kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭। ২ মার্চ ২০২১। ১৭ রজব ১৪৪২

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে

আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিদ্যালয়ের দেয়াল নির্মাণ!

হাফিজুর রহমান চয়ন, হাওরাঞ্চল প্রতিনিধি   

২৯ জানুয়ারি, ২০২১ ২০:১৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিদ্যালয়ের দেয়াল নির্মাণ!

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে আবু ফয়েজ কেনু নামে এক মুক্তিযোদ্ধার মালিকানাধীন জায়গা জোরপূর্বক দখল করাসহ বিদ্যালয়ের দাতার পক্ষে দেওয়া উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিদ্যালয়ের দেয়াল নির্মাণের কাজ চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি উপজেলার গাগলাজুর ইউনিয়নের মান্দারবাড়ি-চাঁনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি জুবায়ের রহমান জুয়েলসহ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্যালয় সংলগ্ন চাঁনপুর গ্রামের বাসিন্দা ওই মুক্তিযোদ্ধা বাদী হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবরে এ লিখিত অভিযোগটি দায়ের করেন।

এ ছাড়া ওই বিদ্যালয়ের জায়গা নিয়ে দাতা সদস্যদের সাথে উচ্চ আদালতে চলমান মামলার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই দেয়াল নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য সারোয়ার জাহান চৌধুরী মোবাইল ফোনে অভিযোগ করেন।

তিনি আরো বলেন, এ ব্যাপারে তাঁর ছোট ভাই সাখাওয়াত হোসেন চৌধুরী বাদী হয়ে গত ৯ নভেম্বর মোহনগঞ্জ থানায় একটি জিডিও করেন। আর থানায় দায়েরকৃত ৩৮৯ নম্বর জিডি মূলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পায় এবং তারা বিদ্যালয়ের সভাপতিকে দেয়াল নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার জন্য একাধিকবার নিষেধ করার পরও ওই বিদ্যালয়ের সভাপতি জুবায়ের রহমান জুয়েল ও তাঁর স্ত্রী একই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শিরিন আক্তার তারা উপস্থিত থেকে দেয়াল নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জানা গেছে, উপজেলার চাঁনপুর গ্রামের বাসিন্দা মরহুম উসমান গণি চৌধুরী দাতা হিসেবে ১৯৭২ সালে তাঁর মালিকানাধীন চাঁনপুর মৌজায় সাবেক ১০৫ দাগে ১ একর ৩ শতাংশ ভূমির মধ্যে ২৫ শতাংশ ও একই মৌজার সাবেক ১০২ দাগে আরো ৭৫ শতাংশ ভূমিসহ মোট এক একর ভূমি দানপত্র দলিল করে দিয়ে  তিনি মান্দারবাড়ি-চাঁনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই তাঁর দানকৃত সাবেক ১০৫ দাগের ২৫ শতাংশ ভূমির মধ্যেই সরকারি ভবন নির্মাণ করে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলে আসলেও বিদ্যালয়ের নামে দাতার দানকৃত বাকি ৭৫ শতাংশ ভূমি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দখলে না থাকায় এ নিয়ে মরহুম উসমান গণি চৌধুরীর নাতি বিদ্যালয়ের বর্তমান দাতা সদস্য সারোয়ার জাহান চৌধুরীর সাথে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচ্চ আদালতে একটি মামলা চলমান রয়েছে এবং ওই মামলায় উচ্চ আদালত দাতা সদস্যের পক্ষে ৬ মাসের জন্য একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

আইন অনুযায়ী ওই মামলাটি  নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উক্ত স্থানে নতুন করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবেনা মর্মে আদেশ থাকা সত্ত্বেও ওই বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জুবায়ের রহমান জুয়েল ও তার স্ত্রী ভারপ্রাপ্ত প্রধাান শিক্ষক শিরিন আক্তার উচ্চ আদালতে চলমান মামলার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের কাছে গোপন রাখেন এবং তারা কর্তৃপক্ষকে দিয়ে ওই বিদ্যালয়ের জন্য উপজেলা এলজিইডি’র অধীনে ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি নান্দনিক বাউন্ডারি দেওয়াল নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করান। আর দরপত্র অনুযায়ী ওই কাজের দায়িত্ব পান মোহনগঞ্জ পৌর শহরের টেঙ্গাপাড়া এলাকার রিপন মিয়া নামে এক ঠিকাদার। তবে ঠিকাদার রিপন মিয়া এ কাজের দায়িত্ব পেলেও ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজের সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে নেন বিদ্যালয়ের সভাপতি নিজেই। আর প্রভাবশালী ওই সভাপতি নিজে এ কাজের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই তিনি নিজে উপস্থিত থেকে তাঁর নিজস্ব লোকজন দিয়ে বিদ্যালয়ের পাশে একই মৌজাধীন ২০৯ দাগে থাকা মুক্তিযোদ্ধা আবু ফয়েজ কেনুর মালিকানাধীন ২৩ শতাংশ ভূমির মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশ ভূমি দখলে নেওয়ার জন্য কাজ শুরু করেন। তাকে বার বার বাধা নিষেধ করেও  তিনি কাজটি বন্ধ করছেন না বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়াও বিদ্যালয়ের সভাপতি জুবায়ের রহমান জুয়েল ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে বিদ্যালয়ের দাতার দানকৃত ১০৫ দাগে ২৫ শতাংশ ভূমির মধ্যে দেয়াল নির্মাণ না করে তিনি ওই দাগে থাকা দাতার ১ একর ৩ শতাংশ ভূমি জোরপূর্বক দখলে নিয়ে সেখানে দেওয়াল নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন বলেও বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য সারোয়ার জাহান চৌধুরীর ছোট ভাই সাখাওয়াত হোসেন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান।

বিদ্যালয়ের দেয়াল নির্মাণ কাজের ঠিকাদার রিপন মিয়া বলেন, এই বিদ্যালয়ের জায়গা নিয়ে এতো বেশী ঝামেলা রয়েছে তা জানলে এ কাজটিতে আমি যেতাম না।

এ বিষয়ে জানতে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিক শিরিন আক্তারের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোনটি ধরেননি।

বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার স্বামী জুবায়ের রহমান জুয়েল বলেন, এসব কাজ আমি করছি না। এ কাজ মান্দারবাড়ি গ্রামের লোকজনেই করাচ্ছেন।

মোহনগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আব্দুল আহাদ খান বলেন, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিদ্যালয়ের দেয়াল নির্মাণের কাজ করা কখোনো সম্ভব না। তাই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ রাখার জন্য নিষেধ করে আসছে এবং পূনরায় সেখানে কেউ কাজ করার চেষ্টা করলে তাকেই গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিপালী সরকার বলেন, বিদ্যালয়ের জায়গা নিয়ে আদালতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে দাতাদের চলমান মামলায় আদালত থেকে বিদ্যালয়ের পক্ষে দুটি রায় পাওয়া গেছে। এমনকি চলমান মামলাটি পূনরায় উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আমরা কোনো কাগজ-পত্রও পাইনি। তবে বিদ্যালয়ের দেওয়াল নির্মাণে মুক্তিযোদ্ধার জায়গা দখল করার বিষয়টি আমার জানা নেই, তা খোঁজ নিয়ে দেখব।

উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী মো. আলমগীর হোসেন বলেন, আমি এ উপজেলায় নতুন যোগদান করেছি। ওই বিদ্যালয়ের জায়গা নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা রয়েছে বা মুক্তিযোদ্ধার জায়গা দখল করে সেখানে দেওয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে সেটি আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি আমি গুরুত্ব সহকারে দেখব।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আমি অভিযোগ পাওয়ার পরপরই উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে বিষয়টির সমাধানের জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদেরকে নির্দেশ দিয়েছি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা