kalerkantho

রবিবার। ৫ বৈশাখ ১৪২৮। ১৮ এপ্রিল ২০২১। ৫ রমজান ১৪৪২

চট্টগ্রামে আ. লীগ ও সংগঠনগুলোর কমিটি

সহিংসতার দায়ে কপাল পুড়তে পারে অনেকের

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৩:৪৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সহিংসতার দায়ে কপাল পুড়তে পারে অনেকের

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে এ আশঙ্কায় ক্ষমতাসীন দলের মেয়াদোত্তীর্ণ মহানগর আওয়ামী, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম বিভিন্ন সংগঠনের নতুন কমিটি করা হয়নি। প্রায় ১৫ মাস ধরে আটকে আছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর চট্টগ্রামে এসব কমিটি গঠন কার্যক্রম। এরই মধ্যে চসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার সব মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করার পালা। কিন্তু সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের জয়জয়কার হলেও সহিংসতার কারণে নেতাদের অনেকের কপাল পুড়তে পারে। নিজেদের কর্মীদের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা বেশি হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতাদের পাশাপাশি নতুন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদপ্রত্যাশী অনেকে বাদ পড়তে পারেন।

সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে এসব জানা যায়। চট্টগ্রামে এখন জোরেশোরে চলছে সংগঠনগুলোর মহানগর কমিটি গঠন নিয়ে আলোচনা।

চসিক নির্বাচনে ভোটগ্রহণের দিন এবং এর আগে দুই দফা প্রচারণার সময় চারজনের প্রাণহানি ও শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। একাধিক নেতা জানান, নিজেদের মধ্যে এসব সহিংসতার কারণে আসন্ন নতুন কমিটিগুলোতে বর্তমান কমিটির বেশ কিছু নেতার ঠাঁই না-ও হতে পারে। একইভাবে সহিংসতার কারণে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে কয়েকজন বাদ যাবেন।

আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, অতীতে পাঁচটি চসিক নির্বাচনে এত সহিংসতা কেউ দেখেনি। ওই পাঁচটি নির্বাচনে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে নেতাকর্মীদের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এবার সংগঠনগুলোর বেশির ভাগ নেতাই তাঁদের বেপরোয়া কর্মী-সমর্থকদের থামাতে পারেননি। কর্মীদের সহিংসতার ঘটনায় নেতারা দায় এড়াতে পারেন না। ওই ঘটনাগুলোর জন্য নেতারা একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন।

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি কবে হবে তা কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা প্রস্তুত আছি। সম্মেলনের মাধ্যমে নাকি কেন্দ্র থেকে নতুন কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে। এটা কেন্দ্রের ওপরই নির্ভর করছে।’ প্রশ্নের জবাবে নাছির বলেন, ‘মহানগর আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থেকে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সর্বোচ্চ কাজ করেছে। পাশাপাশি দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিজয়ী করতে আমরা কাজ করেছি। এর সুফল আমরা পেয়েছি। নির্বাচনে সংগঠন ও সংগঠনের বাইরে কারা সহিংসতা করেছে তাদের বিষয়ে আমরা কেন্দ্রকে সার্বক্ষণিক অবহিত করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও খোঁজ-খবর রেখেছেন। আশা করি নতুন কমিটি হলে তাতে যোগ্য, ত্যাগী ও সক্রিয়রা মূল্যায়িত হবেন।’

একই কমিটির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক চন্দন ধর বলেন, ২০১৯ সালের ২০ ডিসেম্বর দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের আগে আমরা তৃণমূলের (ইউনিট-ওয়ার্ড) সম্মেলনের উদ্যোগ নিলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে হঠাৎ করে কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল। সিটি নির্বাচন শেষ হয়েছে, কেন্দ্র চাইলে নতুন কমিটি হতে পারে। এবার সংগঠনগুলোতে পদপ্রত্যাশীর সংখ্যা বেশি।

মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, শুধু যুবলীগ নয়, নগরে সংগঠনের প্রতিটি কমিটি সম্মেলনের জন্য আটকে আছে। এখন কমিটিতে নেই, তারাও পদপ্রত্যাশী। চসিক নির্বাচনে ভালো কাজের মূল্যায়ন নতুন কমিটিতে হতে পারে। কে কাজ করেছেন আর কে করেননি তার প্রকৃত চিত্র কেন্দ্রের কাছে আছে।

মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নেতারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে সম্মেলনের মাধ্যমে আমাদের নগর কমিটিতে নতুন নেতৃত্ব আসবে। কেন্দ্র থেকে যখনই সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করে দেবে, সেভাবে আমরা কাজ করতে পারব।’

গত ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কাউন্সিলর পদে (সাধারণ ৩৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩২টি ও ১৪টি সংরক্ষিতের মধ্যে ১৩টিতে) ৪৫টি ওয়ার্ডে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। বিদ্রোহী প্রার্থীদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করার জোর দাবি ওঠে। কিন্তু নির্বাচনে দল মনোনীত মেয়র প্রার্থী ও সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের জয়ের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে আশঙ্কায় বিদ্রোহীদের বহিষ্কার করা হয়নি। কিন্তু দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে স্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বারবার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, বিদ্রোহীদের বহিষ্কার করা হবে। তাঁদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইন্ধনদাতা নেতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। বিদ্রোহী ও ইন্ধনদাতারা ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনে প্রার্থিতা পাবেন না এবং কমিটিগুলোতে স্থান হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন নেতারা।

চসিক নির্বাচনে দল মনোনীত মেয়রসহ দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা প্রায় ওয়ার্ডে বিজয়ী হয়েছেন। এর বাইরে দলের আটজন বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করেন।

একাধিক নেতা জানান, চসিক নির্বাচনের ফলাফলসহ সার্বিক বিষয়াদি আগামীর নতুন কমিটিগুলোর নেতা নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখবে। এসব মাথায় রেখে নেতাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে তৎপরতা শুরু করেছেন। বিশেষ করে সংগঠনগুলোর সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে অথবা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ শুরু করেছেন তাঁরা।

২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী সভাপতি ও আ জ ম নাছির উদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭১ সদস্যবিশিষ্ট মহানগর আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছিল কেন্দ্র থেকে। তিন বছরমেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে চার বছর আগে। এর মধ্যে তিন বছর আগে সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রথম সহসভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী। এ ছাড়া কমিটির কয়েকজন নেতা মৃত্যুবরণ করেছেন।

এদিকে ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর ইমরান আহমেদ ইমু সভাপতি ও নুরুল আজিম রনিকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর ২০১৪ সালের ১১ জুন ২৯১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে প্রায় দুই বছর আগে রনি স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিলে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন জাকারিয়া দস্তগীর। মহানগর ছাত্রলীগের এ কমিটি সাড়ে পাঁচ বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়।

২০১৩ সালের ১৩ জুলাই নগর যুবলীগের কমিটি ভেঙে দিয়ে কেন্দ্র থেকে মহিউদ্দিন বাচ্চুকে আহ্বায়ক করে মহানগর যুবলীগের ১০১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটির মেয়াদ ছিল ৯০ দিন। প্রায় সাত বছর চার মাস ধরে নগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। এ ছাড়া দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ১৭ বছর ধরে মহানগর শ্রমিক লীগসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন মেয়াদোত্তীর্ণ।

দলীয় নেতারা জানান, ২০১৯ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলন হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে চট্টগ্রাম নগরে সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ এসব কমিটির সম্মেলন কিংবা কেন্দ্র থেকে নতুন কমিটি দেওয়ার কথা শোনা গেলেও চসিক নির্বাচনের কারণে হয়নি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা