kalerkantho

সোমবার। ৪ মাঘ ১৪২৭। ১৮ জানুয়ারি ২০২১। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

চাঁদপুরে ব্যাংক কর্মকর্তার সুদের কারবার সঙ্গে আরো কিছু!

চাঁদপুর প্রতিনিধি   

১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০১:০৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চাঁদপুরে ব্যাংক কর্মকর্তার সুদের কারবার সঙ্গে আরো কিছু!

ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মাঈনুদ্দীন

চাঁদপুরে জনতা ব্যাংক লিমিটেডের এক শাখার সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী গ্রাহকদের হয়রানি ও ব্যাংক ঋণের আড়ালে সুদের কারবার করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত এই কর্মকর্তা হচ্ছেন- জনতা ব্যাংক লিমিটেড চাঁদপুর অঞ্চলের সিনিয়র অফিসার মো. মাঈনুদ্দীন। তিনি বর্তমানে চাঁদপুর শহরের চেয়ারম্যানঘাটা কো-অপারেটিভ শাখায় কর্মরত আছেন। 

সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে জনতা ব্যাংক লিমিটেডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্তে নেমেছেন। সর্বশেষ গত ১০ জানুয়ারি রবিবার ঘটনার তদন্তে দুই সদস্যের একটি দল চাঁদপুরে আসেন। ওই দলের সদস্যরা হলেন- জনতা ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ের এসপিও মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান এবং এজিএম মো. আক্তার হোসেন। 

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আলেয়া আক্তার (ছদ্মনাম) একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করছেন। জনতা ব্যাংক লিমিটেড চাঁদপুর কো-অপারেটিভ শাখার একাউন্ট থেকে তিনি বেতন উত্তোলন করেন। সে সুবাদে প্রতি মাসে বেতনের টাকা উত্তোলন করতে গেলে ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মো. মাঈনুদ্দীনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে ওই স্কুল শিক্ষিকার বেতনের বিপরিতে ঋণ নেওয়া প্রয়োজন পড়ে। বিষয়টি নিয়ে সিনিয়র অফিসার মো. মাঈনুদ্দীনের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। 
এসময় মো. মাইনুদ্দিন ঋণ দেওয়ার জন্য শিক্ষিকার কাছ বিভিন্ন কাগজপত্র নেন। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে ঋণ তুলে দেবেন বলে ওই শিক্ষিকার ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি, ৩০০ টাকার ৩ ফর্দ নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প এবং অলিখিত দুইটি চেক নেন। এসবের বিনিময়ে এক লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। তার বিনিময়ে নিয়ম আনুযায়ী বেতনের একটি অংশ কেটে নেওয়ার কথা থাকলেও ধূর্ত মো. মাঈনুদ্দীন একেক মাসে একেক রকম টাকা হাতিয়ে নেন। অর্থাৎ কোনো মাসে ৫ হাজার টাকা আবার কোনো মাসে ১০ হাজার টাকার কিস্তি নেন। এভাবে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেন ওই শিক্ষিকা। কিন্তু ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মাঈনুদ্দীন আরো ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা দাবি করেন।

পরে এ বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী শিক্ষিকার মুক্তিযোদ্ধা বাবা। অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, ওই শিক্ষিকা পরে জানতে পারেন ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মাইনুদ্দিন ব্যাংক থেকে ঋণ না দিয়ে তার ব্যক্তিগত টাকা প্রতি মাসে ১০% সুদের বিনিময়ে দেন। বিষয়টি জানার পর অভিযোগকারী গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর তার কাছে থাকা উক্ত চেক এবং স্ট্যাম্প হারিয়ে গেছে মর্মে চাঁদপুর মডেল থানায় একটি জিডি করে একটি স্থানীয় পত্রিকায় হারানো বিজ্ঞপ্তি দেন।

অভিযোগকারী তার অভিযোগে আরো উল্লেখ করেন, ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মাঈনুদ্দীন নিয়মিত তার মেয়ের বাসায় এসে বাকি টাকার জন্য চাপ প্রয়োগ ও বিভিন্ন ধরনের কু-প্রস্তাব দেন। যেমন, লঞ্চের কেবিনে করে ঢাকা যাওয়ার প্রস্তাব, খালি বাসায় অপকর্ম করার জন্য এমন সব অনৈতিক প্রস্তাবও দেন। এতে করে তার মেয়ের সংসার ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। শুধু তাই নয় ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মাঈনুদ্দীন শুধু তার মেয়ে নয়, অন্যান্য শিক্ষিকাদেরও কুপ্রস্তাব দিয়ে হয়রানি করছেন। এতেই শেষ নয়, বিগত দিনে তার মোটরবাইকে প্রেস সাঁটানো স্টিকার মেরে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতেন। ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মাঈনুদ্দীনের এসব কর্মকাণ্ড চাঁদপুরে এরিয়া অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অবহিত আছেন।

অবশ্য এই বিষয়ে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর বিকেল ৩টায় চাঁদপুর এরিয়ার ডিজিএম-এর কক্ষে অভিযোগের বিষয়ে সমঝোতার জন্য অভিযোগকারীকে ডাকা হয়। সেই সময় ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মাঈনুদ্দীন কর্তৃক গৃহীত দুটি চেকের পাতার মধ্যে একটি ও ৩ ফর্দ স্ট্যাম্প ডিজিএম এর নিকট জমা দেন। ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মাইনুদ্দিন কর্তৃক গৃহীত অপর চেকের পাতাটি ফেরত প্রদান না করায় এবং অভিযোগকারীর মেয়ের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার না করায় সমঝোতা হয়নি।

খোঁজ জানা যায়, এর আগেও নারীঘটিত বিষয়ে মো. মাঈনুদ্দীনকে শাহরাস্তি উপজেলার জনতা ব্যাংক লিমিটেডের সূচীপাড়ায় শাখায় বদলি করা হয়েছিল। এছাড়াও বিপোনীবাগ শাখার ভল্টের টাকা চুরির অভিযোগে তাকে জনতা ব্যাংক ছেঙ্গারচর শাখায় বদলি করে। সবশেষ সে তদবির করে চাঁদপুরে এসে আবারো অভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এমনকি চেয়ারম্যানঘাটা কো-অপারেটিভ শাখায় কোনো গ্রাহক আসলে তাকে বিভিন্ন মাল্টিপারপাসে পাঠিয়ে দেন। এছাড়া তিনি ব্যাংকের গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে সুকৌশলে নিজে সুদের ব্যবসায় শুরু করেন বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। 

এদিকে, গত রবিবার দুপুর ৩টায় তদন্তকারী দলের দুই কর্মকর্তা জনতা ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ের এসপিও মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান এবং এজিএম মো. আক্তার হোসেন চেয়ারম্যানঘাটা কো-অপারেটিভ শাখায় আসেন। এই সময় ভুক্তভোগী আরো কয়েকজন নারী গ্রাহক মো. মাঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে মৌখিক অভিযোগ করেন। এমন গুরুতর অভিযোগের বিষয়গুলো আমলে নেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।

অভিযোগের বিষয়ে জনতা ব্যাংক লিমিটেড চাঁদপুর কো-অপারেটিভ শাখার সিনিয়র অফিসার মো. মাঈনুদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি জানান, এটা এমন কিছুই না। আমি ওই শিক্ষিকাকে টাকা ধার দিয়েছি। বিষয়টি এখন সমঝোতার চেষ্টা চলছে। আর অন্যদের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন তিনি।

জনতা ব্যাংক লিমিটেড চাঁদপুর কোপারেটিভ শাখার ম্যানেজার কে এম ফকরুল ইসলাম এই বিষয়ে বলেন, বিষয়টি সমাধান হয়েছে। সবাই সবার অভিযোগ উঠিয়ে নিয়েছে। মাঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে মৌখিক অভিযোগ দিতে আরো কয়েকজন শিক্ষিকা এসেছে এই ব্যাপারে তিনি বলেন, তারা আসছিল। কিন্তু লিখিত অভিযোগ দিতে চাননি। তাই ওই বিষয়টি আর বাড়েনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা