kalerkantho

রবিবার। ২৮ চৈত্র ১৪২৭। ১১ এপ্রিল ২০২১। ২৭ শাবান ১৪৪২

প্রিয় নীড়ে নতুন জীবন

তৃতীয় লিঙ্গের অবহেলিতরা স্বাবলম্বী হতে চান

এস এম আজাদ, সিরাজগঞ্জ থেকে ফিরে   

৩১ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:৫২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রিয় নীড়ে নতুন জীবন

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের মাধ্যমে মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল ইউনিয়নে ধোপাকাণ্ডি এলাকায় ২০টি নতুন ঘর দেওয়া হয় তৃতীয় লিঙ্গের ৫০ জনকে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঘরের সামনেই ছোট্ট নদী সরস্বতী। শুষ্ক মৌসুমে সেই নদী শুকিয়ে ‘কংকাল’। পানি হয়েছে কালো, আছে কিছুটা তামাটে দুর্গন্ধও। নদীর পারেই বসানো হয়েছে মাটির চুলা। পাশেই মাচায় ঝুলছে থোকা থোকা শিম। টিনের চালে ছড়িয়ে আছে লাউয়ের ডগা। ঘরের পাশের ছোট খালি জায়গায় বেগুন, মরিচ, টমেটো—হরেক সবজির গাছ। নদীর দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন মায়া (৩১)। এখন কেমন আছেন জানতে চাইলে বলেন, ‘এখনকার এই নদীর মতোই ছিল আমাদের জীবনটা। ঠাঁই হয়নি পরিবারে। হিজড়া বলে কেউ বাসা ভাড়াও দিত না। অনেক কষ্টে থাকতাম। বর্ষা এলেই এই নদী যেমন রূপ পাবে, এখন তেমনই আমাদের জীবন। প্রধানমন্ত্রী আমাদের ঘর দিছেন, গরু দিছেন, ট্রেনিং দিছেন। আমি এসব গাছ লাগাইছি। অন্যরাও বিভিন্ন কাজ করছে। আমরা এখন স্বাবলম্বী হয়ে সবার মতোই বাঁচতে চাই।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের মাধ্যমে মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় হাটিকুমরুল ইউনিয়নে ধোপাকাণ্ডি এলাকায় ২০টি নতুন ঘর দেওয়া হয়েছে তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ৫০ জনকে। ‘প্রিয় নীড়’ নামের আশ্রয়ণ এলাকায় গতকাল শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঘর পেয়ে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন মায়ার মতো অনেকেই। কাজ করছেন, মিলেমিশে থাকছেন। ৬৬ শতাংশ জমির ওপর চারটি ব্যারাকে সাত মাস ধরে বাস করছেন তৃতীয় লিঙ্গের এই মানুষগুলো। ঘর দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের দেওয়া হয়েছে সেলাই, গবাদি পশু পালন এবং বিউটি পার্লারের প্রশিক্ষণ। স্থাপন করে দেওয়া হয়েছে গরুর খামার। তাঁরা ছাগল, হাঁস, মুরগি, কবুতরও পালন করছেন। করছেন সবজির বাগান। ৫০ জনের মধ্যে তিনজন তাঁদের নেতৃত্ব দেন, যাঁদের একজনের নাম মায়া। তিনি জানান, গরুর খামার থেকে তাঁরা এখন ৪০ থেকে ৪৫ লিটার দুধ পান। নিজস্ব থাকার জায়গা পেয়ে তাঁরা এখন সরকারের কাছে স্বাবলম্বী হওয়ার আরো সুযোগ চাইছেন। একটি ঘরে দু-তিনজন করে থাকেন তাঁরা। আরো ঘর দেওয়ারও দাবি সবারই। আশ্রয়ণ প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সিরাজগঞ্জ ছাড়াও দিনাজপুরের সদর উপজেলায় হিজড়াপল্লীতে ১২৫টি পরিবারের পুনর্বাসন করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী হিজড়াদের জন্য আরো ঘর বানানো হবে।

গত ২৩ জানুয়ারি মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে দেশের ভূমি ও গৃহহীনদের জমি ও ঘর দেওয়ার কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই দিন ৬৬ হাজার ১৮৯টি ঘর দেওয়া হয়। সব পরিবারকে ২ শতাংশ খাসজমির মালিকানা দিয়ে সেখানে আধাপাকা ঘর করে দেওয়া হয়েছে। একই দিনে ২১ জেলার ৩৬টি উপজেলায় ৭৪৩টি ব্যারাকে তিন হাজার ৭১৫টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।  প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘এ দেশের কোনো শ্রেণির মানুষ কিন্তু বাদ যাচ্ছে না। বেদে শ্রেণিকে আমরা ঘর করে দিচ্ছি, তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। হিজড়াদের আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি, তাদেরও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দলিত শ্রেণি বা হরিজন শ্রেণি, তাদের ভালো মানের ফ্ল্যাট করে দিচ্ছি, চা শ্রমিকদের জন্য করেছি।’

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জে ঘরহীন হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষ পেয়েছে নিজেদের ঠিকানা। ব্যারাকে ঠাঁই হওয়া প্রত্যেকটি মানুষ তাদের জীবনের করুণ অতীতের বর্ণনা দিয়েছে। সেই জীবন থেকে মুক্তির পর এখন তাদের চোখে নতুন জীবনের স্বপ্ন। কথা বলতে গেলেই সেই কৃতজ্ঞতার প্রকাশ সবার কণ্ঠে, ‘প্রধানমন্ত্রী মাথা গোজার ঠাঁই করে দিয়েছেন। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে অনেক ধন্যবাদ।’

সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। দিনাজপুর থেকে এসে সিরাজগঞ্জে হিজড়া দলে যোগ দেওয়া পলি (৪০) বলেন, ‘৭০০ টাকা ভাড়ায় একটি রুম নিয়েছিলাম। দুই দিন পরই হিজড়া জেনে বের করে দিছে। এমনই হইছে মাসে আমরা তিন-চারবার বাসা পাল্টাইছি। হিজড়াদের যারা বাসা ভাড়া দেয় তাদেরও লোকজন অপমান করে। এখন আমরা সেই অপমান থেকে মুক্তি পাইলাম।’ 

নিজের ঘরে বসে সেলাই মেশিনে কাজ করছিলেন বাহামনি (৩৫)। জীবনের গল্প শুরু করেন এভাবে—১০ বছর বয়সে বগুড়ার নন্দীগ্রামের বাড়ি থেকে চলে আসি এখানে। সিরাজগঞ্জে এসে এদের সঙ্গে থাকতে শুরু করি। নিজের আগ্রহেই বড় বোনের কাছে শিখেছি সেলাই কাজ। এখন ব্যারাকের অন্যদের কাপড়ও সেলাই করে দেই।’ বলেন, ‘নতুন ঘর পেয়েছি, এখন কাজ করে নতুন করে জীবন গড়তে চাই। মানুষের কাছে আর হাত পাততে চাই না।’

সরেজমিনে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘুরে দেখা গেছে, সরকারের নির্ধারিত ঘরগুলোর নকশায় রান্নাঘর, সংযুক্ত টয়লেট থাকছে। টিউবওয়েল ও বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া হয়েছে। হিজড়া সম্প্রদায়ের সবাই নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছেন। কেউ গরুর খামারে কাজ করছেন। কেউ রান্না করছেন। কেউ কাজ করছেন সবজির বাগানে। অনেকে বসে গল্প করছেন ঘরের বারান্দায়।

আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. মাহবুব হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশের সব মানুষ যাদের ঘর নাই, থাকার জায়গা নাই, তাদের ঘর করে দেবেন। এটি একটি সাহসী উদ্যোগ। এর আওতায় তৃতীয় লিঙ্গও আছে। সেখানে আরো কেউ আসতে চাইলে আমরা উদ্যোগ নেব। প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়তে পারে ঘরের সংখ্যাও।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহম্মদ বলেন,  সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে নভেম্বরে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি হিজড়াদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়াও হিজড়াদের কল্যাণে নানা পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। স্কুলগামী তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে চার স্তরে (প্রাথমিকে জনপ্রতি মাসিক ৭০০, মাধ্যমিকে ৮০০, উচ্চ মাধ্যমিকে এক হাজার ও উচ্চতর শ্রেণিতে এক হাজার ২০০ টাকা হারে) উপবৃত্তি দিচ্ছে সরকার। তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনের যাঁদের বয়স ৫০ বা এর বেশি, এমন অক্ষম ও অসচ্ছল ব্যক্তিদের মাসিক ৬০০ টাকা করে বিশেষ ভাতা দেওয়া হচ্ছে।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মুজিব শতবর্ষ পালন করছে সরকার। বছরটিকে স্মরণীয় করে রাখতে জাতির পিতার উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ভূমি ও গৃহহীন আট লাখ ৮২ হাজার ৩৩টি পরিবারকে ঘর ও জমি দেওয়ার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা