kalerkantho

সোমবার। ৪ মাঘ ১৪২৭। ১৮ জানুয়ারি ২০২১। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নিজেদের উন্নয়নে ব্যস্ত কেডিএ

সংস্থাটি ব্যাংকে টাকা রেখে সুদ খাচ্ছে খুলনার মেয়র

কৌশিক দে, খুলনা    

১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০৩:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নিজেদের উন্নয়নে ব্যস্ত কেডিএ

খুলনার উন্নয়ন নয়, যেন নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে ব্যতিব্যস্ত সংস্থাটি। নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ, প্লট ভাগাভাগি, উন্নয়নকাজে গতিহীনতাসহ নানা কর্মকাণ্ডে বিতর্কিত হয়ে পড়েছে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)। সংস্থাটির এসব কর্মকাণ্ডে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও  জনপ্রতিনিধিরাও ভীষণ ক্ষুব্ধ। খুলনা অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানটি একরকম ‘মাকাল ফল’। অভিযোগ রয়েছে, দিনের পর দিন কেডিএ একটি বাণিজ্যিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থায় রূপ নিচ্ছে।

এদিকে সংস্থাটির ভেতরে শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাপটে স্বাভাবিক কাজকর্মও একরকম স্থবির। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সংস্থাটিতে পাঁচজন অস্থায়ী কর্মচারী নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

নাগরিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা বলেছেন, খুলনার উন্নয়নে কেডিএ কোনো ভূমিকাই রাখছে না। একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প বরাদ্দ এলেও তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষ যেমন ভোগান্তিতে পড়ছে, তেমনি ক্ষুণ্ন হচ্ছে সরকারের ভাবমূর্তি। 

জানা যায়, ১৯৬১ সালে খুলনার পরিকল্পিত উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে নানা অনিয়মে জড়িয়ে সংস্থাটি খুলনার পরিকল্পিত উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সচিব ড. মোহাম্মদ শাহানুল আলম, সিনিয়র বৈষয়িক কর্মকর্তা ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (অ. দা.) শামীম জেহাদ, নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত) মো. আরমান হোসেন—শীর্ষ এই তিন কর্মকর্তার দাপটে অনেকটাই অসহায় অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফলে প্রতিটি কাজে দেখা দেয় সমন্বয়হীনতা। সর্বশেষ সংস্থাটির পরিচালক (প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা) ড. মোহাম্মদ শাহানুর আলম পাঁচজন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আলিম উদ্দিন, মো. ইমানুল হোসেন, মো. কাওছার মাহমুদকে বৈষয়িক শাখায়, মো. আসাদুজ্জামানকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দপ্তর এবং মো. আসাদুল্লাহ সরকার স্থপতির দপ্তরে কাজ করবেন। অভিযোগ উঠেছে, কেডিএর চাকরি নীতিমালা লঙ্ঘন করে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে প্লট বিক্রি, কিস্তির সঙ্গে অতিরিক্ত সুদ আদায়, প্লটের টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রেখে প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের পর সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সম্প্রতি ৩২টি প্লট ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, এসব প্লটের চারটির গত ১০ জানুয়ারি রেজিস্ট্রেশনও শেষ হয়েছে।

কেডিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে নগরের পশ্চিম সিটি বাইপাস-সংলগ্ন আহসানাবাদ মৌজায় ৯০ একর জমিতে ‘ময়ূরী’ নামে একটি আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলে কেডিএ। এই আবাসন প্রকল্পে ৬৫৩টি প্লট রয়েছে। এর মধ্যে তিন কাঠার ৩৮৪ ও পাঁচ কাঠার প্লট ২৬৯টি। প্রকল্পের শুরুতে তিন কাঠা প্লটের প্রতি কাঠা ৯ লাখ টাকা এবং পাঁচ কাঠা প্লটের জন্য সাড়ে ৯ লাখ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়। কোটা অনুযায়ী লটারির মাধ্যমে এসব প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরই মধ্যে অনেকে ২৭ ও সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা পরিশোধ করে নির্ধারিত প্লট নিয়েছেন। তবে নানা কারণে আবেদন বাতিল হওয়ায় পাঁচ কাঠার ১৬টি ও তিন কাঠার ১৫টি প্লটের বরাদ্দ বাকি রয়েছে। গেল ২০ ডিসেম্বর এগুলোই মাত্র পাঁচ লাখ টাকা কাঠা হারে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বরাদ্দ দেয় কেডিএ। অথচ ভূমি উন্নয়ন ও প্রকল্পের কাজ এখন প্রায় ৭০ শতাংশ শেষে প্রতি কাঠা জমির বাজারদর দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। নীতিমালায় আগে দাখিল করা আবেদনকারীরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্লট পাবেন বলা হলেও তা মানা হয়নি। আবার দুই ক্যাটাগরির ৬৫৩টি প্লটের মধ্যে বিক্রি করা ৬২১টির একটিও রেজিস্ট্রেশন না হলেও ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া প্লটগুলোর রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

কালের কণ্ঠ’র কাছে আসা পাঁচ কাঠা প্লট বরাদ্দের তালিকায় উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গ্লোরিয়া ঝর্ণা, কেডিএর সদ্যোবিদায়ি চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আবদুল মুকিম সরকার, সাবেক চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহমেদুল কবীর, কেডিএর পরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহানুর আলম, পরিচালক এস্টেট মো. ছাদেকুর রহমান ও সহকারী প্রকৌশলী মুনতাসীর মামুন। তালিকায় রয়েছেন একাধিক সচিব ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও। তিন কাঠার প্লট পাওয়া থেকে বাদ যাননি কেডিএর অফিস সহকারী, অঙ্কনবিদ, মসজিদের ইমাম, বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি, এমনকি পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তাকর্মীও। অবশ্য এই ব্যক্তিরা তিনজন মিলে তিন কাঠার প্লট পেয়েছেন। কেডিএর বোর্ড সদস্য আকরাম হোসেন বলেন, ‘বোর্ডসভায় আলোচনার সুযোগ কোথায়। আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব, সচিবের পিএস, এপিএসের নামে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, ‘সোনাডাঙ্গা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়, নিরালা, মুহগুন্নী ও ফুলবাড়ীগেট আবাসিক এলাকা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলেছে কেডিএ। ওই এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্যানিটেশন ও বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। বরং সরকারি খাল-নালা দখল করা হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতে এসব এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘২০১৩ সালে একনেকে পাস হওয়া খুলনার শিপইয়ার্ড চার লেন সড়ক, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-বাইপাস সড়ক বাস্তবায়ন করা হয়নি। শিপইয়ার্ড সড়কের প্রায় ৯৯ কোটি টাকার ব্যয় বেড়ে এখন ২৬৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ময়ূরী আবাসিক এলাকার প্লটদাতাদের কাছ থেকে চক্রবৃদ্ধি সুদ আদায় করা হয়েছে। সংস্থাটি ব্যাংকে টাকা রেখে সুদ খাওয়ায় ব্যস্ত।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা