kalerkantho

রবিবার। ৫ বৈশাখ ১৪২৮। ১৮ এপ্রিল ২০২১। ৫ রমজান ১৪৪২

স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রথম শহীদ শংকু, যার রক্তে মিলেছিল অনুপ্রেরণা

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

৩ মার্চ, ২০২১ ১৮:৫৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রথম শহীদ শংকু, যার রক্তে মিলেছিল অনুপ্রেরণা

শহীদ শংকু সমজদার

স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের প্রথম শহীদ শংকু সমজদারের প্রয়াণ দিবস আজ ৩ মার্চ। যার রক্তে রক্তাক্ত হয়েছিলো রংপুরের মাটি। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিলো বিদ্রোহের আগুন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারাদেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলো মুক্তির সংগ্রাম আর শ্লোগানে। এদিনে অবাঙালির গুলিতে নিহত হন কিশোর শংকু। রংপুরবাসীর কাছে যা ‘শঙ্কু দিবস’ হিসেবে চির স্মরণীয় হয়ে আছে। দিবসটি পালনে রংপুরে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

আজ বুধবার দুপুরে রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিব আহসান নগরীর কামালকাছনা এলাকায় শহীদ শংকুর বাসভবনে যান। এ সময় তিনি শংকুর মা দীপালি সমজদারের সঙ্গে কথা বলেন। তার হাতে ২৫ হাজার টাকার চেক তুলে দেন তিনি। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে ছিলেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীরমুক্তিযোদ্ধা মোছাদ্দেক হোসেন বাবলু। 

সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাও শংকুদের বাসভবনে গিয়ে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি শংকুর মাকে সার্বিক সহয়োগিতার আশ্বাস প্রদান করেন।

এ ছাড়া দিবসটি উপলক্ষে শহীদ শংকু সমজদার বিদ্যানিকেতনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন রংপুর বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ তানিয়া সুলতানা সুমি’র সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাংস্কৃতিককর্মী, নাট্যব্যক্তিত্ব ও সমাজসেবক ডা. মফিজুল ইসলাম মান্টু,  কারমাইকেল কলেজের বাংলা বিভাগের ভূতপূর্ব অধ্যাপক শাহ আলম, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উমর ফারুক, প্রতিষ্ঠানের উপাধ্যক্ষ আফিফা ইশরত চেতনা প্রমুখ।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, পাকিস্তানি দখলদারদের শোষণ-শাসন এবং ষড়যন্ত্রের খপ্পর থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল রংপুরের মানুষ। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ যুবক, ছাত্র, কৃষক, দিনমজুর, নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের জনতা কারফিউ ভাঙার জন্য রংপুর শহরের কাচারিবাজারে সমবেত হয়েছিল। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও তৎকালীন রংপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম গোলাপ, অলক সরকার, মুকুল মুস্তাফিজ, নূর উর রসুল চৌধুরী, হারেস উদ্দিন সরকার, ইলিয়াস আহমেদ, মুসলিম উদ্দিন (মুসলিম কমিশনার), আবুল মনসুর আহমেদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে মিছিল বের হয়। সকাল ৯টায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া কৈলাশ রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র শঙ্কু সমজদার তার বড়ভাই কুমারেশ সমজদারের হাত ধরে গুপ্তপাড়ার বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন মিছিলে অংশগ্রহণের জন্য। মিছিলটি শহরের তেঁতুলতলা (বর্তমান শাপলা চত্ত্বর) এলাকায় আসতেই কলেজ রোড থেকে কারমাইকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি শহীদ মুখতার ইলাহি, জিয়াউল হক সেবুসহ অন্যান্যদের নেতৃত্বে আরেকটি মিছিল এসে যোগ হয় মূল মিছিলের সাথে। মিছিলটি আলমনগর অবাঙালি বিহারি ক্যাম্পের কাছে এলাকার অবাঙালী ব্যবসায়ী সরফরাজ খানের বাসার সামনে যেতেই কিশোর শঙ্কু ওই বাসার দেওয়ালে উর্দুতে লেখা সাইনবোর্ড দেখে তা নামিয়ে ফেলতে ছুটে যায়। আর তখনই বাসার ছাদ থেকে মিছিলে গুলিবর্ষণ করা হয়। সেখানে গুলিবিদ্ধ হন ভাইয়ের হাত ধরে মিছিলে আসা স্কুলছাত্র শঙ্কু সমজদার। গুলির বিকট শব্দে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। মাটিয়ে লুটিয়ে পড়া গুলিবিদ্ধ কিশোর শঙ্কুকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালের দিকে। কিন্তু ততোক্ষণে ইতিহাস রচিত হয়ে গেছে। পথেই কিশোর শঙ্কু মারা যান।

এদিকে শঙ্কুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে ক্ষোভের আগুনে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পুরো রংপুর। গুলিবিদ্ধ কিশোর শঙ্কুর রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখে জনতা উত্তেজিত হয়ে সারা শহরে অবাঙালিদের দোকান-পাট ভাঙচুর-অগ্নি সংযোগ করতে থাকে। যে বাড়ি থেকে গুলি ছোড়া হয়েছিল সেই বাড়িতে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা হলেও ইপিআর বাহিনী এসে বাঁধা দেন।

রংপুর মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সদরুল আলম দুলু বলেন, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সারাদেশের ভূমিকার পাশাপাশি সংগ্রামী ও অবহেলিত জনপদ রংপুরের অবদান ছিল অগ্রগণ্য। স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সূচনা হয় রংপুর, ঢাকা ও সিলেট থেকেই। স্বাধীন বাংলার প্রথম মিছিল হয়েছিল এ রংপুরেই। আর রংপুরে স্বাধীনতার প্রথম শহীদের দাবিদারও।

তিনি আরো জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম শহীদ হিসেবে ২০১২ সালে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে রংপুরের শঙ্কু সমজদার। বর্তমান সরকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় শঙ্কু সমজদারের নাম অন্তর্ভূক্ত করেছে। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের এক অনুষ্ঠানে সরকারি নির্দেশে ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় রংপুর জেলা প্রশাসন শঙ্কুর স্মৃতি রক্ষায় নগরীর কামাল কাছনা এলাকায় তার পৈত্রিক ভিটা সংলগ্ন বেদখল হয়ে যাওয়া ১০ শতক জমি উদ্ধার করে জমির দলিলপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে হন্তান্তর করেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা