kalerkantho

সোমবার । ৬ বৈশাখ ১৪২৮। ১৯ এপ্রিল ২০২১। ৬ রমজান ১৪৪২

১০ টনের বেইলি সেতুতে ৩০ টনের যানবাহন

মাসুদ রানা, ভাঙ্গুড়া (পাবনা)    

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১০:০৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১০ টনের বেইলি সেতুতে ৩০ টনের যানবাহন

পাবনার ভাঙ্গুড়া পৌর শহরের বড়াল বেইলি সেতুর ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন চলাচল করছে  অতিরিক্ত ওজনের শত শত ভারী  যানবাহন। বড়াল নদীর দুই পাড়ের ভাঙ্গুড়া ও শরৎনগর বাজারের সংযোগ এই সেতুতে ১০ টন ওজনের যানবাহন চলাচলের অনুমতি থাকলেও চলাচল করছে ৩০ থেকে ৪০ টন ওজনের যানবাহন।

দুর্ভোগ নিরসনে ১৪ বছর আগে বেইলি সেতুর পাশে একটি কংক্রিটের সেতু নির্মাণ হলেও তা কোনো কাজে আসেনি। এজন্য সচেতন মহল সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বড়াল নদীর পূর্ব পাশে চারটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার চারটি ওয়ার্ড মিলিয়ে প্রায় ৮০ হাজার লোকের বসবাস। অপরদিকে পশ্চিম পাশে দুইটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডের ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। এ কারণে অর্ধ শত বছর পূর্বে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বড়াল নদীর পশ্চিম পাড়ে ভাঙ্গুড়া বাজার ও পূর্বপাড়ে শরৎনগর বাজার গড়ে উঠে। দুই বাজারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫০০ এর অধিক।

ভাঙ্গুড়া বাজারে রয়েছে বাস স্ট্যান্ড, সরকারি হাসপাতাল, সরকারি হাই স্কুল, মহিলা ডিগ্রী কলেজ, সরকারি খাদ্য গুদাম ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। শরৎনগর বাজারে রয়েছে সাপ্তাহিক পশুহাট, ধান ও পাট সহ কৃষি ফসল সংরক্ষণাগার, সরকারি কলেজ সহ দুইটি ফাজিল মাদ্রাসা, বড়ালব্রিজ রেল স্টেশন এবং উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা কার্যালয়। তাই দুই পাড়ের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকারের আমলে বড়াল নদীর ওপর ১২ ফুট প্রশস্ত ও ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্য একটি বেইলি সেতু নির্মাণ করা হয়।

এর আগে মানুষ চলাচলের জন্য ওই নদীর ওপর বাঁশের মাচা ব্যবহার করা হতো। এরপর দিনে দিনে বাণিজ্যিক প্রসার ঘটায় বেইলি সেতুর ওপর ভারি যানবাহনের ব্যাপক চাপ পড়ে। এতে ২০০৬ সালে পাবনা জেলা পরিষদ বেইলি সেতুর পাশে আরেকটি কংক্রিটের সেতু নির্মাণ করে। তবে এই সেতু ১০ ফিট প্রস্থ এবং প্রবেশ সড়ক দখলদারদের কবলে পড়ে সংকীর্ণ হওয়ায় কোনো কাজে আসেনি।

এ অবস্থায় ভারী যানবাহন চলাচলে বেইলি সেতু ভেঙে দুর্ভোগ বেড়ে যায়। এতে ২০১২ সালের দিকে বেইলি সেতুর পিলারের ওপর দিয়ে কংক্রিটে নির্মাণের উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রকৌশল অফিস। কিন্তু সেতুর পিলারের ভিত দুর্বল হওয়ায় সে উদ্যোগ ভেস্তে যায়। এরপর ২০১৫ সালে জরাজীর্ণ বেইলি সেতুটি সংস্কার করা হয়। ওই সময় সেতুর প্রশস্ততা কমিয়ে ১২ ফুট থেকে ১০ ফুট করা হয়। এতে যানবাহন চলাচলে ভোগান্তি আরো বেড়়ে যায়। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে বেইলি সেতুর অর্ধ কিলোমিটার উত্তরে এই  নদীর ওপর সোয়া চার কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি কংক্রিটের প্রশস্ত সেতু নির্মাণ শুরু করে উপজেলা প্রকৌশল অফিস। কিন্তু সেতু নির্মাণ কাজের ঠিকাদার সেতুর দুই পাশের গার্ডার নির্মাণ করার পরই কাজ ফেলে রেখে চলে যায়। ফলে আজো বড়াল বেইলি সেতুর ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়েই ভারী যানবাহন চলাচল করছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বেইলি সেতুর দুই পাশে সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেতু দিয়ে পণ্যসহ ১০ টনের বেশি ওজনের যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিদিন শত শত ভারী যানবাহন চলাচল করছে সেতু দিয়ে। এমনকি সেতুতে ওঠার মুখে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধে খুঁটি পোতা হলেও তা ভেঙে ফেলা হয়েছে। পণ্যসহ অধিকাংশ যানবাহনের ওজন ৩০ থেকে ৪০ টন। এসব যানবাহন সেতুতে উঠলে অন্য যানবহন চলাচল করতে পারে না। এ কারণে সেতুর ওপর যানজট নিত্যদিনের ঘটনা।

এছাড়া এসব যানবাহনের কারণে সেতুর ওপর প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এরইমধ্যে সেতুর রেলিংয়ের সঙ্গে ট্রাকের চাপায় ২০১০ ও ২০১৭ সালে দুই ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে। গুরুতর আহত হয়েছে প্রায় অর্ধশত পথচারী। এরপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার পথচারী পারাপার হয় এই সেতু দিয়ে।

ঈশ্বরদীর জোয়ারদার ট্রেডার্সের ট্রাকচালক রাহাত হোসেন বলেন, 'এই বেইলি সেতু দিয়ে প্রায়ই ৩০ থেকে ৩৫ টন ওজনের পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে পারাপার হই। ভয় লাগে যে সেতু ভেঙে পড়ে না যাই। এরপরও মালামাল আনলোডের ঝামেলা বিবেচনা করে ঝুঁকি নিয়েই সেতু পারাপার হই। জনস্বার্থে এই নদীতে প্রশস্ত কংক্রিটের সেতু নির্মাণ করা দরকার।'

শরৎনগর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব ফজলার রহমান বলেন, 'বিকল্প কোনো প্রশস্ত সেতু না থাকায় বেইলি সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে মালামাল পরিবহন করতে হয়। আবার সেতুর ওপর ট্রাক থেকে মালামাল নামিয়ে পার করতে গেলে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। এতে পণ্যের দামও বেড়ে যাবে। তাই উপায়ন্তর না দেখে ব্যবসায়ীদের কথা ভেবে ঝুঁকি নিয়েই ভারী পণ্যবাহী যানবাহন পারাপার হয়।' 

ভাঙ্গুড়া উপজেলা প্রকৌশলী আফরোজা পারভীন বলেন, 'সংকীর্ণ বেইলি সেতুর কারণে জেলা পরিষদ পাশে একটি কংক্রিটের সেতু নির্মাণ করেছে। তবে সেটিও কাজে আসছে না। এরপর প্রকৌশল অফিসের মাধ্যমে নদীতে আরো একটি সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তবে ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে যাওয়ার কারণে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে কাজ শুরু করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই সেতু নির্মিত হলে ভারী যানবাহন বেইলি সেতু দিয়ে চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। তাহলে পথচারী কিংবা যানবাহন চালকদের ঝুঁকি থাকবে না।' 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা