kalerkantho

সোমবার । ৬ বৈশাখ ১৪২৮। ১৯ এপ্রিল ২০২১। ৬ রমজান ১৪৪২

নৌকার ‘ভোটলজ্জা’ বগুড়ায়

লিমন বাসার, বগুড়া    

২ মার্চ, ২০২১ ০৭:৪১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নৌকার ‘ভোটলজ্জা’ বগুড়ায়

নৌকার প্রার্থী আবু ওবায়দুল হাসান ববি।

চারদিকে নৌকার একচেটিয়া জয়ধ্বনি। নানা কারণেই ভোটের ফলে এখন অনেকটাই ‘বামন’ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। এর মধ্যেও নির্বাচনী মঞ্চে ব্যতিক্রমী চরিত্র আছে। হাতে গোনা কয়েকজন সরকারদলীয় প্রার্থীর কপালেই জুটছে পরাজয়ের তিলক। তাই বলে ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর এমন গোহারা হজম করতে পারছে না কেউই। প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ ভোট বাক্সে না পড়ায় বগুড়া পৌরসভায় নৌকার প্রার্থী আবু ওবায়দুল হাসান ববিকে খোয়াতে হয়েছে নির্বাচনী জামানাতটাই!

বগুড়ায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অবস্থান এখন আগের চেয়েও সুদৃঢ়। অঙ্গসংগঠনগুলোতে গিজগিজ করে নেতাকর্মী। সভা-সমাবেশ কিংবা মিছিলে দাঁড়ানোরও জো থাকে না। উঠতি নেতারা আয় করছেন দুহাত ভরে। সেই জেলায় ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর এমন ভোটলজ্জা! মানতে পারছে না তৃণমূল। গেল রবিবার অনুষ্ঠিত দেশের ২৯ পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কেবল জয়ে চোখ রাখতে পারেনি বগুড়ায়ই। এদিকে বগুড়া জেলার ১২ পৌরসভার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৯টির ভোট। নৌকার দলীয় প্রার্থী তিনটিতে জয়ের দেখা পেলেও হেরেছে ছয়টিতেই।

কে পেলেন কত ভোট : বগুড়া পৌরসভায় ভোটার দুই লাখ ৭৫ হাজার ৮৭০ জন। এর মধ্যে এক লাখ ৬৫ হাজার ১১২ জন ভোট দেন। ভোট পড়েছে ৫৯.৮৫ শতাংশ। মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশা পেয়েছেন ৮২ হাজার ২১৭ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল মান্নান আকন্দ পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৯০ এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবু ওবায়দুল হাসান ববি পেয়েছেন ২০ হাজার ৮৯ ভোট। আওয়ামী লীগের প্রার্থীর চেয়ে প্রায় ৬২ হাজার ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হন বিএনপির প্রার্থী। প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ ভোটও পাননি নৌকার প্রার্থী। এ কারণে তাঁকে খোয়াতে হয়েছে জামানত।

কেন এমন হার : হারের পর প্রাথমিক বিশ্লেষণে ভুল প্রার্থী নির্বাচন, নেতাদের অসহযোগিতা, দলীয় বিবাদ এবং নেতায় নেতায় মনোমালিন্যের বিষয়টি উঠে আসে। এর আগে অনুষ্ঠিত বগুড়ার আট পৌর নির্বাচনে দলের কোনো প্রার্থীই জামায়াত হারাননি। এমনকি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান বলে পরিচিত গাবতলী পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোমিনুল হক শিলু জিততে না পারলেও দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন। কিন্তু বগুড়ার মতো একটি বড় পৌরসভায় সরকারদলীয় প্রার্থীকে জামানত হারাতে হয়েছে, এটি কোনোভাবেই হজম করতে পারছেন না নেতাকর্মীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা জানান, এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী অনেকেরই পছন্দের ছিলেন না। তাঁরা প্রকাশ্যে বিরোধিতা করতে না পারলেও টাকার বিনিময়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে ভোট দিয়েছেন তাঁকেই। অনেকে আবার বিদ্রোহী প্রার্থীকে পরাজয়ের কারণ হিসেবে দুষছেন। তিনি দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পরও স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ে দ্বিতীয় হন। আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল মান্নান আকন্দের জগ মার্কার হয়ে ভোটের মাঠে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নৌকার প্রার্থী আবু ওবায়দুল হাসান ববিকে শহরের সাধারণ ভোটারদের অনেকেই চেনেন না। তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছেও তিনি নতুন মুখ। শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নিলেও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর ছায়াও দেখা যেত না। শহর আওয়ামী লীগের চেষ্টায়ই নৌকা ধরা দেয় তাঁর হাতে।

বগুড়া শহরের চেলোপাড়া এলাকার বাসিন্দা হামিদুর রহমান, মালতীনগরের ভোটার নিত্যানন্দ দাস ও ঠনঠনিয়ার স্বপন কুমার বলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নে ভুল ছিল। অপরিচিত ও অপরিপক্ব একজনকে দাঁড় করিয়ে দেওয়ায় এমনটা হয়েছে। 

বগুড়ার নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, ষষ্ঠ থেকে ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া সদর আসনের ভোটচিত্র দেখলে আওয়ামী লীগের ভোটের প্রবাহের একটা ধারণা মেলে। গত ৩০ বছরে ছয়টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম এই চার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট দিন দিন বাড়ে। দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জোটের প্রার্থী জয়ী হন। ২০১৮ সালের ১১তম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট কমে ৫০ শতাংশ। বিগত সময়গুলোতে ভোট বাড়লেও ২০১৮ সালে ভোট কমার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অতীতে দলটিতে নেতা কম ছিলেন, বেশি ছিলেন কর্মী। আর যাঁরা দল করতেন তাঁরা ছিলেন ত্যাগী। আর এখন বগুড়ায় দলে নেতা বেশি, কর্মী কম।

নেতারা কে কী বলছেন : পরাজয় প্রসঙ্গে বগুড়া শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি রফি নেওয়াজ খান রবিন বলেন, ‘আমরা শিগগিরই ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়ে বৈঠক করব। এ ক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধেই আসবে তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ প্রার্থী নির্বাচনের ব্যাপারে রবিন বলেন, ‘তৃণমূলের মত নিয়ে তিনজনের নাম কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ওবায়দুল হাসান ববিও একজন ছিলেন। পরে নেত্রী তাঁকেই মনোনয়ন দেন।’

বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুর রহমান দুলু বলেন, ‘দলের ভেতরে বিভক্তি স্পষ্ট। ওয়ার্ড সম্মেলন অনেক দিন হয় না। শহর আওয়ামী লীগ যাঁকে নৌকার প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রে সুপারিশ করেছে, তাঁকে অনেক নেতাকর্মীই চেনেন না। নিজেকে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরতে তিনি আগে কখনো সাধারণ ভোটারদের কাছে যাননি। সবচেয়ে বড় কথা, আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ স্বতন্ত্র প্রার্থীর হয়ে মাঠে কাজ করেছে। এ কারণেই এই বড় পরাজয়।’

এদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবু ওবায়দুল হাসান ববির সঙ্গে কথা বলতে গতকাল একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে এবং খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা