kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ ফাল্গুন ১৪২৭। ৯ মার্চ ২০২১। ২৪ রজব ১৪৪২

নরসিংদী পৌর নির্বাচন

হত্যার আসামি বাদ নতুন প্রার্থী নৌকার

হায়দার আলী ও মনিরুজ্জামান    

১৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০২:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হত্যার আসামি বাদ নতুন প্রার্থী নৌকার

আমজাদ হোসেন বাচ্চু

নরসিংদী পৌর নির্বাচনে নতুন করে প্রার্থী দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেন হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি আশরাফ হোসেন সরকারকে বাদ দিয়ে সেখানে প্রার্থী করা হয়েছে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন বাচ্চুকে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে মনোনয়নে এই পরিবর্তন আনে আওয়ামী লীগ।

বুধবার রাতে স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভায় আশরাফ হোসেন সরকারকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেন হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় তিনি লিখিত জবানবন্দিও দিয়েছেন। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ায় গতকাল কালের কণ্ঠে ‘হত্যা মামলার আসামি হলেন নৌকার প্রার্থী’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আশরাফ হোসেন সরকারকে মনোনয়ন দেওয়ার এ ঘটনার পর গতকাল আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে এই মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে চিঠি দেয় নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগ, পৌর আওয়ামী লীগসহ অন্য অঙ্গসংগঠনগুলো। চিঠিতে তারা তৃণমূলের সিদ্ধান্ত বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের ছোট ভাই বর্তমান মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. কামরুজ্জামানকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানায়। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, জনপ্রিয় নেতা ছিলেন লোকমান হোসেন, নরসিংদীর উন্নয়নে যাঁর বিশাল ভূমিকা। জামায়াত-বিএনপির অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের এই জনপ্রিয় নেতার হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি কিভাবে পৌর নির্বাচনে মনোনয়ন পান তা তাঁদের বোধগম্য নয়। তাঁরা বলছেন, যিনি একাধিক মামলার আসামি, দলীয় কর্মকাণ্ডে যাঁর এক যুগ ধরে সম্পর্ক নেই, সেই ব্যক্তির মনোনয়ন দলীয় নেতাকর্মীসহ তৃণমূলের সমর্থকরা মেনে নিতে পারছেন না। নেতাকর্মীদের দাবি, বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে ভুল তথ্য দিয়ে এই মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, জেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে তিনজন প্রার্থীর নাম পাঠানো হয় কেন্দ্রে। এই তিন নামের মধ্যে এক নম্বরে ছিলেন নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল। তালিকায় দুই নম্বরে ছিলেন শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন বাচ্চু, তিন নম্বরে ছিলেন শহর আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান। কিন্তু আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মকাণ্ডে যাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই, যিনি দলের কোনো পদেও নেই দীর্ঘদিন, সেই বিতর্কিত ব্যক্তি নৌকার মনোনয়ন পাওয়ায় দলের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আশরাফ হোসেন সরকারের মনোনয়ন বাতিল করে দলের যোগ্য এবং তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী দেওয়ার জন্য দলের সভাপতির কাছে আবেদন জানান তাঁরা।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলছেন, তাঁরা মনেপ্রাণে আওয়ামী লীগ করেন। তাঁরা একজন জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতার হত্যা মাশলার চার্জশিটভুক্ত আসামির জন্য মানুষের কাছে ভোট চাইতে যাবেন কোন মুখে? দলের সভাপতি যেন বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে লোকমানের ভাই বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামানকে মনোনয়ন দেন।

লোকমান হত্যা মামলা : ২০১১ সালের ১ নভেম্বর পৌর মেয়র লোকমান হোসেনকে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ হত্যার ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই বর্তমান মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান কামরুল বাদী হয়ে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা করেন। ওই ঘটনায় আশরাফ হোসেন সরকারকে গ্রেপ্তার করা হলে আদালতে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মন্ডল আট মাস তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ২৪ জুন সালাহউদ্দিনসহ এজাহারভুক্ত ১১ আসামিকে বাদ দিয়ে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। তাঁদের মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত তিনজন এবং হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে ৯ জন আসামির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এজাহারভুক্ত তিন নম্বর আসামি শহর আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ মোবারক হোসেন, দুই নম্বর আসামি নরসিংদী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আবদুল মতিন সরকার, তাঁর ছোট ভাই শহর যুবলীগের সাবেক সভাপতি আশরাফ হোসেন সরকারসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে বলা হয়, নাজমুল হাসান ওরফে কিলার শরীফ সরাসরি হত্যাকাণ্ড ঘটান। হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করে মোবারক হোসেন ওরফে মোবা, আশরাফুল ইসলাম সরকার, আবদুল মতিন সরকার, হাজি ফারুক ও শাহিন মিয়ার হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পীরজাদা কাজী মো. আলী বলেন, ‘লোকমান হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। সেই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে আমি এখনো দায়িত্ব পালন করছি। এখন সেই আমি কী করে লোকমান হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি আশরাফ হোসেন সরকারের জন্য মানুষের কাছে ভোট চাইতে যাব? তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এ ঘটনায় আমাদের ধিক্কার দিচ্ছে। কোনোভাবেই মেনে নিচ্ছে না। আশরাফের মনোনয়ন বাতিল করে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানিয়ে নেত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। আশা করছি আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের চাওয়া তিনি পূরণ করবেন।’

নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন বাচ্চু বলেন, ‘আশরাফ হোসেন সরকারের মতো একজন ব্যক্তিকে নৌকা প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ায় আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা হতবাক এবং ক্ষুব্ধ। তাঁর এই মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আমরা কেন্দ্রে চিঠি দিয়েছি। শুধুু হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি নন, তিনি গত ১০ বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগের কোনো দলীয় পদে নেই। কোনো কর্মসূচিতেও তাঁকে দেখা যায়নি।’

জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান শামীম নেওয়াজ বলেন, ‘আমার ভাইকে যিনি হত্যা করলেন, আদালতে স্বীকারোক্তিও দিলেন, চার্জশিটও হলো, সেই তিনি এখন নৌকা প্রতীক পেলেন। আর আমি জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়ে তাঁর জন্য ভোট চাইতে হবে! আমাদের নেত্রী নিশ্চয়ই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন।’

জেলা শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শুধু লোকমান হত্যার আসামিই নন, একাধিক মামলার আসামি আশরাফ সরকার। তিনি ১০ বছর ধরে দলের সঙ্গে নেই। এমন ব্যক্তিকে মেনে নিতে পারি না। আমরা নিশ্চিত বঙ্গবন্ধুর কন্যা এমন একজন ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিতে পারেন না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা