kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ বৈশাখ ১৪২৮। ২০ এপ্রিল ২০২১। ৭ রমজান ১৪৪২

বর্ণিল ঘাগটিয়া মাদকে নীল

কাপাসিয়ার জনপদটিতে কারবারিদের ভয়ে মানুষের মুখ কুলুপ আঁটা

শাহীন আকন্দ, গাজীপুর (আঞ্চলিক)    

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:৫৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বর্ণিল ঘাগটিয়া মাদকে নীল

ঘাগটিয়া। গাজীপুরের কাপাসিয়ার নিরিবিলি ছোট্ট গ্রামীণ জনপদ। ইউনিয়নটির বুক ফুঁড়ে বানার নদীর স্রোতোধারা। সেখানকার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষেরই পেশা চাষবাস। দিনে হাড়ভাঙা খাটুনির পর সন্ধ্যায় অস্তাচলে সূর্য ডুবলে সেসব মানুষের জীবনের বাঁকে ধরা দিত আনন্দরেখা, জীবন হয়ে উঠত বর্ণিল। গ্রামে গ্রামে বসত গানের আসর, উৎসবের রোশনাই ছড়িয়ে পড়ত ইউনিয়নের পথে পথে। এক দশকের ব্যবধানে সেই জনপদের রঙিন ছবির পুরোটাই এখন মাদকে নীল।

ঘাগটিয়ায় এখন সন্ধ্যা নামে মাদকের আসর সঙ্গী করে। মাঠঘাটে, পুকুরপারে, নির্জন গাছতলায়, এমনকি সড়কের পাশে গভীর রাত পর্যন্ত নির্বিঘ্নে চলে মাদকের কারবার। শুধু তা-ই নয়, কারবারিদের কেউ কেউ বিভিন্ন স্থানে বানিয়েছে ঘর, যেখানে ধুমধামে বসে মাদকের আসর। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী একবার একটি মাদকঘর জ্বালিয়ে দিলেও দমেনি কারবারিরা। উল্টো এ জন্য মাসুল গুনতে হয়েছে অনেককে। হামলায় কেউ হয়েছেন ক্ষতবিক্ষত, কেউ পড়েন সাজানো মামলার গ্যাঁড়াকলে, কেউ পান প্রকাশ্য মৃত্যু পরোয়ানা। তাই ইউনিয়নের শান্তিপ্রিয় মানুষের মুখ কুলুপ আঁটা। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ভুলেও একটি শব্দ বের হয় না।

ঘাগটিয়ার গ্রামে গ্রামে মাদকের ব্যাপারে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবার অভিন্ন উত্তর, ‘মাদক সব শেষ কইরা দিছে।’ মাদক কারবারি কারা জানতে চাইলে বলেন, ‘আপনি ঘুইরা দেহেন, জানতে পারবেন। নাম কইয়া মাইর খায়াম নাকি!’ অনেকবার প্রশ্ন করার পর কেউ কেউ ভয়ে ভয়ে জানান, খুচরা কারবারি অনেক, তবে নিয়ন্ত্রণ ও পাইকারি কারবারে জড়িত হাতে গোনা কয়েকজন। সবাই প্রভাবশালী। তাদের একজন উপজেলা যুবলীগ নেতা।

খোদ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহীনূর আলম সেলিম বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে অনেক চেষ্টা করছি। পেরে উঠছি না। দিন দিন মাদকের বিস্তার ঘটছে। খুবই অসহায় আমরা।’ এ ব্যাপারে ইউনিয়ন কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সভাপতি আবু বকর সিদ্দিকের চোখে-মুখে আরো বেশি ক্ষোভ টের পাওয়া গেল। তিনি বলেন, ‘প্রতিবাদ করে দোষী হয়েছি। মাদক কারবারিরা প্রাণনাশের হুমকি দেয়। থানায় জানিয়েছি, ফল পাইনি।’

মাদক কারবারিদের ভয় পাওয়ার কারণ কী জানতে চাইলে উদাহরণ দিয়ে অনেকেই জানিয়েছেন, মাদকসহ এক কারবারিকে আটকের পর তার সহযোগীরা পুলিশকে পিটিয়ে হাতকড়াসহ ছিনিয়ে নিয়েছে এমন নজিরও আছে এই এলাকায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘাগটিয়া ইউনিয়নে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত মাদক ইয়াবা। অনেকেরই ধারণা, এখানে মাদকাসক্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাবে। ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র জানায়, ইউনিয়নে ৯টি ওয়ার্ডে গ্রাম রয়েছে ২৩টি। জনসংখ্যা ৪০ হাজারের কাছাকাছি। আর পরিবারের সংখ্যা পাঁচ হাজার। ওই হিসাবে গড়ে পাঁচ পরিবারের মধ্যে একটিতে একজন মাদকাসক্ত রয়েছে। মাদকাসক্তের বেশির ভাগেরই বয়স ১৮ বছরের নিচে।

চিকিৎসায় মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া দুই ব্যক্তি জানান, মাদকাসক্তদের থেকেই তাদের সহপাঠীদের মধ্যে ইয়াবা আসক্তি ছড়াচ্ছে। প্রথমে বিনা খরচায় সেবন করায়। আসক্ত হয়ে পড়লে নিজেদের মধ্যে খুচরা বেচাকেনায় জড়িয়ে পড়ে। এভাবেই সংক্রামক রোগের মতো ইয়াবার আসক্তি দিন দিন বাড়ছে। তাঁরা আরো জানান, ইউনিয়নে মাদকাসক্তের বেশির ভাগই ইয়াবাসেবী। এর পরই গাঁজা। অনেক কিশোর-তরুণও গাঁজায় আসক্ত। তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে ফেনসিডিল ও হেরোইন, এরপর বাংলা মদ। তাঁরা জানান, শরীরের ওপর তাত্ক্ষণিক প্রভাব এবং সহজলভ্যতার জন্য মাদকাসক্তরা ইয়াবার দিকেই ঝোঁকে বেশি।

ঘাগটিয়া ইউনিয়নের পাশঘেঁষা নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা। এলাকাবাসী জানায়, পুলিশের অভিযান টের পেলে চিহ্নিত মাদক কারবারিরা মনোহরদীতে অবস্থান নেয়। সেখানকার কারবারিদের সঙ্গে এই এলাকার মাদক কারবারিদের দোস্তি অনেক পুরনো। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভয়াবহ জাল বিস্তারের পরও পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান কমছে। কিছুদিন ধরে এখানে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের তৎপরতা অনেক কম।

তবে গাজীপুরের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার এ কে এম জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘তৎপরতা কম নয়, বরং বাড়ানো হয়েছে। মাদক কারবারি যে-ই হোক, তাকে ধরা হচ্ছে।’

থানা সূত্র জানায়, পুলিশের হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী কাপাসিয়ায় মাদক কারবারি ২৭০ জন। এর মধ্যে ২৪৬ জনই ইয়াবা কারবারি। ঘাগটিয়া ইউনিয়নে কারবারির সংখ্যা ৩৪। যদিও পুলিশের এই তালিকার বাইরেও মাদক কারবারে জড়িত আরো অনেকের তথ্য জানা গেছে। ঘাগটিয়ায় ৩৪ মাদক কারবারির মধ্যে দুজন বাংলা মদের, বাকিরা ইয়াবার কারবারি। পুলিশের তালিকা অনুয়ায়ী মাদক কারবারি ৩৪ জনের মধ্যে ছয়জন পাইকারি বিক্রেতা, বাকি ২৮ জন খুচরা বিক্রেতা।

থানা সূত্রটি আরো জানায়, কাপাসিয়া পুলিশ গত দেড় মাসে ১৪ জন মাদক বিক্রেতাকে আটক করে। মামলা হয়েছে ছয়টি। এই সংখ্যা আগের তিন বছরের চেয়ে অনেক কম। ২০১৮ সালে মামলা হয়েছিল ২৭১টি আর গ্রেপ্তার হয়েছিল ৪৬০ জন। ২০১৯ সালে মামলা হয় ২১০টি আর গ্রেপ্তার হয় ৩৫৩ জন। গত বছর তা আরো অনেক কমে আসে, ২০২০ সালে মামলা হয় ৮০টি, গ্রেপ্তার হয় ১৬০ জন।

ঘাগটিয়া ইউনিয়নের কামারগাঁও ও মানিকবাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, পথেঘাটে অনেকটা প্রকাশ্যেই ইয়াবার বিকিকিনি দেখা যায়। পুলিশকে জানালেও সাড়া মেলে না। কয়েক মাস ধরে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতাও চোখে পড়ে না।

এই অভিযোগ প্রসঙ্গে ঘাগটিয়া বিট পুলিশিংয়ের দায়িত্বে থাকা কাপাসিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) পলাশ বাউন বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের তৎপরতা আছে। তবে দেড় মাস ধরে এ ইউনিয়নে বিট পুলিশিংয়ের দায়িত্বে আমি। এই দেড় মাসের মধ্যে এ ইউনিয়ন থেকে কোনো মাদক বিক্রেতা আটক বা মামলা হয়নি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কামারগাঁও গ্রামের এক তরুণ জানান, ইয়াবার গডফাদার শ্যামল মোল্লা। ইউনিয়নজুড়ে যত খুচরা বিক্রেতা আছে, তারা শ্যামলেরই লোক। গ্রামের মাদক বিক্রেতারা হলেন জাকির হোসেন মোল্লা, শাখাওয়াত, রুবেল, রবিন, ফারুক ও জামান। তাঁদের মধ্যে জামান মাদকের মামলায় জেল খেটেছেন।

একই গ্রামের ষাটোর্ধ্ব এক কৃষক জানান, জাকির হোসেন মোল্লার বাড়ির পূর্ব পাশে ১০০ গজ দূরে সেমিপাকা একটি ঘর আছে। রাত ১২টার পর মাদকের আড্ডা বসে ঘরটিতে। আড্ডা চলে ভোর পর্যন্ত।

খিরাটি গ্রামের আরেক তরুণ জানান, খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চার জন্য গ্রামটির সুনাম ছিল। সেই সুনাম গ্রাস করেছে মাদক। প্রায় দুই বছরে গ্রামে মাদকাসক্ত আর মাদক বিক্রেতা বেড়েছে কয়েক গুণ। তিনি জানান, শাকিব, তারেক, মাসুম, শামীম, জিয়াউল, মিল্টন ছাড়াও এই গ্রামে অনেক মাদক কারবারি রয়েছে। মাদক বিক্রির সময় হাতেনাতে গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়লে তারা (বিক্রেতা) বলে, শ্যামল ভাইয়ের মাল (ইয়াবা)।

খিরাটি গ্রামের মাহবুবুর রহমান জানান, দুই বছর আগে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন তাঁরা। ওই সময় মাদকবিরোধী সমাবেশ করে চার-পাঁচ শ লোকের সই নিয়ে মাদক নির্মূলের জন্য পুলিশের কাছে আবেদন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা আর এগোয়নি।

ইউনিয়নটিতে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার প্রসঙ্গে কাপাসিয়া থানার ওসি মো. আলম চাঁদ বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত চলছে। এ ছাড়া সচেতনতায়ও কাজ করছি।’

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আমানত হোসেন খান বলেন, ‘পাশের নরসিংদীর মনোহরদীর সীমানাঘেঁষা ইউনিয়নটি। ওই উপজেলা থেকেও মাদক আসছে। ফলে মাদকের বিস্তার বেড়েছে ঘাগটিয়ায়।’

গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমি বলেন, ‘অন্য জেলার সীমানাঘেঁষা এলাকা হওয়ায় ঘাগটিয়ায় মাদকের বিস্তার কিছুটা বাড়তে পারে। মাদকবিরোধী ও জনস্বাস্থ্যে আমাদের ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা রয়েছে। সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া মাদক নির্মূলের কোনো উপায় নেই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা