kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭। ২ মার্চ ২০২১। ১৭ রজব ১৪৪২

প্রচারে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীরা

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২৩ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:২৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রচারে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীরা

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানা এলাকায় নির্বাচনী সংঘাতে আনোয়ার জাহিদ তানভীর হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত ৪ নম্বর আসামি দীপনকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ ইসমাইল। ছবি : কালের কণ্ঠ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণার মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মহানগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীরা। হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন মামলার আসামি এসব সন্ত্রাসীই নির্বাচনের মাঠে সংঘাতে ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আবার কাউন্সিলর পদে এমন ছয়জন প্রার্থী রয়েছেন যাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে।

হত্যা মামলার আসামি কাউন্সিলর প্রার্থীরা প্রচারের মাঠেও দাপুটে ভূমিকায়। আবার খুনের মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিও জামিনে বেরিয়ে এসে প্রার্থীর সঙ্গে দাপুটে প্রচারণায় নেমেছেন। আর দাপুটেদের পাল্টাপাল্টি প্রচারের মধ্যেই ঘটছে ধারাবাহিক সংঘাতের ঘটনা। গত বুধবার এক দিনেই মহানগর পুলিশ তিনটি মামলা রেকর্ড করেছে। সে সঙ্গে চলছে দলীয় কার্যালয়, নির্বাচনী প্রচারণা ক্যাম্প ও গাড়ি ভাঙচুর এবং গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে প্রচারে নেমেছে। আবার কেউ কেউ নিজেকে আড়ালে রেখে প্রচারে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সংঘাত সৃষ্টিতে কলকাঠি নাড়ছে। নির্বাচনের মাঠ সংঘাতময় হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ কারাগার থেকে বেরিয়ে যাওয়া সন্ত্রাসী এবং বিদেশফেরত সন্ত্রাসীদের উপস্থিতি। মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা এমনটাই মনে করছেন।

নির্বাচনে সহিংসতা এড়াতে পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত পাওয়া সব কটি অভিযোগের ব্যাপারেই পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে।’

অস্ত্র মামলায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা চকবাজার এলাকার ত্রাস নূর মোস্তফা টিনু জামিনে বেরিয়ে এসেছে গত ১৮ জানুয়ারি। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরই সক্রিয় হয়ে উঠেছে নির্বাচনী প্রচারণায়। আবার দুবাই থেকে কিছুদিন আগে দেশে ফিরেছেন যুবলীগ ক্যাডার হেলাল আকবর বাবর। তাত্ক্ষণিক প্রকাশ্যে না এসে কিছুদিন ঢাকায় অবস্থান করেন তিনি। কয়েক সপ্তাহ আগে চট্টগ্রামে এসেই সক্রিয় হন স্থানীয় রাজনীতিতে। নিজে অন্তরালে থেকে অনুগতদের নানা দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন বলে নিশ্চিত করেছেন তাঁরই অনুগত একজন কর্মী। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও বাবরের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

জামিনে মুক্তি পাওয়া আরেক যুবলীগ ক্যাডার সাইফুল আলম লিমন প্রচারের মাঠে আছেন। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমি নৌকার পক্ষে প্রচারণায় আছি।’ দৃশ্যমান প্রচারণায় কম থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দলীয় নানা বিষয় থাকে; সক্রিয় হয়ে বেশি প্রচার চালালে অন্যদের গায়ে লাগে। এ কারণে কিছুটা নিভৃতে প্রচারণা চালাচ্ছি। এ ছাড়া একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার কারণেও কৌশলে প্রচারে অংশ নিতে হচ্ছে।’

ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত হত্যা মামলায় জামিন পেয়ে নির্বাচনী প্রচারের মাঠ গরম করে চলেছেন ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল হাসনাত মো. বেলালের অনুসারীদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে মাসুমের অনুসারীরা। এ কারণে খুলশী থানায় দুটি পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে। নির্বাচনী সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে দিদারুল আলম মাসুম বলেন, ‘আমরা প্রচার চালানোর সময় বেলালের অনুসারীরা হামলা চালিয়েছে।’

পাঠানটুলী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী ও পুলিশের একসময়ের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদের। তিনি ১২ জানুয়ারি রাতে নির্বাচনী প্রচারণার সময় আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুরের অনুসারী আজগর আলী বাবুলকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে কারাগারে গেছেন।  গত ১৮ মার্চ রাতে পাহাড়তলী থানার দক্ষিণ কাট্টলী এলাকায় নির্বাচনী প্রচারের সময় (করোনার কারণে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার আগে) আনোয়ার জাহিদ তানভীরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এই খুনের জন্য ওই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোরশেদ আকতার চৌধুরী তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ ইসমাইলকে দায়ী করেন।

তানভীর হত্যা মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। সেই অভিযোগপত্রভুক্ত ৪ নম্বর আসামি দীপন জামিনে মুক্তি পেয়ে এখন প্রার্থী মোহাম্মদ ইসমাইলের সঙ্গে দাপুটে প্রচার চালাচ্ছেন। খুনের মামলার আসামিকে সঙ্গে নিয়ে প্রচার চালানোর বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘দীপন আমার সঙ্গে থাকবে কেন? সে আমার সঙ্গে থাকে না।’ তবে কালের কণ্ঠ’র কাছে যে ছবি এসেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রার্থী মোহাম্মদ ইসমাইলের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে হাসিমুখে প্রচার চালাচ্ছেন দীপন।

মোহাম্মদ ইসমাইলের বিরুদ্ধে হত্যার হুমকি ও প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘হুমকির কারণে আমি চার-পাঁচ দিন প্রচারণা চালাতে পারিনি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দিয়েছি।’

চসিক নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ১৪১ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫৯ জনের বিরুদ্ধেই খুন, অস্ত্রবাজি ও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। এঁদের মধ্যে খুনের মামলার আসামি রয়েছেন ছয়জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। অন্যজন বিএনপির নেতা।

খুনের মামলার আসামি প্রার্থীরা হলেন দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী তৌফিক আহমদ চৌধুরী, ৭ নম্বর পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মো. মোবারক আলী, ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আবুল হাসনাত মো. বেলাল, ২৮ নম্বর পাঠানটুলী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল কাদের এবং ১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সাবের আহমদ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা