kalerkantho

রবিবার। ৫ বৈশাখ ১৪২৮। ১৮ এপ্রিল ২০২১। ৫ রমজান ১৪৪২

মোহনগঞ্জের বাহাম আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৩৮ পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন

হাফিজুর রহমান চয়ন, হাওরাঞ্চল    

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১৩:২৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মোহনগঞ্জের বাহাম আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৩৮ পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের বাহাম আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো দীর্ঘদিন ধরে মেরামতের অভাবে চালের টিনগুলো ফুটো হয়ে যাওয়ায় এভাবেই ঘরের চালের ওপর পলিথিন দিয়ে মানবেতর দিনযাপন করছেন এখানকার বাসিন্দারা। ছবি: কালের কণ্ঠ

দেশব্যাপী ভূমিহীনসহ দরিদ্রদের মাঝে সরকারিভাবে হাজার-হাজার ঘর নির্মাণ করে দিলেও নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার ‘বাহাম আশ্রয়ন প্রকল্পের’ ঘরগুলো দীর্ঘদিন ধরে মেরামতের অভাবে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। 

এতে করে ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসরত অনেক পরিবারের লোকজনই ভাঙাচোরা ওইসব ঘর ফেলে রেখে তারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। আর ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পে যেসব পরিবারের লোকজন বসবাস করছেন তারা ঘরের চালে ও বেড়ায় পলিথিনে ঢেকে মানবেতর দিনযাপন করছেন। এ ছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানির আভাবসহ আরো নানান সমস্যায় ভুগছেন এখানকার বাসিন্দারা। 

জানা গেছে, সরকারিভাবে ২০০১ সালে উপজেলার বড়কাশিয়া-বিরামপুর ইউনিয়নের বাহাম মৌজায় প্রায় ১০ একর খাস জমিতে এলাকার ৭০টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১০ কক্ষবিশিষ্ট সাতটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়। আর তখন থেকেই ওই ঘরগুলোতে ৭০টি ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজন বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন যাবত ওই ঘরগুলো মেরামত না করায় চালের ও বেড়ার টিনগুলো ফুটো হয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় নিরূপায় হয়ে এরই মধ্যে প্রায় ৩২টি পরিবার তাদের এসব ভাঙা ঘর ফেলে রেখে অন্যত্র চলে গেছে। বাকি ৩৮টি পরিবারের লোকজন তাদের নিজ নিজ ঘরের চালে ও বেড়ায় পলিথিন দিয়ে কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এছাড়াও আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের জন্য নির্মিত কমিউনিটি সেন্টারটিও দীর্ঘদিন ধরে ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে রয়েছে। 
আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৭টি নলকূপ স্থাপন করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেগুলোও অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় এখানকার লোকজন বিশুদ্ধ পানির অভাবেও ভুগছেন। শুধু তাই নয়, তাদের স্যানিটেশন ব্যবস্থারও নেই কোনো উন্নতি। জন্ম নিয়ন্ত্রণ, প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যক্রমে এ পর্যন্ত উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া পড়েনি ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পটিতে।

ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বিধবা নারী শাজেদা বেগম বলেন, বাবা আপনি তো প্রতিবছরই খালি ছবি উঠাইয়া আর লেইখ্যাই লইয়্যা যাইন। আমরার ঘরতো আর কেউ ঠিক কইরা দেয় না। এইবার কি সত্যি সত্যিই আমরার ঘরগুলো সরকার ঠিক কইরা দিবো? এ কথা বলে তিনি একটি  দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরো বলেন, আইজ কত বছর ধইরা এই ভাঙা ঘরে পলিথিন দিয়া ঢিফা-তালী (জোড়াতালী) দিয়া দিন কাটাইতাছি। আমরার খবর আর কেউই লয় না, হুনতাছি প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে আমরার মতো গরীবরারে সুন্দর সুন্দর বাড়ি বানাইয়া দিতাছে। আমরার ঘরডি (ঘরগুলো) যদি একটু ঠিক কইরা দিত। তাইলেতো বাকি যে কয়দিন বাঁচি একটু শান্তিতে কাটাইয়া যাইতে হারতাম।

প্রকল্পের বাসিন্দা আব্দুর সাত্তার (৫৮) বলেন, অনেক জোড়াতালি দিয়া ওইসব ঘরগুলোতে আমরা বসবাস করছি। বৃষ্টি হলে বাইরে পানি পড়ার আগে আমাদের ঘরের ভেতরে পড়তে থাকে। তখন ছেলে মেয়েদের নিয়ে পলিথিন মাথায় দিয়া বসে থাকতে হয়। এছাড়াও এখানে শিক্ষা, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহসহ নানা সমস্যায় আমাদেরকে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

একই ধরনের মন্তব্য করেন, ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা খুরশিদ মিয়া (৬২),আবুল ইসলাম (৬০), জবেদ আলী (৬৫), সুনু মিয়া (৬৪) সহ অনেকেই।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. দুলাল মিয়া বলেন, ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় এখানকার অনেক পরিবারই ভাঙা ঘর ফেলে অন্যত্র চলে গেছেন। বাকি পরিবারগুলোও জোড়াতালি দিয়ে খুবই কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। তাই ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো দ্রুতই মেরামত করে দেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মেরামত না করায় ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো সম্পূর্ণভাবে  বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আর ওইসব ঘরগুলো মেরামত করে দেওয়ার জন্য আমি উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সাথেও বারবার কথা বলে আসছি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, বাহাম আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারীদের অনেক সমস্যা রয়েছে তা আমি জানি। ওই প্রকল্পের ঘরগুলো মেরামতের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ না থাকায় ঘরগুলো মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ওই প্রকল্পে স্পেশাল বরাদ্দ দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা