kalerkantho

সোমবার । ৬ বৈশাখ ১৪২৮। ১৯ এপ্রিল ২০২১। ৬ রমজান ১৪৪২

সবুজের বাঁকে বাঁকে এক্সকাভেটরের কোপ

যেন পাহাড় কাটার ‘উৎসব’

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি    

৩১ জানুয়ারি, ২০২১ ০২:৫১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সবুজের বাঁকে বাঁকে এক্সকাভেটরের কোপ

এক পাশে সবুজের উঁচু-নিচু বিছানা, অন্য পাশে কাপ্তাই হ্রদের আকাশনীল জলরাশি। চোখে ধরা দেয় অনন্য এক ছবি, যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা চিত্রকর্ম। অপরূপা রাঙামাটির আসামবস্তি-কাপ্তাইয়ের ১৮ কিলোমিটার দূরত্বের পুরো সড়কটি ছয় মাস আগেও ছিল এমন মুগ্ধতায় ভরা। শহরের মানুষ ভালোবেসে ওই সড়কের নামও দিয়েছিল ‘মুগ্ধতার সড়ক’। ফলে পার্বত্য এই শহরে বেড়াতে আসা পর্যটকদের অনিবার্য গন্তব্য হয়ে ওঠে এই রাঙামাটি-কাপ্তাই নতুন সড়ক। সড়কটি ঘিরে এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে বেড়াইন্যা, বড়গাঙ, রাইন্যাটুগুন, ইজরসহ বেশ কয়েকটি রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র।

তবে শেষ ছয় মাসে সড়কটি হারিয়েছে নান্দনিকতা। ১২ ফুট চওড়া সড়কটিকে অপ্রয়োজনে ১৮ ফুট করতে গিয়ে কেড়ে নেওয়া হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সড়কের পাশে ড্রেন, বাথরুম, বসার স্থান নির্মাণের জন্য প্রায় ৩২ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)। আর তাতেই খসে পড়তে থাকে সড়কের চেনা রূপ। সড়ক সম্প্রসারণের নামে রাস্তার দুই পাশ থেকে দেদার কাটা হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় পাহাড়। পুরো সড়কে এমন অন্তত ১০০ পাহাড়ে পড়েছে ‘এক্সকাভেটরের কোপ’।

এমন বেপরোয়া পাহাড় কাটা দেখে যে কারোর চোখ জলে ভিজবে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো সড়কের পাশে সম্ভবত একটি ছোট পাহাড়ও বাদ যায়নি, যেখানে এক্সকাভেটর, শাবল কিংবা কোদালের আঘাত পড়েনি। যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাঙামাটি ট্রেডার্সের পরিচালক নিজাম মিশু বলছেন, ‘সড়কের ব্যাপ্তি বাড়ানোর প্রয়োজনেই ছোট-বড় কিছু পাহাড়ে হাত দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ৪০ থেকে ৪৫টি পাহাড়ের কিছু অংশ কাটতে হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই সরকারি খাস পাহাড় আবার কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীনও আছে। যেগুলো ব্যক্তিমালিকানার, তাদের আর্থিক প্রণোদনা দিয়েই পাহাড় কেটেছি আমরা। কেউ কেউ আবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পাহাড় কাটিয়েছে নিজেরা বসতঘর বানাবে বলে।’ মিশু দাবি করেন, ‘অপ্রয়োজনে আমরা একটি পাহাড়ও কাটিনি। ওই সড়কে অনেকেই নিজের প্রয়োজনে পাহাড় কেটেছে, সেগুলো সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না।’

তবে সরেজমিনে গিয়ে মিশুর কথার সত্যতা পাওয়া যায়নি। বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু বনভন্তের জন্মভূমির স্মৃতি বিহার এই সড়কের মোড়ঘোনায়, সেখানেই বড় তিনটি পাহাড় কাটা হয়েছে। এর সঙ্গে সড়ক উন্নয়নের কোনো সম্পর্কই নেই। পাহাড়গুলোর মালিকদের একজন সোনারাম চাকমা। তিনি বলেন, ‘আমার পাহাড় কেটে ৩০ থেকে ৩৫ ট্রাক মাটি নিয়ে গেছে, আমাকে এক টাকাও দেয়নি। আপত্তি করলে আমাকে জানানো হয়, পাহাড়টি সড়কের জায়গার ওপর পড়েছে, তাই আমি আর কিছু বলার সাহস পাইনি।’ একইভাবে প্রতিবেশী মঙ্গল চাকমা, আরাধন চাকমা, সজীব চাকমার পাহাড়ের পুরো দুই-তৃতীয়াংশই কেটে সাফ করা হয়েছে। তাঁরাও কোনো টাকা-পয়সা পাননি বলে দাবি করেছেন। 

এ প্রসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিজাম মিশু বলেন, ‘আমরা যাদের পাহাড় কেটেছি তাদের মধ্যে যারা যোগাযোগ করেছে, তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছি। তারা কেউ হয়তো যোগাযোগ করেনি আর কেউ কেউ নিজেদের বসতভিটা বানানোর জন্য মাটি কাটার অনুমতি দিয়েছে।’ এসব মাটি সড়কের কাজে এবং নিজেদের অন্য প্রকল্পের কাজে ব্যবহার করার কথাও স্বীকার করেছেন মিশু।

শুধু সড়ক নির্মাণ কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই নয়, রাঙামাটি শহরের বিতর্কিত শিল্প গবেষণা পরিষদের ভবন নির্মাণের জন্য কাপ্তাই হ্রদের অংশ ভরাট করার কাজেও এই সড়কের পাশের পাহাড় কাটার মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। ওই সড়কের মুন্নীর চায়ের দোকানের পরে পাশের একটি বিশাল পাহাড় কাটতে দেখে এই প্রতিবেদক কথা বলেন মাটি কাটার কাজে নিয়োজিত ড্রেজারচালক জাফরের সঙ্গে। তিনি বলেন, পাহাড়টি এক পুলিশ সদস্যের। এসব মাটি শহরের ফিশারি এলাকার শিল্প গবেষণা পরিষদের ভবন নির্মাণের জন্য ভরাট করার স্থানে নেওয়া হচ্ছে। ট্রাকচালক আরমান জানান, ২৪০ ঘণ্টায় এক লাখ টাকার চুক্তিতে মাটি পরিবহনের কাজটি পেয়েছেন তিনি। প্রতিদিন ট্রাক্টরে কাটা মাটি বয়ে নিয়ে শিল্প গবেষণা পরিষদের ভবনের স্থানে ফেলছেন।

মগবান এলাকায়ই দেখা মিলল স্থানীয় প্রীতি চাকমার সঙ্গে। তিনি জানান, সড়ক সম্প্রসারণের জন্য যেভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে, সেটি আদতে দরকার ছিল না। একজন বয়স্ক মানুষের তিনটি আমলকীগাছ ছিল, সেগুলো বিক্রি করে তিনি চলতেন। পাহাড় কাটার কারণে তাঁর তিনটি গাছই পড়ে গেছে, দরিদ্র অসহায় লোকটি এখন কান্নাকাটি করছেন, কিভাবে চলবেন!

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মগবান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পুষ্পরঞ্জন চাকমা বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে সড়কটি সম্প্রসারণের নামে পাশের অনেক পাহাড় কাটা হচ্ছে। যেহেতু সরকারি কাজ, তাই আমরাও কিছু বলতে পারি না। কাটার দরকার নেই এমন অনেক পাহাড়ও কাটা হচ্ছে; কিন্তু কেন কাটা হচ্ছে, সেটি আমরা জানি না।’

এ প্রসঙ্গে রাঙামাটি এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আবু তালেব চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ঠিকাদারকে সড়ক সম্প্রসারণের কাজ দিয়েছি, পাহাড় কাটার জন্য নয়। পাহাড় কাটার দায় তার। যেহেতু আমাদের আগে থেকেই করা সড়কটি ২৪ ফুট চওড়া এবং তার ১২ ফুট পিচঢালাই, আমরা এবার ১২ ফুটের সঙ্গে আরো দুই পাশে তিন ফুট করে ছয় ফুট পিচঢালাই সড়কে অন্তর্ভুক্ত করছি। সঙ্গে ড্রেন হলেও সেটি ২৪ ফুটের বাইরে যাওয়ার কথা নয়। ফলে পাহাড় কাটার প্রয়োজনীয়তা ছিল না, তবে পাহাড়ধসের কারণে কিছু মাটি সড়কের ওপরে চলে আসায়, সেসব কেটে সমান করতে হয়েছে। এলজিইডি পাহাড় কাটার কোনো দায় নেবে না।’

এ প্রসঙ্গে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানি না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টির ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা