kalerkantho

সোমবার । ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭। ১ মার্চ ২০২১। ১৬ রজব ১৪৪২

৭২৬ কোটি টাকার প্রকল্প: অনুমোদন পেলেই বদলে যাবে আমতলীর দৃশ্যপট

হায়াতুজ্জামান মিরাজ, আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১২:১০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



৭২৬ কোটি টাকার প্রকল্প: অনুমোদন পেলেই বদলে যাবে আমতলীর দৃশ্যপট

বরগুনার আমতলীর চাওড়া নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ, কচুরীপানা অপসারণ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, নদী ভাঙন থেকে আড়পাঙ্গাশিয়া, ঘটখালী ও পৌরশহর রক্ষার জন্য বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড ৭২৬ কোটি টাকার ডিপিপি (ডকুমেন্ট অফ প্রজেক্ট প্রোফর্মা) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রাণালয়ে জমা দিয়েছে। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত পর্যায়ে সচিবের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। সচিব অনুমতি দিলেই দ্রুতই প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা হবে। 

বরগুনা পাউবো সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সুবান্দি, রামজী, ঘুঘুমারী খাল সংস্কার ও উপজেলার আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের বালিয়াতলী বেড়িবাঁধ ও নদীভাঙন রোধ, চাওড়া ইউপির ঘটখালী বেড়িবাঁধ পুনঃনির্মাণ ও নদীভাঙন রোধ এবং আমতলী পৌর শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণসহ এ প্রকল্পের মধ্যে বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ, শহর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ, সুবান্ধী খালে ১০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ, লোচা খালে ৫ ব্যান্ডের স্লুইজ, সোনাগজা খালে ৩ ব্যান্ডের স্লুইজ, সেনেরহাট বাজারে ২ ব্যান্ডের স্লুইজ ও পূর্বচিলার নয়াভাঙ্গুলীতে ২ ব্যান্ডের স্লুইজ নির্মাণ, ছুরিকাটা মহাসড়ক, হলদিয়া বাজার সংলগ্ন, বলইবুনিয়া খালের গোড়ায়, লক্ষিরখালের গোড়ায়, চন্দ্রাপাতাকাটা ও কাউনিয়া বাঁধসহ ১০টি স্থানে কালভার্ট নির্মাণ, পশ্চিম ঘটখালী ও কৃষ্ণনগর গ্রামে ২টি আউটলেট নির্মাণ ও কচুরীপানা উত্তোলনের জন্য বরগুনা পাউবো ৭২৬ কোটি টাকার ডিপিপি (ডকুমেন্ট অফ প্রজেক্ট প্রফর্মা) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। 

উল্লেখ্য, বরগুনার আমতলী উপজেলার চাওড়া, হলদিয়া, কুকুয়া, সদর ইউনিয়ন ও পৌরসভার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ও ২০০ মিটার প্রস্থের ত্রিভুজ আকৃতির চাওড়া-সুবান্দি নদী ও তার শাখা খালগুলো কচুরীপানায় ভরপুর হয়ে গেছে। ওই নদী ও শাখা খালের পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশ দূষিত হওয়ায় চার ইউনিয়ন ও পৌরসভার লাখো মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। 

বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮২ সালে আমতলীর চাওড়া ও পায়রা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের হাত থেকে আমতলী শহরকে রক্ষায় সংযোগস্থল চৌরাস্তায় পানি উন্নয়ন বোর্ড স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে। কালের বিবর্তনে চাওড়া নদী মরা নদীতে পরিণত হয়। ত্রিভুজ আকৃতির ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ২০০ মিটার প্রস্থ এ নদীটি উপজেলার হলদিয়া, কুকুয়া, চাওড়া, সদর ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৩০টি গ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। নদীর ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সুবান্দি অংশে রামনাবাঁধ নদী, ঘুঘুমারী অংশে টিয়াখালী ও আমতলীর অংশে পায়রা (বুড়িশ্বর) নদীর সাথে সংযোগ রয়েছে। প্রাকৃতিক জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার হাত থেকে মানুষ ও সম্পদ রক্ষায় ২০০৯ সালে রামনাবাঁধ নদীর একাংশ সুবান্দি নামক স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ড স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে। এরপর চাওড়া ও সুবান্দি নদীর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য ২০১৫ সালে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ওই পয়েন্টে দু’ব্যান্ডের একটি স্লুইজগেট নির্মাণ করা হয়। স্লুইজগেট নির্মাণ করলেও ৩০ কিলোমিটার লম্বা এবং প্রায় ২০০ মিটার প্রশস্ত খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে দু’ব্যান্ডের স্লুইজগেট কোনভাবেই যথার্থ নয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ নির্মাণে লবণ পানি প্রবেশের অজুহাত তুললেও বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন নদীগুলোর লবণাক্ততা বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ের একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন (স্টাডি) বলছে, পায়রা (বুড়িশ্বর), বিষখালী এবং বলেশ্বর মোহনায় মার্চের প্রথম থেকে মে মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত লবণাক্ততা থাকলেও তালতলীর পর পায়রা নদীতে লবণাক্ততা সহনীয় মাত্রার এবং বগি বাজারের পর থেকে লবণাক্ততা খুব কম। আন্দারমানিক এবং রামনাবাদ চ্যানেলের লোন্দা পয়েন্ট পর্যন্ত মার্চের থেকে মে মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত লবণাক্ততা থাকলেও সুবান্ধি পয়েন্টে লবণাক্ততা নেই। কালেভদ্রে দেখা গেলেও তা খুবই সহনীয় মাত্রায় থাকে। 

সুপার সাইক্লোন সিডরের সময় সুবান্ধি পয়েন্টে চাওড়া নদীতে কোনো বাঁধ ছিলো না। সুবান্ধি ও জুলেখার স্লুইজগেট থেকে আমতলী পর্যন্ত চাওড়া নদীটির দু'পাড়ে ২১টি কার্লভার্ট ও ইনলেটসহ উঁচু রাস্তা রয়েছে। যে কারণে সুপার সাইক্লোন সিডরে এসব এলাকায় তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। 

অপরদিকে, ১৯৬৭ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড উপজেলার জুলেখা খালে ৫ জলকপাট ও উত্তর টিয়াখালী খালে ৫ জলকপাট এবং ঘুঘুমারিতে ১ জলকপাটের স্লুইজ নির্মাণ করে। সুবান্ধি পয়েন্টে ৩ জলকপাট থেকে পানি নিষ্কাসণের কারণে নদীর ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত পানির স্বাভাবিক প্রবাহ থাকলেও জুলেখা, উত্তর টিয়াখালী ও ঘুঘুমারি খালের জলকপাট বন্ধ করে একটি প্রভাবশালী মহল মাছ চাষ করে এবং জাল দিয়ে আটকিয়ে মাছ ধরার কারষণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়াও জুলেখার স্লুইজ খালের লক্ষী নামক স্থানে ৩টি বাঁধ, উত্তর টিয়াখালী স্লুইজ খালে বাঁধসহ ওই খালের বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে রেখেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। 

এদিকে নদী সংলগ্ন ১০টি খালে স্থানীয় প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ এবং দখল করে স্থায়ী বাড়িঘর নির্মাণ করছেন। এতে চাওড়া নদীর পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে ওই নদী ও শাখা খালগুলোর প্রায় ১৫ কিলোমিটার কচুরীপানা ভর্তি হয়ে জনদুভোর্গ চরম আকার ধারণ করেছে। এতে নদীর দু’পাড়ের মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। কচুরীপানার কারণে পানি নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষিত হয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে ওই নদী ও খালের পানি ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এ নদীর দু’পাড়ের প্রায় লক্ষাধিক মানুষের জনদুর্ভোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এ কারণে ৪ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার লাখো মানুষ অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে খাল মুক্ত করে নদীতে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিতকরণের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। 

হলদিয়া গ্রামের মো. রফিকুল ইসলামসহ একাধিক এলাকাবাসী বলেন, মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে জরুরি ভিত্তিতে খালের মধ্যে থাকা কচুরীপানা অপসারণ করা দরকার। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় প্রভাবশালীরা খালে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এ বন্ধ খালগুলোর বাঁধ কেঁটে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি জানাই।

চাওড়া চন্দ্রা গ্রামের কৃষক মো. শানু মিয়া বলেন, চাওড়া নদী ও শাখা খালগুলোতে কচুরীপানা জমে পানি নষ্ট হয়ে গেছে। এ পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দুর্গন্ধে পরিবেশ দুষিত হচ্ছে। অতিদ্রুত কচুরীপানা অপসারণের দাবি জানাই।

চাওড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আখতারুজ্জামান বাদল খান মুঠোফোনে বলেন, চাওড়া ইউনিয়নবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি সুবান্ধি খাল সংস্কার, ঘটখালী বেড়িবাঁধ পুনঃনির্মাণ ও নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়ার। দ্রুত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে চাওড়াবাসীর দুর্ভোগ লাঘব হবে। 

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মতিয়ার রহমান বলেন, চাওড়া খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহের বাঁধাসমূহ দূর করার জন্য ও পায়রা নদীর ভাঙনের হাত থেকে পৌরশহর রক্ষায় পাউবো থেকে যে প্রকল্প দেয়া হয়েছে তা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিনি আরও বলেন, চাওড়া নদীর শাখা-প্রশাখায় খালে যে বাঁধগুলো রয়েছে সেগুলো কেটে স্লুইজ ও কালভার্ট নির্মাণ করে নৌপথে চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে আমতলীর দৃশ্যপট।

আমতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আসাদুজ্জামান মুঠোফোনে বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সকল প্রকার সহযোগিতা প্রদান করা হবে। 

বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কায়সার আলম মুঠোফোনে বলেন, চাওড়া নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ, কচুরীপানা অপসারণ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, নদীভাঙন থেকে আড়পাঙ্গাশিয়া, ঘটখালী ও পৌরশহর রক্ষার জন্য বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড ৭২৬ কোটি টাকা ডিপিপি (ডকুমেন্ট অফ প্রজেক্ট প্রফর্মা) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদ¦য়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে চাওড়া নদী সংশ্লিষ্ট মানুষসহ উপজেলার তিন লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা