kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

বিশ বছর পর নৌকার কুলাউড়া জয়

মাহফুজ শাকিল, কুলাউড়া থেকে   

১৬ জানুয়ারি, ২০২১ ২৩:১৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিশ বছর পর নৌকার কুলাউড়া জয়

সিপার উদ্দিন আহমদ

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ দুই দশক পর কুলাউড়ায় পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদ নৌকা প্রতীক নিয়ে তুমুল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে ১৫৩ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে চমক দেখালেন। তার প্রাপ্ত ভোট ৪ হাজার ৮৩৮টি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী শাজান মিয়া জগ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৪ হাজার ৬৮৫ ভোট। এছাড়া আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র মো. শফি আলম ইউনুছ নারকেল গাছ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ২ হাজার ৯৯৪ ভোট এবং বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ও সাবেক মেয়র কামাল উদ্দিন আহমদ জুনেদ ১৭৭৬ ভোট পেয়ে চতুর্থ হয়েছেন।

১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ নৌকা প্রতীক নিয়ে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর কোনো সংসদ নির্বাচন কিংবা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন এবং পৌরসভা নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের কোনো প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি খ্যাত কুলাউড়া নির্বাচনী এলাকা। 

দলীয় কোন্দল ও স্রোতের বিপরীতে বার বার নৌকার প্রতীকের ভরাডুবি হলেও এবারকার পৌরসভা নির্বাচনে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহবায়ক অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদকে নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে উন্নয়ন বঞ্চিত কুলাউড়া পৌরসভার মেয়র পদে নির্বাচিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিজয় উপহার দিলেন কুলাউড়া পৌরবাসী।
 
জানা যায়, ২০০১ সাল থেকে সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০১৫ সালের পৌরসভা নির্বাচন ও সর্বশেষ ২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদের নির্বাচনেও কুলাউড়ায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিজয় অধরাই ছিল।

সম্প্রতি হয়ে যাওয়া উপজেলার বরমচাল উপ-নির্বাচনেও চেয়ারম্যান পদে নৌকার প্রার্থীর ভরাডুবি ও দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে নৌকার প্রার্থী জামানত হারান। বিগত প্রায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র পদে নৌকা প্রতীক নিয়ে কোনো প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি। এবারের পৌর নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ও সাবেক দুইবারের মেয়র কামাল উদ্দিন আহমদ জুনেদ ও আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র শফি আলম ইউনুছ এবং জনপ্রিয় স্বতন্ত্র প্রার্থী শাজান মিয়ার মতো প্রার্থীকে পরাজিত করে শেষ হাসি হেঁসে মাইলফলক গড়লেন ক্লিন ইমেজের অধিকারী সাবেক ছাত্রনেতা নৌকার প্রার্থী অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদ।  

দলীয় নেতাকর্মী ও একাধিক সূত্রের দাবি দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে বিপরীত স্রোতে নৌকার বিজয় তলিয়ে যেত। 

দলীয় নেতাকর্মী ও বিভিন্ন তথ্যমতে, ১৯৯৬ সালে সংসদ নির্বাচনে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাংসদ সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হোন। এরপর ২০০১ সালে সুলতান মনসুর নৌকা প্রতীক নিয়েও স্বতন্ত্র প্রার্থী জনপ্রিয় ব্যক্তি এম এম শাহীনের কাছে পরাজিত হোন। ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী নওয়াব আলী আব্বাসের কাছে নৌকা প্রতীক নিয়ে আসা অ্যাড. আতাউর রহমান শামীমের ভরাডুবি হলে তিনি জামানত হারান। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে এ আসনে নৌকা প্রতীকের কোনো প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করায় জাতীয় পার্টির প্রার্থীর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুল মতিন এমপি নির্বাচিত হন। 

পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা নৌকার মনোনয়ন পাননি। এই নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত এমএম শাহীন বিকল্পধারায় যোগ দিয়ে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জোটগত কারণে নৌকা প্রতীক নিয়ে তিনিও আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাসিত ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ধানের শীষের প্রার্থী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদের কাছে পরাজিত হোন।

এদিকে বর্তমান উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম সফি আহমদ সলমান ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বরের পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের মনোনীত হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হোন বর্তমান মেয়র শফি আলম ইউনুছ। ওই নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী দ্বিতীয় অবস্থানে এবং নৌকার প্রার্থী তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্য রূপ নেয়। যার রেশ ২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার ওপর গিয়ে পড়ে। 
২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুব বিষয়ক সম্পাদক ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আসম কামরুল ইসলাম নৌকা প্রতীক নিয়েও তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমান সিনিয়র সহ সভাপতি বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী অধ্যক্ষ এ কে এম সফি আহমদ সলমানের কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হোন।

২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারির পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন চান বর্তমান মেয়র শফি আলম ইউনুছ, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহবায়ক ও জেলা শ্রমিক লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদ ও শফিউল আলম শফি। দলের কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড পৌর নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদকে মনোনীত করেন।  

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একাধিক নেতাকর্মীর দাবি, নিজেদের কোন্দল ও দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে অনেকটা কৌশলে বিদ্রোহীর পক্ষে কাজ করায় সাধারণ ভোটাররাও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এছাড়া অতীতে অনেকটা আনকোরা ও ভিন্ন দল থেকে আসা প্রার্থীকে এখানে নৌকা কিংবা মহাজোটের প্রার্থী মনোনীত করায় নেতাকর্মীরাও হতাশ হয়ে পড়েন। এসব কারণে স্রোতের বিপরীত প্রার্থীর জয় হয় আর সেই স্রোতে নৌকার বিজয় তলিয়ে যেত। তাই দীর্ঘ দুই দশক পর স্রোতের অনুকূলে এবং ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের কোনো প্রার্থীর বিজয় দেখাল পৌরবাসী। 

জানা যায়, তিন জন প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও মেয়র পদে অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদ রাজনৈতিক ক্লিন ইমেজ এবং কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে অধিক পরিচিত। দলীয় কর্মকান্ডের পাশাপাশি ক্রীড়া ও সামাজিক অঙ্গনে জনপ্রিয়। তিনি ক্রিকেট প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (সিপিএ) আহবায়ক, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক, সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহবায়ক, সাপ্তাহিক কুলাউড়া সংলাপ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক, ভাটেরা স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ, বাংলাদেশ স্কাউটস মৌলভীবাজার জেলা রোভার’র সহকারী কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি দীর্ঘদিন থেকে শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কুলাউড়া উপজেলা শ্রমিক লীগের যুগ্ম আহবায়ক, জেলা শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

এক প্রতিক্রিয়ায় সিপার উদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পৌরবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, পরিবর্তন, উন্নয়ন, পরিকল্পিত নিরাপদ নগরায়ন এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে নৌকা প্রতীকের এই বিজয় কুলাউড়া পৌরসভার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। মাস্টারপ্লান করে পৌরবাসীর উন্নয়ন করব। স্বাধীনতা সৌধ প্রাঙ্গণকে আধুনিকায়ন, পথচারীরা নিরাপদে চলাচলের জন্য মূল সড়ক থেকে ফুটপাত উঁচু করব, আউটারে রেল লাইনের পাশের খাল খনন করে বিনোদনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।

বর্তমানে পৌরসভার সম্মুখসহ পৌর এলাকার অসংখ্য স্থানে সামান্য বৃষ্টিতে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে জলাবদ্ধতা নিরসন, শিশুদের বিনোদনের জন্য শিশুপার্ক, যানজট নিরসনে বিকল্প সড়ক নির্মাণসহ পৌরবাসির নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জীবনমান উন্নয়নে প্রতিটি ওয়ার্ডের মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে একটি আধুনিক পৌরসভা প্রতিষ্ঠা করাই আমার চ্যালেঞ্জ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা