kalerkantho

রবিবার। ৫ বৈশাখ ১৪২৮। ১৮ এপ্রিল ২০২১। ৫ রমজান ১৪৪২

পশু-পাখির ডাক শুনিয়ে আনন্দ দেন নলছিটির ইউনুস

কে এম সবুজ, ঝালকাঠি   

২ মার্চ, ২০২১ ০৪:৩৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পশু-পাখির ডাক শুনিয়ে আনন্দ দেন নলছিটির ইউনুস

পশু-পাখির ডাক শুনিয়ে মানুষকে আনন্দ দিয়ে যাচ্ছেন ছোট থেকেই। পাশাপাশি মুখ দিয়ে লঞ্চের হর্ণ বাজানো, নবজাতকের কান্না ও সংগীত পরিবেশনায়ও রয়েছে তাঁর সুনাম। প্রতিভাবান এ ব্যক্তির নাম ইউনুস হাওলাদার (৪৮)। তিনি ঝালকাঠির নলছিটি পৌর এলাকার পূর্ব নাঙ্গুলী গ্রামে বসবাস করেন। দিনমজুরের কাজ করেন, সময় পেলেই বাড়িতে আসর বসিয়ে পশু-পাখির ডাক অবিকল রপ্ত করে ডেকে শোনান। এমনকি এলাকার নানা অনুষ্ঠানেও তাঁর এই ডাক শুনতে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

নলছিটি শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে নাঙ্গুলী গ্রাম। আড়াপোল থেকে ডান দিকে আঁকাবাঁকা পথ, ভাঙা রাস্তা দিয়ে ঢুকে কিছু দূর গেলেই ছোট একটি টিনের ঘর। এই খুপড়ি ঘরেই পরিবার নিয়ে বাস করেন প্রতিভাবান ইউনুস হাওলাদার। সম্প্রতি ওই বাড়িতে গেলে দেখা হয় তাঁর সঙ্গে। কৃষি কাজ করে ঘামে ভেজা শরীর কিছুটা মুছে বসে পড়েন খাবার খেতে। খাবার ফাঁকে ফাঁকে কথা হয় তাঁর সংগ্রামী জীবন নিয়ে। ছোট থেকেই পরিশ্রমী ইউনুস হাওলাদার অন্যের কাজ করতে করতে এখন হাপিয়ে উঠেছেন। ভাত খাওয়া শেষে ঘরের সামনে একটি চৌকিতে বসেন। সামনে জড়ো হয় স্থানীয় শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষ। পড়ন্ত বিকেলে দিনের সকল ক্লান্ত দূর করতে আসর বসান পশু-পাখির ডাকের। মোরগ, বিড়াল, কোকিল, কাক, শিয়াল কত জীবজন্তুর ডাক অনায়াসে ডেকে যাচ্ছেন। অবিকল রপ্ত করে সাবলিলভাবেই ডেকে শোনাচ্ছেন ইউনুস হাওলাদার। এসব ডাক শুনে মনে হবে বনের পশু ছুটে এলো লোকালয়ে। কখনো একতারা, দো-তারাও বাজাচ্ছেন মুখ দিয়ে। লঞ্চের হর্ণ ও নবজাতকের কান্নার শব্দ হুবহু শোনান তিনি। 

ইউনুস হাওলাদার ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কখনো কৃষি কাজ, রাজমিস্ত্রির সহকারী, অন্যের বাড়িতে দিনমজুরিই তাঁর পেশা। এ থেকে যা রোজগার হয়, তা দিয়েই চলে সাত সদস্যের সংসার। দারিদ্র্যতা পিছু না ছাড়লেও স্ত্রী, তিন ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে সুখি তিনি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করার পরে অভাবে ঝড়ে পড়ে তাঁর শিক্ষাজীবন। বাবা খবির উদ্দিন হাওলাদারের সঙ্গে মাঠে কাজ করতে গিয়েই পশু-পাখির ডাক শুনে রপ্ত করেন তিনি। নিজে পড়ালেখা করতে না পারলেও সন্তানদের স্কুল ও মাদরাসায় পড়াচ্ছেন তিনি। ইউনুস যেমন পরিশ্রমী, তেমনি প্রতিভাবানও। তাঁর প্রসংশায় মুগ্ধ এলাকার মানুষ। যত দিন বেঁচে আছেন, ততদিনই মানুষকে আনন্দ দিয়ে যেতে চান প্রতিভাবন ইউনুস হাওলাদার। বয়স যতই বাড়ছে, অন্যের বোঝা কাঁধে বইতে কষ্ট হচ্ছে তাঁর। এই বয়সে সে একটি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান অথবা পশু-পাখির খামার করে ভালো থাকতে চান। কিন্তু অর্থাভাবে এসব কিছুই তাঁর কাছে স্বপ্ন। তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগতা চান ইউনুস হাওলাদার।

ইউনুসের স্ত্রী মাহামুদা বেগম বলেন, বিয়ের আগে থেকেই আমার স্বামী পশু-পাখির ডাক ডাকতে পারেন। আমাকে যখন প্রথম দেখতে যান, তখনো তিনি কোকিলের ডাক ডেকেছিলেন। ওনি একজন ভালো মানুষ, সারাজীবন ওনার সঙ্গেই কাটাতে চাই। স্বামীর আয় কম, কিন্তু মনটা অনেক বড়। আমাদের ভালো একটি বসতঘর নেই। কোনো রকমের চারপাশে টিনের বেড়া দিয়ে পাঁচ সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছি। যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে আমাদের সংসার।

ইউনুসের প্রতিবেশী মাসুম হাওলাদার বলেন, ইউনুস হাওলাদার একজন কৃষক। তিনি অত্যন্ত সৎ ও ভালো একজন মানুষ। তাঁর প্রতিভা রয়েছে। সে মানুষকে আনন্দ দেন পশু-পাখির ডাক শুনিয়ে। আমরাও মাঝে মধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এসব ডাক শুনি। তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ, তাকে সবাই সহযোগিতা করলে এই বয়সে সে একটু ভালো থাকতে পারতো।

দক্ষিণ মালিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, ইউনুস আমার প্রতিবেশী। তাকে প্রায়ই দেখি মাঠে কাজ করতে, আবার বাড়িতে আসর বসিয়ে পশু-পাখির ডাক শোনাতে। অবিকল যেকোনো পশুর ডাক সে ডাকতে পারে। তিনি আমাদের গ্রামের গর্ব। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা