kalerkantho

শনিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৪ রজব ১৪৪২

দেলোয়ারের বাগানে টিউলিপের হাসি

শাহীন আকন্দ, গাজীপুর    

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৩:৩৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেলোয়ারের বাগানে টিউলিপের হাসি

শীতপ্রধান দেশের ফুল টিউলিপ এখন গাজীপুরের বাগানে শোভা পাচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজসিক সৌন্দর্যের টিউলিপ ফুলের কথা উঠলে প্রথমেই আসে নেদারল্যান্ডসের নাম। কারণ দেশটি পৃথিবীর প্রধান টিউলিপ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। মূলত শীতপ্রধান দেশের ফুল এটি। আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশে টিউলিপ ফুলের চাষ এত দিন অসম্ভবই মনে করা হতো। আর এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার কেওয়া পূর্বখণ্ড গ্রামের দেলোয়ার হোসেন। তাঁর  বাগানজুড়ে এবারও ফুটেছে নানা রঙের বাহারি টিউলিপ।

নেদারল্যান্ডস থেকে টিউলিপ ফুলের বাল্ব বা কন্দ এনে রোপণ করেছিলেন তিনি। তাঁর সেই বাগানটিই এখন হয়ে উঠেছে এক টুকরো  নেদারল্যান্ডস।

এর আগেও দেলোয়ার হোসেন গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে এক হাজার টিউলিপের কন্দ রোপণ করে সফল হয়েছিলেন। দেলোয়ার হোসেন  জানিয়েছেন, আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে রপ্তানিযোগ্য টিউলিপ চাষেও সফল হবেন তিনি।

এবার তাঁর বাগান থেকে টিউলিপ ফুল পৌঁছেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতেও। এরই মধ্যে বাগানটি পরিদর্শন করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মেসবাহুল ইসলাম ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জামানও আগে এই টিউলিপ বাগান পরিদর্শন করেন।

বাগান পরিদর্শন করে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে আমরা বই-পুস্তকে টিউলিপ ফুল দেখেছি। এখন আমাদের দেশেই টিউলিপ চাষ হচ্ছে। এখন দেশে এই টিউলিপ ফুলের বাজার তৈরি করতে হবে।’

দেলোয়ার হোসেন জানান, তাঁর বাবা আবদুর রাজ্জাক ছিলেন গ্রামের একজন সম্ভ্রান্ত কৃষক। তিনি জমিতে সবজিসহ বাদাম ও আখ চাষ করতেন। শিশু বয়সেই তাঁর বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করতেন দেলোয়ার। ওই সময় কৃষি ঘিরেই তাঁর স্বপ্ন তৈরি হয়। সিদ্ধান্ত নেন, বড় হয়ে কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার। তিনি জানান, ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ফুল। ফুলের প্রতি তাঁর  ভালোবাসা প্রগাঢ়। তাই ফুল ব্যবসাকেই তিনি বেছে নিয়েছেন।

তিনি জানান, মাধ্যমিক পাসের পর ২০০৪ সাল থেকে ফুল চাষ শুরু করেন। পুঁজি ছিল মাত্র চার হাজার টাকা। তা দিয়েই গ্লাডিওলাস ফুলের কিছু কন্দ কিনেছিলেন। চাষের পর চাহিদা দেখে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী থেকে আরো ২০ হাজার কন্দ কেনেন। তখন ওই ফুলের চাষ করে সাত লাখ টাকারও বেশি লাভ করেছিলেন। এরপর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ধীরে ধীরে বিদেশি ফুল ও সবজি চাষ শুরু করেন। ১৮ বিঘাজুড়ে ফুল ও সবজির খামার তাঁর। তাঁর বড় মেয়ে মৌমিতার নামে খামারের নাম ‘মৌমিতা ফ্লাওয়ার্স’। খামারটির তিন বিঘা মাত্র তাঁর নিজের জমি। বাকি ১৫ বিঘা লিজ নেওয়া।

দেলোয়ার হোসেন জানান, চার বছর ধরে তাঁর বাগানে ওরিয়েন্টাল লিলিয়াম ফুল চাষ করছেন। এর আগে জারবেরা চাষও করেন। সফল ফুল চাষি হিসেবে ২০১৭ সালে বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক পান তিনি।

তিনি জানান, ফুলের পাশাপাশি বিদেশি বিভিন্ন সবজি চাষ করেন। গত বছর ক্যাপসিকাম চাষ করেন। এ ছাড়া একই সময় চাষ করেন স্ট্রবেরি। এবার তিনি জি-নাইন জাতের  কলার চাষ করছেন।

টিউলিপ ফুল চাষে তাঁর আগ্রহ প্রসঙ্গে দেলোয়ার হোসেন জানান, এই ফুলের চাষ বাংলাদেশে কল্পনাও করা যেত না। এর জন্য ৫ থেকে ১১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার প্রয়োজন। তিনি  শুনেছেন, এর আগে ১৯৮৮ সালের দিকে বেলজিয়ামের তরুণ এক এনজিওকর্মী বাংলাদেশে টিউলিপ ফোটানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সফল হননি। ফুল চাষ শুরুর পর থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল বাগানে টিউলিপ ফোটানোর। ২০১৮ সালে হল্যান্ডের রিচ ওয়ান নামে একটি সিড কম্পানি টিউলিপ ফুলের এক হাজার কন্দ তাঁকে উপহার দিতে চান। এর জন্য প্রস্তুতি না থাকায় সে বছর তা নেননি। পরের বছর সেখান থেকেই এক প্রজাতির চার রঙের এক হাজার কন্দ এনে তাঁর বাগানে রোপণ করেন। রোপণের ২৫ দিন পর প্রথমে একটি টকটকে লাল ফুল ফোটে। কয়েক দিন পরই বাগানজুড়ে টিউলিপ ফোটে। এতে দারুণ উচ্ছ্বসিত আর উদ্বুদ্ধ হন তিনি। এ বছর নেদারল্যান্ডস থেকে টিউলিপের ২০ হাজার কন্দ আনেন। তা থেকে ১৪ হাজারেরও বেশি কন্দ রোপণ করেন তাঁর বাগানটিতে। বাকি কন্দ রোপণ করেন ঠাকুরগাঁও ও চুয়াডাঙ্গায় দুটি বাগানে।

তিনি জানান, গত বছরের মতোই সফল হন তিনি। গত ১-২ ফেব্রুয়ারির দিকে তাঁর বাগানে প্রথম ফুল ফোটে। এরপর পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে ফোটে বাকি ফুলও। তিনি জানান, ফোটার পর প্রায় ২০ থেকে ২২ দিন তা তরতাজা থাকে।

দেলোয়ার জানান, আগামী বছর আরো বড় পরিসরে টিউলিপ চাষ করবেন তিনি। ফুল ফোটার পর বাগানটি ফুলপ্রেমী দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।

তিনি দৃঢ়তা প্রকাশ করে জানান, আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে রপ্তানিযোগ্য টিউলিপ চাষেও সফল হবেন তিনি।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কবিতা আনজু-মান-আরা কালের কণ্ঠকে জানান, এ দেশে শীতকাল ছাড়া এর চাষ সম্ভব নয়। রোপণের আগে চার থেকে সাত ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় দুই মাস কন্দকে রেখে হিমাবেশিত করতে হয়। মাটির তাপমাত্রা ১৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের ওপরে গেলে ফুল  ফুটতে সমস্যা হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলে তীব্র শীতের সময় এর চাষ করা যেতে পারে।

ফুলবিজ্ঞানী কবিতা আনজু-মান-আরা আরো জানান, ছয় বছর আগে বিজ্ঞানী ড. আজিজুর রহমান লন্ডন থেকে টিউলিপের ৫০টি কন্দ পাঠিয়েছিলেন তাঁর কাছে। রোপণের পর প্রায় অর্ধেক গাছে ফুল ফুটেছিল তখন। এর পরই টিউলিপ নিয়ে গবেষণায় লাগেন তিনি। তিনি জানান, পরের বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেদারল্যান্ডস থেকে টিউলিপের প্রায় ১০০টি কন্দ নিয়ে এসেছিলেন। সেগুলো থেকেও ফুল ফুটেছিল।

কবিতা আনজু-মান-আরা জানান, গত বছর নীলফামারীতে ফজিলাতুন প্রধান ২০টি কন্দ লাগিয়ে ১৭টি ফুল ফোটাতে পেরেছিলেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা