kalerkantho

রবিবার। ২২ ফাল্গুন ১৪২৭। ৭ মার্চ ২০২১। ২২ রজব ১৪৪২

শাহজানের এলাচ চাষের স্বপ্ন ভাঙল আম্ফান

জামাল হোসেন, বেনাপোল   

২৬ জানুয়ারি, ২০২১ ১৭:১২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শাহজানের এলাচ চাষের স্বপ্ন ভাঙল আম্ফান

আম্পানের ঝড়ে এলাচ চাষের স্বপ্ন ভেঙে গেছে এলাচ চাষি মো. শাহজাহানের। যে পরিমাণ ফল ধরেছিল গাছে তাতে কমপক্ষে কয়েক লাখ টাকার এলাচ বিক্রি হতো। কিন্তু অম্ফানের ঝড়ে গাছ মাটির সাথে মিশে গেছে। দিশেহারা হয়ে এখন আবার নতুন করে চারা তৈরি করছে বাংলাদেশের প্রথম এলাচ চাষি যশোরের বেনাপোলের মো. শাহজাহান আলী।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সঠিক দিক নির্দেশনা না পাওয়ায় একাধিকবার এলাচ চাষে ক্ষতির শিকার হয়েও শাহজাহান হাল ছাড়েননি। তিনি জানান, কৃষি বিভাগ ও মসলা ইনস্টিটিউশনের কর্মকর্তারা একাধিকবার আমার ক্ষেত পরিদর্শন করেছেন। তবে তাদের কাছ থেকে এলাচ চাষের যুতসই কোনো পরামর্শ পাইনি। বাণিজ্যিকভাবে এলাচ চাষে আগ্রহীরা আমার কাছ থেকে চারা নিয়ে পার্বতী অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় চাষাবাদ করছে। ঝড়ে গাছ নষ্ট হওয়ার পর এখন বীজতলা তৈরি করছে। যেখানে প্রায় ২৫ হাজার চারা হবে।

একটা চারা কমপক্ষে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল দেয়। এলাচ খুব লাভজনক চাষ। প্রতি একর জমিতে ১২০০ চারা রোপণ করা যায়। যা থেকে এককালীন প্রায় ১৫ লাখ টাকার এলাচ বিক্রি করা সম্ভব। যা অন্য কোনো চাষে এত লাভ আসবে না। বর্তমান বাজারে পাইকারি এলাচ গ্রেড হিসেবে বিক্রি হয়ে থাকে। গ্রেড ভেদে দুই হাজার থেকে সর্বোচ্চ আট হাজার টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হয়।

২০১২ সালে বেনাপোল পৌর সভার সামনে পাঠবাড়ি এলাকায় এক বিঘা জমিতে দুই জাতের এলাচ চাষ শুরু করেন সৌখিন কৃষক শাহজাহান আলী। ইন্টারনেটে এলাচ চাষ দেখে এর প্রতি আগ্রহ জন্মায় তার। বহু কষ্টে বিদেশ থেকে এলাচ গাছের মূল সংগ্রহ করে আনেন ৭০টি। 

সেগুলো বেলে দোআঁশ জমিতে রোপণ করেন। এখানে মাটির সমস্যার কারণে ২০১৬ সালে এক একর জমি লিজ নিয়ে বেনাপোলের নারায়নপুর গ্রামে নতুন করে সবুজ এলাচ চাষ শুরু করেন। সেখানে ৬০০টি এলাচের ঝাড় ছিল। প্রতিটি ঝাড়ে ১০০ থেকে ১১০টি গাছ হয়েছিল। পর্যাপ্ত ফলন আসার সময় হানা দেয় অম্ফান ঝড়। তাতেই সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় শাহজাহানের।

আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেউ এগিয়ে আসেনি তার সহযোগিতায়। তারপরও দমেননি তিনি। নতুন করে মাটি সংগ্রহ করে এখন চারা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চারা নেওয়ার জন্য বুকিং দিচ্ছেন অনেকে।

চাষি শাহজাহান আলী বলেন, প্রথমে অন্য ফসলের মাঠে এলাচ চাষ করেছিলাম। কিন্তু তাতে ফলন ভালো হয়নি। পরে একটি মেহগনী বাগান (গাছের ছায়াযুক্ত স্থান) লিজ নিয়ে এলাচ চাষ করেছিলাম। এতে পূর্বের চেয়ে ফলন ভালো হয়েছিল। কিন্থু আম্পান ঝড়ে সব গাছই নষ্ট হয়ে গেছে। যে ২/৪টি গাছ আছে তাতে ফল ধরছে না। তারপরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ২০১৬ সালে যে গাছ রোপণ করা হয়েছিল সেটাতে ২০১৯ সালে কিছু ফল এসেছিল। যেটা বিক্রির পর্যায়ে ছিল না। প্রথম ফল সে কারণে কিছু আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরীক্ষার জন্য দেওয়া ও রাখা হয়।

তিনি আরো বলেন, যে কেউ বাড়ির আঙিনা অথবা ফলদ বৃক্ষের বাগানে এ জাতের সবুজ সুঘ্রান এলাচ চাষ করতে পারবে। সরকার যদি বাণিজ্যিকভাবে এলাচ চাষে আগ্রহীদের আর্থিক সহযোগিতা করে তাহলে খুব অল্প সময়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

এলাচ চাষ শুরু পর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের একদল বৈজ্ঞানিক আসেন এ এলাচ চাষের ফলন দেখতে। পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য তারা বাগান থেকে নমুনাও সংগ্রহ করে নিয়ে যান। তারপর থেকে তারা আর কোনো খোঁজ খবর নেয়নি।

বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কলিম উদ্দীন বলেন, এলাচ চাষ নিয়ে মসলা গবেষণা ইন্সটিটিউট দীর্ঘ দিন ধরে গবেষণা করে আসছে। বেনাপোলের এলাচ গাছ একটি ভিন্ন ধরনের জাত, এই এলাচের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে। বাংলাদেশের আবহাওয়াতেও এলাচ চাষ সম্ভব তার প্রমাণ এই বেনাপোল। শাহজাহান যে এলাচের চাষ করছে সেটির সুঘ্রাণ রয়েছে ভালো।

শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৌতম কুমার শীল জানান, শাহজাহান দেশের প্রথম এলাচ চাষি। অম্ফান ঝড়ের আগে পরে শাহজানের এলাচ বাগান আমি নিজে ও ঊর্ধতন কর্মকর্তারা কয়েকবার পরিদর্শন করা করেছে। সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও তাকে দেওয়া হয়েছে। নিজের প্রচেষ্টায় এগিয়ে যেতে চায় শাহজাহান জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা