kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭। ২ মার্চ ২০২১। ১৭ রজব ১৪৪২

চসিক নির্বাচন : শঙ্কা নিয়েই ভোটাররা কেন্দ্রে যাবেন আজ

এস এম রানা, চট্টগ্রাম    

২৭ জানুয়ারি, ২০২১ ০১:৩৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চসিক নির্বাচন : শঙ্কা নিয়েই ভোটাররা কেন্দ্রে যাবেন আজ

নির্বাচনী প্রচারণার সময় ধারাবাহিক অস্ত্রবাজি, প্রার্থীর বাসা লক্ষ্য করে গুলি ছোড়াসহ গুলি-ছুরিকাঘাতে তিন হত্যাকাণ্ড সংঘটনের পর আজ বুধবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করার জন্য নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাসহ সব ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করলেও ভোটার ও প্রার্থী কেউই নিঃশঙ্ক হতে পারছেন না। উভয় পক্ষই সম্ভাব্য কেন্দ্র দখলসহ সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। 

উপরন্তু নির্বাচনপূর্ব লাগাতার সংঘর্ষ ও রক্তপাতের পরও চট্টগ্রাম মহানগরীর দুই হাজার ৪৭৭টি বৈধ অস্ত্র থানায় জমা নেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন না করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের জারি করা নির্দেশনাও কারো মনের শঙ্কা দূর করেনি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে ৭৩৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪১৭টিকেই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। 

নির্বাচনের প্রচারণার শুরুতেই ৮ জানুয়ারি থেকে ধারাবাহিক সংঘাত হয়েছে নগরীতে। এর মধ্যে তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। সর্বশেষ রবিবার রাতে ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মো. সালাউদ্দিনের বাসা লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। বাসাটির সামনে থেকে মধ্যরাতে কোতোয়ালি থানা পুলিশ সাত রাউন্ড গুলির খোসা উদ্ধার করে। এসব খোসা শটগান ও পিস্তলের বলে নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ নেজাম উদ্দিন। 

অন্যদিকে রবিবার পাঁচলাইশ থানা এলাকায় মিছিলের সময় ছুরিকাঘাত করা হয় যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপপ্রচার সম্পাদক আদিত্য নন্দীকে। এ ঘটনায় পাঁচলাইশ থানা পুলিশ ওই রাতেই ষোলোশহর এলাকা থেকে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগের সভাপতি আবুল বশরকে গ্রেপ্তার করে।  

এসব সংঘাত-সহিংসতার মধ্যে হতে যাওয়া এ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা। তিনি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। অবশ্য তাঁর সহকর্মী নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার ঢাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সংঘাতের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতো চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সাহেল মোহাম্মদ তানভীরও আশা প্রকাশ করে বলেছেন, উত্সবমুখর পরিবেশে আজ বুধবার সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন।

বৈধ অস্ত্রের বিষয়ে নির্দেশনা বিষয়ে মহানগর পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ মো. আবদুর রউফ বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ২৫ জানুয়ারি ভোর ৬টা থেকে ২৯ জানুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত লাইসেন্সধারীরা আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন বা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চলাচল করতে পারবেন না। যাঁরা এই আদেশ লঙ্ঘন করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।’ 

তবে এর পরও ভোটারদের মন থেকে আশঙ্কা দূর হচ্ছে না। ভোটার তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণার সময় সংঘাতের যে ধারা ছিল, তা আজ বুধবার ভোটের দিনও বহাল থাকবে বলে আশঙ্কা করছি। এমন আশঙ্কা নিয়ে  ভোটকেন্দ্রে যাওয়া হবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ।’ তিনি আরো বলেন, ‘সকালে কেন্দ্রে যাব না। দুপুরের পর খোঁজখবর নিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত নেব ভোট দিতে কেন্দ্রে যাব কি না।’ 

বৈধ অস্ত্র থানায় জমা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন আরেক ভোটার আবদুল আজীজ। তিনি বলেন, বৈধ অস্ত্রধারী ব্যক্তিকে অস্ত্র প্রদর্শন না করতে বলা হয়েছে। কেউ যদি লুকিয়ে এনে ভোটকেন্দ্রে বা আশপাশে গুলি চালায়, তাহলে সেটি শনাক্ত করবে কে? ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর অস্ত্রটি বৈধ ছিল নাকি অবৈধ ছিল, তা তদন্ত করতে পুলিশের ঘাম ঝরবে। মাঝখানে প্রাণহানির শঙ্কা তৈরি করা হলো। 

২৮ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুর অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল কাদেরের অনুসারীরা এলাকায় অস্ত্রবাজি করছে। ভোটের দিন কেন্দ্র দখলে নিতে তারা মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। দক্ষিণ পাহাড়তলীর স্বতন্ত্র কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মোহাম্মদ নরুল ইসলামও প্রায় অভিন্ন অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘এই ওয়ার্ডের আওয়ামী প্রার্থী মো. ইসমাইল সন্ত্রাসীদের নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন। তাঁর হুমকির কারণে আমি কয়েক দিন প্রচারণা চালাতে পারিনি। এখন বহিরাগত এনে জড়ো করেছেন কেন্দ্র দখলে নিতে।’

জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ ৪১৭টি কেন্দ্রের প্রতিটিতে ছয়জন পুলিশ সদস্য এবং ১২ জন আনসার সদস্য থাকছেন। আর ৩১৮টি ‘সাধারণ’ কেন্দ্রের প্রতিটিতে থাকছেন চারজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে ১২ জন আনসার সদস্য। এর বাইরে প্রতিটি ওয়ার্ডে মোবাইল টিম, থানাকেন্দ্রিক মোবাইল টিম থাকছে। পাশাপাশি কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এবং সোয়াট টিম থাকবে নির্বাচনী নিরাপত্তার দায়িত্বে। নির্বাচনের আগে-পরে চার দিন নিরাপত্তা বাহিনী মাঠে থাকবে। 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের দিন মহানগরীতে প্রায় ৯ হাজার পুলিশ ফোর্স, র্যাব-বিজিবির প্রায় এক হাজার ফোর্স মাঠে থাকছে। র‍্যাব-৭-এর সহকারী পরিচালক নুরুল আবছার জানিয়ছেন, মহানগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের নিরাপত্তায় র‍্যাব মোতায়েন থাকবে। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর চট্টগ্রাম জেলার কমান্ডার বিকাশ চন্দ্র দাসের তথ্য অনুযায়ী, অঙ্গীভূত আট হাজার ৮২০ জন আনসার সদস্য নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন। 

নিরাপত্তার বিষয়ে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ওমর ফারুক জানিয়েছেন, বিজিবির ২৫টি টিম এরই মধ্যে দায়িত্ব পালন শুরু করেছে। তাদের নিয়ে মাঠে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় থাকবেন ৬৯ জন ম্যাজিস্ট্রেট। বিজিবির প্রতিটি টিমে ১৬ জন ফোর্স থাকবে। তাদের নেতৃত্বে থাকবেন একজন করে ম্যাজিস্ট্রেট। আবার নৌ পুলিশও নির্বাচনী মাঠে থাকছে। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা