kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

এক পায়ে রিকশা চালিয়েই সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন স্বামীহারা রোজিনা

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল    

৩ মার্চ, ২০২১ ১৪:১৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এক পায়ে রিকশা চালিয়েই সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন স্বামীহারা রোজিনা

প্রতিটি মানুষের জীবনেই কঠিন সময় আসে। কেউ হেরে যায়, কেউ লড়াই করে এগিয়ে যায়। তবে একের পর এক কষ্টের হানা যার জীবনে, তার জন্য টিকে থাকা মুখের কথা নয়।। শিশুকালে পা হারা‌নো, তার পর বি‌য়ে, প্রিয়জ‌নের মৃত্যু, পিঠা‌পি‌ঠি দুই শিশুসন্তান, তাদের নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসা, অটোরিকশা চালিয়ে জীবন চালিয়ে যাওয়ার যুদ্ধটা মোটেও সরল নয়। কিন্তু জীবনের এই অসম যুদ্ধ একাই লড়ে যাচ্ছেন পঙ্গু এক নারী।

তিনি রো‌জিনা বেগম (৩০)। তার একটি পা নেই। তবে কোনো ক্র্যাচ পদবি ব্যবহার করেন না। এক পা‌য়ে অটোরিকশা চালান পটুয়াখালীর মীর্জাগঞ্জের রাস্তায়। রো‌জিনা নিজের ভাষায় জানিয়েছেন তার জীবনের লড়াইয়ের কাহিনি। রিকশা চালিয়েই সন্তানদের মুখে ডাল-ভাত তুলে দেন এই স্বামীহারা নারী। 

রাস্তায় রো‌জিনা
মাথায় হিজাব, পরনে ছাপার থ্রি‌পিস। বেশির ভাগ সময় এই বেশেই তাকে দেখা যায়। রিকশা চালানোর পরেও হাসি মিলিয়ে যায় না রো‌জিনার মুখ থেকে। এভাবেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন বেঁচে থাকার আনন্দ। অমানুষিক পরিশ্রম হয় তার। কিন্তু নিজের জীবনে খুশি তি‌নি। রিকশা চালিয়ে প্রতি‌দিন গ‌ড়ে ২৫০ টাকা তার উপার্জন। প্রথমদিকে যাত্রী পেতেন না। কিন্তু হাল ছাড়তে নারাজ রো‌জিনা। সংগ্রামের মূল্য পেয়েছেন তিনি। এখন যাত্রী পেতে সমস্যা হয় না। পুরনো যাত্রীরা তো আছেনই। নতুনরা প্রথমে একটু থমকে যান ঠিকই। কিন্তু শেষ অবধি রো‌জিনাই তাদের পৌঁছে দেন গন্তব্যে।

রো‌জিনার কাছে লড়াইটা অসম এবং অসম্ভবই ছিল। প্রথমদিকে উড়ে এসেছে অসংখ্য টিপ্পনি। ‘এটা মেয়েদের কাজ নয়’, ‘এই কাজ ইসলামবিরোধী’, শুনতে হয়েছে এ রকম অনেক কথা। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন রো‌জিনা। কার্যত অসম্ভবকেই সম্ভব করে তি‌নি দেখিয়েছেন। 

দ‌ক্ষিণাঞ্চ‌লের রাস্তায় রিকশা চালান তিনি। সম্ভবত অন্যতম নারী রিকশাচালক। রিকশার প্যাডাল ঘুরলেই তার এবং সন্তানদের মুখে খাবার জোটে। দুই সন্তানের স্কুলের বেতনের জোগানও হচ্ছে। প্রতিবেশীর একটি অটোরিকশা নিয়ে শুরু হয় প্রচেষ্টা। প্রথমে দুঃসাধ্য মনে হলেও কয়েক দিনের মধ্যে আয়ত্তে এসে যায়। 

স্বামী না ফেরার দে‌শে পা‌ড়ি জ‌মি‌য়ে‌ছেন। দুই সন্তানকে নিয়ে বিপাকে পড়লেন রো‌জিনা। গৃহবধূ রো‌জিনা কোনো দিন উপার্জন করেননি। ভেবেই দিশাহারা, কী করে দুই সন্তানের মুখে দুই বেলা ডাল-ভাত তুলে দেবেন!

এবার কি তবে নামতে হবে ভিক্ষায়? রো‌জিনার মন এ কাজে সায় দিল না। আল্লাহ এক জোড়া হাত আর এক জোড়া পা দিয়েছিলেন। কিন্তু একটি পা হারিয়ে আজ তিনি পঙ্গু। তার পরও কেন বিনা পরিশ্রমে উপার্জন করবেন? ভাবলেন, এমন পথে যাবেন, যেখানে মেয়েরা সাধারণত পা রাখেন না। রো‌জিনা ঠিক করলেন, তিনি রিকশা চালিয়েই উপার্জন করবেন। 

‌রো‌জিনার সোনালি অ‌তীত
রো‌জিনার গ্রামের বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়ায়। সাত বছর বয়সে টাইফয়েডে তার বাঁ পা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। অল্প বয়সে বরিশালের মুলাদী উপজেলার খেজুরতলা গ্রামের অটোরিকশাচালক সুমন খানের সঙ্গে বিয়ে হয়। স্বামীর সঙ্গে তিনি ঢাকার মিরপুরে থাকতেন। 

ছয় বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তার স্বামী মারা যান। তখন সাত বছরের মেয়ে রিতু ও চার বছরের ছেলে হৃদয়কে নিয়ে কঠিন বিপদে পড়েন তিনি। রোজিনা বলতে থাকেন, একসময় ঢাকা শহরে রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। ব্যয়ের তুলনায় আয় সামান্য হওয়ায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন মির্জাগঞ্জে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে দূরে থাকার জন্যই মির্জাগঞ্জ আসেন।

রো‌জিনার দিনকাল
ছেলে-মেয়ে নিয়ে তিনজনের সংসার চালান ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে। তিন মাস ধরে উপজেলায় এই কাজ করছেন তিনি। উপজেলার একটি ভাড়া বাসায় তার সংসার। 

তিনি বলেন, প্রথমদিকে কেউ তাকে ভাড়ায় রিকশা দিতে রাজি হতেন না। তিন মাস আগে পরিচিত একজনের মাধ্যমে দিনে ২০০ টাকা ভাড়ায় রিকশা নিয়ে নতুনভাবে জীবনসংগ্রাম শুরু হয় রোজিনার।

তবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত নারী হিসেবে প্রতিনিয়তই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় বলে রোজিনা জানান। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় আমাকে নারী রিকশাচালক হিসেবে দেখে অনেক যাত্রী ভরসা করতে পারেন না। তাই যাত্রী কম হয়। সারা দিন টানা রিকশা চালাতে পারি না। সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরে আসতে হয়। 

যতটুকুই চালাই রিকশার মালিককে জমা দিতে হয় ২০০ টাকা। এরপর ১৫০-২০০ টাকা থাকে। ছেলে হৃদয়কে স্থানীয় একটি হাফিজিয়া মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছি। মেয়ে রিতু পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। নিজের একটা রিকশা থাকলে কিছু টাকা জমানো সম্ভব হতো। ছেলেমেয়েকে নিয়ে দুবেলা খেয়ে বাঁচতে পারতাম।

জনপ্র‌তি‌নি‌ধি  যা বল‌লেন
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খান মো. আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, একজন প্রতিবন্ধী মা হয়ে ভিক্ষা না করে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন রোজিনা। তাকে উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে ভাতাভোগীদের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। সমাজে যারা রোজিনার মতো সংগ্রামী জীবন যাপন করছেন, তাদের সাহায্যে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা