kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭। ২ মার্চ ২০২১। ১৭ রজব ১৪৪২

সবাইকে বোকা বানিয়ে ভুয়া নিয়োগ পরীক্ষা

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০২:৩৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সবাইকে বোকা বানিয়ে ভুয়া নিয়োগ পরীক্ষা

‘সেইফ্ হেলথ প্রকল্প’। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) অনুমোদন ও স্বীকৃতি রয়েছে দাবি করে কক্সবাজারের একটি পত্রিকায় ‘জরুরি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি’ প্রকাশ করে মাস দেড়েক আগে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কক্সবাজারের সব উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মেডিক্যাল অফিসার ও স্বাস্থ্যকর্মী পদে (হোমিও, ইউনানি) নিয়োগ দেবে প্রতিষ্ঠানটি। গতকাল শুক্রবার তারা পেকুয়ায় একটি কেন্দ্রে ৭২৯ জন চাকরিপ্রার্থীর পরীক্ষা নিয়েছে। এই পরীক্ষা হয়েছে পুলিশ পাহারায় এবং একটি সরকারি বিদ্যালয়ে; কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, প্রতিষ্ঠানটিই ভুয়া। সরকারের কোনো সংস্থা এই নামের কোনো প্রতিষ্ঠানকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মাঠে কাজ করার অনুমোদন দেয়নি।

করোনাকে পুঁজি করে মেডিক্যাল অফিসার ও স্বাস্থ্যকর্মী পদে নিয়োগ দেওয়ার নামে কয়েক হাজার প্রার্থীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই ‘সেইফ্ হেলথ প্রকল্প’র বিরুদ্ধে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৯ নভেম্বর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশিত হয়। আবেদনের শেষ তারিখ ছিল ৩১ ডিসেম্বর। চাকরি পেতে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা থেকে অন্তত দুই হাজার প্রার্থী ‘মহাপরিচালক, সেইফ্ হেলথ প্রকল্প, মহাখালী, ঢাকা’ বরাবর আবেদন করেন। প্রতিটি আবেদনের সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের মহাখালী শাখার নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টের (এইচএএমএ ট্রেনিং ফাউন্ডেশন, হিসাব নং- ০১২০৬০২০০০৭০৬) অনুকূলে ৩৫০ টাকার ব্যাংক ড্রাফট সংযুক্ত করতে হয়েছে। পরে তাঁদের নামে ইস্যু করা হয়েছে নিয়োগ পরীক্ষার প্রবেশপত্র। সেই প্রবেশপত্র নিয়ে গতকাল সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন ৭২৯ জন চাকরিপ্রার্থী (নারী-পুরুষ)। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কয়েকজন জানান, পরীক্ষা চলাকালে যাতে কোনো ধরনের সমস্যার সৃষ্টি না হয়, সে জন্য কেন্দ্রের বাইরে মাঠে পুলিশ পাহারায় ছিল।

চকরিয়ার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের মাহফুজুর রহমান সুমন নামের একজন দাবি করেন, সেইফ্ হেলথ প্রকল্পে স্বাস্থ্যকর্মী পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে বেশ কয়েকজন বেকার যুবকের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা করে হাতিয়েছেন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত কক্সবাজার জেলা ব্যবস্থাপক (ডিএম) কথিত ডাক্তার দেলোয়ার হোসেন রুবেল। একইভাবে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার অসংখ্য বেকার নারী-পুরুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার তথ্য মিলেছে অনুসন্ধানে।

পুলিশের পাহারা থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া থানার ওসি শাকের মোহাম্মদ যুবায়ের বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তর থেকে থানা পুলিশকে অবগত করার পর পুলিশের একটি টিম পরীক্ষাস্থলে গিয়ে কিছুক্ষণ সময় দেয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া বা সঠিক কি না, তার বিস্তারিত তথ্য পুলিশের কাছে নেই। ওসি বলেন, যদি কোনো চাকরিপ্রার্থী প্রতারণার শিকার হন এবং এ নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন, তাহলে তদন্ত করে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ‘সেইফ্ হেলথ প্রকল্প’ নামের কোনো প্রকল্প পরিচালনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন রয়েছে কি না, জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনাকে পুঁজি করে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বেকার যুবক-যুবতিদের কাছ থেকে মূলত মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এই অপতৎপরতা চালাচ্ছে নামসর্বস্ব শতভাগ ভুয়া প্রতিষ্ঠানটি।

উপজেলা স্বাস্থ্যপ্রধান বলেন, প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যাঁরা নিজেকে ডাক্তার হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তাঁদের কোনো স্বীকৃতিও নেই। অতএব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা সরকারের কোনো সংস্থা এই প্রতিষ্ঠানকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মাঠে কাজ করার কোনো অনুমোদন দেয়নি। এটি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্রের ভুয়া প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান থেকে সবাইকে সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তানভীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষা হওয়ার কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। তবে ইউএনও স্যার ছুটিতে রয়েছেন। তিনি স্টেশনে থাকাকালীন কোনো চিঠি তাঁকে দেওয়া হয়েছিল কি না, সেই ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছি।’

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, এ ধরনের কোনো এনজিও, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব তাঁর জানা নেই এবং পরীক্ষা বিষয়েও তিনি অবগত নন। এর পরও তিনি এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হয় সেইফ্ হেলথ প্রকল্পের কক্সবাজার জেলা ব্যবস্থাপক ‘ডা.’ দেলোয়ার হোসেন রুবেলের সঙ্গে। এ সময় তিনি দাবি করেন, ‘ঢাকায় আমাদের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হচ্ছেন ডা. মনিরুল আলম। সেই প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় আমরা কক্সবাজার জেলায় করোনাভাইরাস প্রতিরোধে প্রতি উপজেলায় প্রতিজনকে ২২ হাজার ৫০০ টাকায় তিনজন করে মেডিক্যাল অফিসার এবং প্রতিজনকে ১২ হাজার ৫০০ টাকায় প্রতি ইউনিয়নে ৯ জন করে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেব। তারই আলোকে চকরিয়ায় আজ (গতকাল) এমসিকিউ পদ্ধতিতে লিখিত পরীক্ষা হয়েছে।’ চকরিয়া থানা সেন্টার এলাকায়ও প্রতিষ্ঠানের নামে একটি অফিস ভাড়া নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন দেলোয়ার। তবে সেখানে গিয়ে কথিত অফিসটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায় এবং কোনো অফিসের সাইনবোর্ডও ছিল না।

এদিকে ০১৭১০০৫৮০৬৯ নম্বর থেকে ফোন করে এইচএএমএ ট্রেনিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও ডাক্তার পরিচয় দিয়ে এই প্রতিবেদককে ফোন করেন মো. মনিরুল আলম। তিনি নিজেকে সমুদ্রবাংলা পত্রিকার সম্পাদক এবং দৈনিক রূপবাণী পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও পরিচয় দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই প্রতিষ্ঠানে (সেইফ্ হেলথ প্রকল্প) বেকার যুবক-যুবতিদের চাকরি দেওয়ার পাশাপাশি তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে তারা একেকজন উদ্যোক্তা তথা পল্লী চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে।’

মনিরুল আলম আরো বলেন, ‘আমাদের এই প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন, জয়েন্ট স্টক কম্পানি থেকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স নম্বর ১৩০৯৪।’

প্রসঙ্গত, গত বছরের নভেম্বরে গাইবান্ধা জেলায় একই প্রতিষ্ঠানে (সেইফ্ হেলথ প্রকল্প) নিয়োগের নামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সেখানকার পুলিশ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক তথা চেয়ারম্যান মনিরুল আলমকে হেফাজতে নেয়। এ নিয়ে সময় টেলিভিশনে একটি প্রতিবেদনও প্রচারিত হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা