kalerkantho

রবিবার । ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৫ রজব ১৪৪২

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের ১৩ কমিটি

‘মোবাইল চুরি করা’ নাঈম আহ্বায়ক

নতুন কমিটিতে অছাত্র বিবাহিত ও অভিযুক্তরা

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৩:২৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘মোবাইল চুরি করা’ নাঈম আহ্বায়ক

প্রায় পাঁচ বছর আগে সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে ‘মোবাইল ফোন চুরির’ ঘটনায় গণপিটুনির শিকার হয়েছিলেন কাজী নাঈম নামের এক ছাত্রলীগকর্মী। এ ছাড়া মাস দুয়েক আগে কলেজে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিসংবলিত ছাত্রলীগের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলতে দেখা গেছে নাঈমকে। কলেজের সিসিটিভি ফুটেজে সেই দৃশ্য ধরা পড়ে।

দীর্ঘ তিন যুগ পর নগরে সরকারি এই কলেজে হঠাৎ ঘোষিত নতুন কমিটির আহ্বায়কের পদ পেয়েছেন অভিযুক্ত সেই কাজী নাঈম। একই কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়কের পদে আসা মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজি ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ। আবার কমিটিতে সদস্য পদ পাওয়া সাইফুল ইসলাম এক বছর আগে বিয়ে করেছেন। নগরের চকবাজার ওয়ার্ড ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সভাপতি হয়েছেন সাদ্দাম হোসেন ইভান। প্রায় দুই বছর আগে বিয়ে করা ইভানের বিরুদ্ধে নগরের বিভিন্ন থানায় কয়েকটি মামলা রয়েছে।

শুধু এই কয়েকজনই নন, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের আওতাধীন সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ এবং ছয়টি থানা ও ছয়টি ওয়ার্ডে ঘোষিত নতুন কমিটিতে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত, অছাত্র, বিবাহিত এবং চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি পেয়েছেন। গত বুধবার রাতে ও পরদিন বৃহস্পতিবার এসব কমিটি গঠন করা হয়েছে।

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমদ ইমু ও সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর স্বাক্ষরিত এসব কমিটি অনুমোদন দেওয়ার পরই রাতে ক্ষোভ-বিক্ষোভে ফেটে পড়েন ছাত্রলীগের ত্যাগী-পদবঞ্চিতরা। আবার কমিটিতে পদ পেলেও ‘অবমূল্যায়ন’ করায় ক্ষুব্ধ অনেকে।

এদিকে কমিটি দিয়েই নগর কমিটির শীর্ষ দুই নেতা ইমু ও দস্তগীর গত বুধবার ঢাকায় চলে গেছেন। ঘোষিত কমিটিগুলোতে অভিযুক্তদের পদপ্রাপ্তির ব্যাপারে জানতে গত বৃহস্পতিবার কয়েকবার ওই দুই নেতার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তা বন্ধ পাওয়া গেছে।

গতকাল শুক্রবার পুনরায় মোবাইলে ফোন করলে ইমুর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। তবে দস্তগীরের মোবাইল ফোন এদিনও বন্ধ পাওয়া গেছে।

ইমু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই ও বিচার-বিশ্লেষণ করেই কমিটি দেওয়া হয়েছে। তার পরও যাদের নামে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিষয়গুলো যাচাই করে দেখা হবে।’ প্রতিবাদ-ক্ষোভ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর কমিটি দেওয়া হয়েছে। সে জন্য সংগঠনের গঠনতন্ত্রের বিধিবদ্ধতার কারণে অনেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আর তা থেকেই এমন ক্ষোভ-বিক্ষোভ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগর ছাত্রলীগের একাধিক নেতা জানান, ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর মহানগর ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি দেওয়া হয়। আর কেন্দ্র থেকে তা অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৪ সালের জুন মাসে। এরপর সাত বছরেও আর কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। গত বুধবার সন্ধ্যার পর হঠাৎ করেই ১৩ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। খোদ নগর ছাত্রলীগের বেশির ভাগ নেতাই এসব নতুন কমিটির বিরুদ্ধে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং এমইএস কলেজের এক প্রভাবশালী নেতার (ছাত্রত্ব নেই অনেক বছর) অনুসারীরাই এসব কমিটিতে বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি পেয়েছেন। নতুন কমিটি দেওয়ার আগে নগর ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির কোনো বৈঠকও করেননি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। শোনা যাচ্ছে, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অছাত্র, বিবাহিত ও অপরাধীদের এসব কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহসভাপতি এম কায়সারউদ্দিন গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন ১২ কমিটির নেতা-সদস্যদের তিন ভাগের এক ভাগেরও ছাত্রত্ব নেই। অথচ সংগঠনের গঠনতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী ২৯ বছর পর্যন্ত যাঁদের বয়স রয়েছে শুধু তাঁরাই কমিটিতে স্থান পাবেন। নিয়মিত ছাত্রত্ব থাকতে হবে। কিন্তু কমিটি গঠনে গঠনতন্ত্র মানা হয়নি। অছাত্র এবং বিবাহিতরাও কমিটিতে ঢুকে গেছেন।’

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের আরেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন কুতুবী বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ (মহানগর ছাত্রলীগ) কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনার জন্য আমরা দুই বছর ধরে আন্দোলন করছি। কিন্তু নগরের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো বিতর্কিত ও অছাত্র-বিবাহিতদের দিয়ে গত বুধবার ছাত্রলীগের যেসব কমিটি দেওয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে কলুষিত করার শামিল। এটি সংগঠনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।’

মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগের বিষয়ে সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের ৪১ সদস্যের নতুন কমিটির আহ্বায়ক কাজী নাঈম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তেমন ঘটনা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজের ছাত্রলীগের গ্রুপিংয়ের রোষানলের শিকার হয়েছি আমি। যে তারিখের কথা বলা হচ্ছে, সেদিন আমাকে মারধর করে চেয়ারে বসিয়ে রেখেছিল ওরা (প্রতিপক্ষের কর্মীরা)। এটা মোবাইল চুরির ঘটনা ছিল না। তারা এখন মোবাইল চুরির ঘটনা সাজাচ্ছে।’

ছাত্রত্ব না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে নাঈম বলেন, ‘আমি ২০০৭ সালে এসএসসি পাস করেছি। ২০১০-১১ সেশনে কলেজে অনার্স কোর্সে ভর্তি হলেও সেশনজটের কারণে পাস করতে আট বছর লেগেছে। এখন মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।’

এদিকে নিকাহনামার তথ্য অনুযায়ী, ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ইভানের বিয়ের তারিখ ছিল ২০১৯ সালের ৩০ ফেব্রুয়ারি। সংগঠনের বিভিন্ন নেতা জানান, চকবাজার থানা ছাত্রলীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বিবাহিত। হালিশহর থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক আবদুর রহিম জিসানও বিবাহিত। তাঁর ছাত্রত্বও নেই। বায়েজিদ থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক সুলতান মাহমুদ ফয়সালের বয়স ২৯ বছরের বেশি, ছাত্রত্বও নেই। এভাবে নতুন কমিটিগুলোর বিভিন্ন পদে থাকা অনেকেই বিবাহিত ও অছাত্র। আছেন বিতর্কিতরাও। 

মহসিন কলেজ ছাত্রলীগের নতুন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মায়মুন উদ্দিন মামুন বলেন, ‘তিন যুগ পর ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর শিবির অধ্যুষিত চট্টগ্রাম নগরের বড় দুই সরকারি কলেজে (হাজী মুহাম্মদ মহসিন ও চট্টগ্রাম কলেজ) তাদের বিতাড়িত করে আমরা (ছাত্রলীগ) ক্যাম্পাসে ঢুকি। আমাদের কলেজে যে কমিটি দেওয়া হয়েছে এর মধ্যে আহ্বায়ককে মোবাইল চুরির ঘটনায় গণপিটুনি দিয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আমরা কাঙ্ক্ষিত পদ পাইনি। ছয় যুগ্ম আহ্বায়কের মধ্যে আমরা চারজন নতুন কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছি।’

চকবাজার ওয়ার্ড ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ইভান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে তিনটি মামলা ছিল, তা গ্রুপিং নিয়ে মারামারিসংক্রান্ত। আমাদের এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তিন বছর আগেই মামলাগুলো থেকে আমি খালাস পেয়েছি।’ গত বছরের ২৭ নভেম্বর বাকলিয়া থানার পুলিশ কেন গ্রেপ্তার করেছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে ইভান বলেন, ‘পুলিশ আমাকে কখনো গ্রেপ্তার করেনি। আমার নামে নাম এমন অভিযুক্ত খুলশী এলাকায় আছে। আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’  

প্রসঙ্গত, মহানগর ছাত্রলীগ গত বুধবার সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ; বাকলিয়া, হালিশহর, চকবাজার, পাহাড়তলী, বায়েজিদ থানা এবং পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, চকবাজার, দক্ষিণ কাট্টলী, সরাইপাড়া ও রামপুর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের নতুন কমিটির (কোনোটি পূর্ণাঙ্গ আবার কোনোটি আংশিক) অনুমোদন দেয়। এরপর বৃহস্পতিবার অনুমোদন দেওয়া হয় পাঁচলাইশ থানা কমিটি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা