kalerkantho

বুধবার । ২৮ বৈশাখ ১৪২৮। ১১ মে ২০২১। ২৮ রমজান ১৪৪২

সাত কলেজে পরীক্ষার বাধা কাটল

নিজস্ব প্রতিবেদক    

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:৩৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সাত কলেজে পরীক্ষার বাধা কাটল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা গতকাল দিনভর এভাবেই প্রতিবাদ জানান। পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণার পর তাঁরা রাজপথ ছাড়েন। গতকাল নীলক্ষেত এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সিদ্ধান্ত বদল করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুই শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের চলমান ও ঘোষিত পরীক্ষা গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে পরীক্ষা চলাকালে হোস্টেল খোলা যাবে না এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে।

গতকাল বুধবার শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সাত কলেজের অধ্যক্ষদের এক ভার্চুয়াল সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে শিক্ষামন্ত্রী এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের চলমান ও ঘোষিত পরীক্ষাগুলো হোস্টেলে না থাকার শর্তে নেওয়া যাবে। ফলে সাত কলেজ নিয়ে আর কোনো সংশয় থাকল না, তাদের পরীক্ষা চলবে। তবে ২৪ মে সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৭ মে থেকে হল খুলবে। এর পর থেকে তারা তাদের সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল খোলার দাবিতে চলা আন্দোলনের মধ্যে গত সোমবার শিক্ষামন্ত্রী আগামী ২৪ মে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৭ মে থেকে হল খোলার ঘোষণা দেন। তবে এই সময় পর্যন্ত সব ধরনের পরীক্ষা স্থগিত করার কথা জানান তিনি। এরপর গত মঙ্গলবার এক সভায় সাত কলেজের পরীক্ষাও স্থগিত ঘোষণা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এরপর ওই দিন রাত থেকেই আন্দোলনে নামেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল নীলক্ষেতে ও সায়েন্স ল্যাবরেটরির সামনের সড়ক অবরোধ করে জোরদার আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এর পরিপ্রেক্ষিতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেয়।

সাত কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত (ফোকাল পয়েন্ট) ও ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীরা যেহেতু কিছুটা পিছিয়ে আছে, তাই পরীক্ষা গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। স্থগিত হওয়া ২৪ ফেব্রুয়ারির পরীক্ষা ৭ মার্চ এবং ২৫ ফেব্রুয়ারির পরীক্ষা ১৩ মার্চ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্য পরীক্ষাগুলো পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে।’

সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজের অধ্যক্ষদের পক্ষ থেকে বলা হয়, অন্য যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে আছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাত কলেজের পরীক্ষা চালুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়।  সভায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনা হয় এবং তাদের স্থগিত পরীক্ষার সংশোধিত রুটিন দ্রুততার সঙ্গে প্রকাশের পরামর্শ দেওয়া হয়। ২৪ মের পর বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সঙ্গে সঙ্গে স্থগিত পরীক্ষাগুলো নিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা হয়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মশিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের বৈঠকটি ছিল মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে। তবে সেখানে আমিও যুক্ত ছিলাম। যেহেতু সাত কলেজের পরীক্ষা গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবশ্যকতার ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু করোনা ছড়ানোর আশঙ্কা এখনো বিলীন হয়ে যায়নি। এ ছাড়া অতি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, বিশেষ করে যেগুলো বিসিএসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, সেগুলো আমরা ইতিমধ্যে নিয়ে নিতে পেরেছি। তাই বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরপরই আমাদের পরীক্ষা শুরু হবে।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এই উপ-উপাচার্য বলেন, ‘ক্রাশ প্রগ্রামের মাধ্যমে দ্রুততার সঙ্গে পরীক্ষা নেওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সঙ্গে সঙ্গে স্থগিত পরীক্ষাগুলো নিয়ে নেওয়া হবে। শিগগিরই সংশোধিত রুটিন প্রকাশ করা হবে। নতুন ক্রাশ প্রগ্রাম হাতে নিয়ে আমরা সেশনজট কাটিয়ে উঠতে পারব।’

তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর হাবীবুল্লাহ্ বাহার কলেজের শিক্ষার্থী তামিম হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাত কলেজের পরীক্ষা চালু করলে আমাদের পরীক্ষা নিতে সমস্যা কোথায়? সাত কলেজে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, আমাদের কম শিক্ষার্থী। তাই সাত কলেজের চেয়ে আমাদের পরীক্ষা সহজেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে নেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া আমরা এমনিতেই সেশনজটে আছি। আরো তিন মাস পরে পরীক্ষা শুরু করলে আরো সেশনজট বাড়বে। তাই আমাদের স্থগিত পরীক্ষাগুলো যথাসময়েই নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

জানা যায়, গত সোমবার সাত কলেজের কোনো পরীক্ষা ছিল না। গত মঙ্গলবার ২০১৯ সালের স্নাতক চতুর্থ বর্ষ, ২০১৯ সালের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের লিখিত পরীক্ষা এবং ২০১৭ সালের মাস্টার্স শেষ পর্বের মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এরপর আজকের অনার্স তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাত কলেজের চলমানসহ সব পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে। এই ঘোষণার পর মঙ্গলবার রাত ৮টা থেকে সোয়া ১০টা পর্যন্ত শতাধিক শিক্ষার্থী নীলক্ষেত মোড়ে অবস্থান করেন। পরে রাত সোয়া ১০টার দিকে তাঁরা চলে যান। গতকাল সকাল থেকে তাঁরা আবার অবস্থান নেন। শিক্ষার্থীদের অবরোধ নীলক্ষেত মোড় থেকে সায়েন্স ল্যাব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পুলিশ সদস্যরা শিক্ষার্থীদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার জন্য আলটিমেটাম দিলেও শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে সরছিলেন না। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। তাঁরা পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত বাতিল এবং হোস্টেল খুলে দেওয়ার দাবিতে নানা স্লোগান দেন। এ সময় আজিমপুর থেকে কলাবাগান পর্যন্ত মিরপুর সড়কের ওই অংশই শুধু নয়, আশপাশের সড়কেও যানজট ছড়িয়ে পড়ে। রমনা পার্কের সামনের সড়ক, শাহবাগ, কাঁটাবন মোড় ও বাটা সিগন্যাল পর্যন্ত সড়কেও ছিল যানজট। পুলিশ শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ হওয়ার খবর জানালে গতকাল বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে তাঁরা রাস্তা ছেড়ে দেন। পরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। এই কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী প্রায় দুই লাখ।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপ কমিয়ে শিক্ষার মান বাড়াতে এই বড় কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হলেও সমস্যা এখনো দূর হয়নি। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, কলেজগুলোতে দীর্ঘ সেশনজট তৈরি হয়েছে। যথাসময়ে পরীক্ষা না নেওয়ায় এবং ফল প্রকাশ না করায় সবচেয়ে বেশি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এই সমস্যা নিরসনের দাবিতে বিভিন্ন সময় আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। তবে করোনায় দীর্ঘদিন পরীক্ষা বন্ধ থাকার পর জানুয়ারি থেকে তা শুরু হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থীই ফের মেস ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে থেকে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।



সাতদিনের সেরা