কাজের অভিযোগ। স্থানীয়রা জানায়, গেল এক মাসেই কমপক্ষে ১০ জন কাওসারের হাতে ছুরি অথবা চাকুর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।

এলাকায় মোবা (১৯) নামে পরিচিত হলেও তার প্রকৃত নাম মোবারক হোসেন। ইয়াবায় আসক্ত বলে সদর উপজেলার কুমুন গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে মোবা এলাকায় পরিচিত ‘বাবা মোবা’ নামে। মারপিট ও সাহসের জন্য দলনেতা বিজয়ের ঘনিষ্ঠ সে। এ গ্যাংয়ের নেতা মেহেদী হাসান ওরফে বিজয় (১৮)। মধ্য ছায়াবীথির আমজাদ হোসেন মুকুলের ছেলে সে। প্রভাবশালী পরিবার ও পুলিশ কর্মকর্তা চাচার কারণে বিজয় বুক চিতিয়ে গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে দলের অন্য সদস্যদের বেপরোয়া ত্রাসে পুরো মধ্য ছায়াবীথি এখন বিজয় গ্রুপের হাতের মুঠোয়। দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছে মধ্য ছায়াবীথির বাদল চন্দ্র বিশ্বাসের ছেলে নিলয় চন্দ্র বিশ্বাস (১৮), মারিয়ালী-কলাবাগান এলাকার মো. নুরুজ্জামানের ছেলে মো. শামীম (১৮) এবং কালীগঞ্জের কলাপাটুয়া গ্রামের রেজাউল করিমের ছেলে ইমন আহমেদ (২০)। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মাস্তানি, ছিনতাই, মাদক কারবার, নেশা, মেয়েদের উত্ত্যক্তসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যেটা ওরা করে না। পুলিশ এর আগে কয়েকবার তাদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর তারা আবার এলাকায় ফিরে আসে। এর পর থেকে তাদের ভয়ে আর কেউ কিছু বলে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুর শহরের প্রতিটি মহল্লায় গড়ে উঠেছে এমন ভয়ংকর ‘কিশোর গ্যাং’। রাজবাড়ী মাঠ ও শহীদ মিনার চত্বর, জোড় পুকুরের উত্তর ও পূর্ব পার, দক্ষিণ ছায়াবীথি, উত্তর ছায়াবীথি, মধ্য ছায়াবীথি, হাড়িনাল, লালমাটি, শ্মশান ঘাট, বারেকেরটেক, ফুলস্টপের গলি, বরুদা, ছায়াবীথি, রথখোলা, ভোড়া, হাজীবাগ, কাজীবাড়ি, পূর্ব চান্দনা, নীলেরপাড়া রোড, পশ্চিম জয়দেবপুর (লক্ষ্মীপুরা), মারিয়ালী, কলাবাগান, দেশীপাড়া, ভুরুলিয়া ময়লারটেক, ডুয়েট, এটিআই গেট, শিমুলতলী, চতর স্কুল গেট ও ফাওকাল এলাকায় এদের দাপট সবচেয়ে বেশি।

২০১৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শহরের রাজদিঘির পারে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের আক্রোশের জেরে ‘ভাই-ব্রাদার্স’ গ্রুপের হাতে খুন হয় অপর কিশোর নুরুল ইসলাম নুরু (১৬)।

গত ৫ জানুয়ারি রাতে শহরের দক্ষিণ ছায়াবীথির নিলেরপাড়া সড়কে কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ি ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় একজন পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। এ সময় প্রতিপক্ষ জনি (১৭) নামে এক কিশোরকে আটক করে পুলিশে দেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (ক্রাইম ও মিডিয়া) জাকির হাসান জানান, সাদেক আলীকে খুন করে তারা তাদের দাপট জানান দিয়ে সবাইকে আতঙ্কিক করতে চেয়েছিল। খুনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ কাওসার ও বিজয়সহ গ্রুপের ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের নামে আগে কেউ থানায় অভিযোগ করেনি। করলে অনেক আগেই তারা গ্রেপ্তার হতো।

কিশোর গ্যাং সম্পর্কে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহায়তার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সুযোগে কিছু শিক্ষার্থী অপরাধে জড়িয়েছে। তাদের তালিকা করা হচ্ছে। শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা