kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ বৈশাখ ১৪২৮। ২২ এপ্রিল ২০২১। ৯ রমজান ১৪৪২

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সড়কে পাঁচ দিনে চার শিক্ষার্থীসহ নিহত ৫

আহসান হাবিব, চাঁপাইনবাবগঞ্জ   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:৪৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চাঁপাইনবাবগঞ্জের সড়কে পাঁচ দিনে চার শিক্ষার্থীসহ নিহত ৫

সড়কে বের হলেই স্বজনদের কপালে উঠে চিন্তা ও শঙ্কার ভাঁজ। প্রিয়জন বের হয়ে ফিরবে কি আর। এমন চিন্তা ও শঙ্কায় শঙ্কিত স্বজন ও প্রিয়জনরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কয়েকটি সড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল বাড়তে থাকায় আতঙ্কিত সড়কে চলাচলকারীরাসহ সবাই। পাঁচ দিনে পাঁচজন নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ট্রাকের অদক্ষ চালকদেরই দায়ী করছেন এলাকাবাসী। 

ট্রাক চালকদের বিশ্রামাগার না থাকা ও পুলিশি তৎপরতা না থাকাতে সড়কে মৃত্যু বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করছেন সড়কে প্রাণ যাওয়া পরিবারের সদস্যরাসহ অনেকেই। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ সড়কে প্রতিদিন অন্তত ৬০০ ট্রাক যাতায়াত করে। সড়কে প্রাণহানির বেশির ভাগই ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ধাক্কায়। এ সড়কে রাতে কয়েকটি ঢাকা কোচ ব্যতীত কোনো বাস চলাচল করে না। সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ট্রাকচালক হেলপারদের বিশ্রামাগার না থাকায় ট্রাক চালকরা হেলপারকে স্টেয়ারিং ছেড়ে দিয়ে চলে যান বিশ্রামে। হেলপাররা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে যাতায়াত করে অদক্ষ হাতে স্টেয়ারিং ধরে। কম বয়সী ও ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা এসব হেলপাররা বেপরোয়াভাবে সড়কে ট্রাক চালাতে গিয়ে ঘটছে সব অঘটন।

গত কয়েক মাসে কয়েকটি ঘটনায় কয়েকজনের মৃত্যু হলেও পুলিশের মরদেহ উদ্ধার ও ইউডি মামলা করা ছাড়া কোনো কিছুই করতে দেখা যায় না। গত কয়েক মাসেও সড়কে মোবাইল কোর্ট ও পুলিশের তদারকি দেখা যায়নি সড়কে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নেই কোনো আইনি পদক্ষেপ।

হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ, অবৈধভাবে লাগানো সব যানবাহনে সাইরেন ও ভিআইপি গাড়ির হর্ন এবং হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধ, সড়কে উচ্চগতিতে চলা সব যানবাহনের চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, অটোরিকশার লাইট খুলে ফেলা, সোনামসজিদ বন্দরে চালকদের বিশ্রামাগার তৈরি, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ট্রাক থেকে চাঁদা আদায় বন্ধ, রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেল ও যানবহনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, বাজার ও মোড়ে সব যানবাহনের গতিসীমা ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে রাখা ও জেলার সব সড়কের পাশে ভেঙ্গে যাওয়া অংশ ও গর্ত বন্ধ করার দাবিতে মানববন্ধন ও নানান কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানান সচেতন নাগরিকদের অনেকেই।

২০১৬ সালের ৩ মার্চ শিবগঞ্জে ট্রাকে পাচারের সময় ফেনসিডিল আটক করতে গিয়ে ছাদেকুল ইসলাম ও আতাউল ইসলাম নামে দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে পিষ্ট করে হত্যা করে ঘাতক ট্রাক ও চালক। 

পুকুরিয়া এলাকায় ভোরে ট্রাকে থাকা অবৈধ পণ্য থাকার সংবাদ পেয়ে অভিযানে গিয়ে ট্রাকের নিচে পিষ্ট হয়ে শিবগঞ্জ থানা পুলিশের এসআই সাদেকুল ইসলাম ও শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট আতাউল ইসলাম মারা যায়।
 
১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতুর ওপর ট্রাকের ধাক্কায় বারঘরিয়া পলিটেকনিক ইন্সিটিউটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মিনারুল ও মোস্তাফিজ মারা যায়। ট্রাকটিকে আটক হলেও হেলপার ও চালক পালিয়ে যায়।
 
দুই শিক্ষার্থী নিহতের পর তার সহপাঠিরা বিকেলে রাস্তা অবরোধ করে ঘাতক ট্রাক চালককে দ্রুত গ্রেপ্তার করে ফাঁসির দাবিসহ ৮ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে প্রশাসনের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

একই তারিখে রাতে হরিপুরে ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মারা যায় আরো একজন। এর এক দিন পর মহানন্দা সেতু টোল ঘরে একটি ট্রাক ঢুকে যাওয়ায় অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান টোল আদায়ের ৫/৬ জন কর্মচারী।

২২ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ সড়কে নীহাটি রশিকনগর এলাকায় সরাসরি সংঘর্ষে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী শিবগঞ্জ উপজেলার দুলর্ভপুর ইউনিয়নের কালুপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের মালিকুজ্জামান বাবুর ছেলে আবদুল হামিদ (২৪) ও রাশেদ আলীর ছেলে আবদুর রহিম (২৮) মারা যায়। নিহত হামিদ ও রহিম মামাতো ফুফাতো ভাই। তারা বারোঘরিয়া এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে কোরিয়ান ভাষা শিক্ষার্থী হিসেবে প্রশিক্ষণে যাচ্ছিল। পরে পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ট্রাক ও চালককে আটক করে এবং দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে শিবগঞ্জ থানায় নিয়ে আসে।
 
গত ১৮ নভেম্বর ভোরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ধান বোঝাই নসিমন সড়কের পাশে গর্তের পানিতে উল্টে পড়ে গেলে নসিমনের নিচে চাপা পড়ে ৮ ধানকাটা শ্রমিক মারা যায়। ৫ শ্রমিক আহত হয়। মারা যায় আবুল কাশেদ, বাবু, তাজেমুল হক (৫০) ও তার ছেলে মিঠুন (২৬), কারিম, মিজানুর রহমান মিলু, লাওঘাটা গ্রামের আতাউর রহমান ও আহাদ আলী। 

বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে ধান কেটে ১৬ জন কৃষক ভটভটিতে করে ধান নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে শিবগঞ্জ উপজেলার দাইপুকুরিয়া ইউনিয়নের সোনাপুর-বারিকবাজার এলাকার ভাঙা ব্রিজে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ভেঙে যাওয়া সড়কে ভটভটিটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পার্শ্ববর্তী গর্তে পড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই ৮ কৃষক মারা যায়।

শিবগঞ্জ উপজেলা ম্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক রবিউল ইসলাম জানান, জরুরি কাজে শিবগঞ্জ থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মোটরসাইকেলে গেলে চরম ঝুঁকি থাকায় মেইনরোড দিয়ে না গিয়ে ভয়ে বিকল্প হিসেবে ইসরাইল মোড় হয়ে মর্দানা-বারোঘরিয়া হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে যায়। 

মঙ্গলবার ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মারা যাওয়া আবদুল হামিদের চাচা ও নিহত আবদুর রহিমের মামা কক্সবাজারের এডিসি (বর্তমান পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব) শাজাহান কালুপুর গ্রামে তার বাড়ি। তিনি জানান, এমন মৃত্যু স্বজনদের সহ্য করা খুবই কঠিন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা