kalerkantho

রবিবার। ২২ ফাল্গুন ১৪২৭। ৭ মার্চ ২০২১। ২২ রজব ১৪৪২

চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন

আ. লীগের দ্রোহে ঘি ঢালতে চায় বিএনপি

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৩ জানুয়ারি, ২০২১ ০২:৫৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আ. লীগের দ্রোহে ঘি ঢালতে চায় বিএনপি

চট্টগ্রাম নগরে ৪০টি সাধারণ ওয়ার্ড। এর মধ্যে ৩৬টিতেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের ‘চক্ষুশূল’ বিএনপির কোনো প্রার্থী নন। ভোটের মাঠে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরাই। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে চান বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা। এ নিয়ে কৌশলী ভূমিকা নিয়েছে বিএনপি। এদিকে আগামী ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন সামনে রেখে মেয়র, সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীদের গণসংযোগ-প্রচারণায় উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে নগরী। ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই প্রচারণার সঙ্গে বিভিন্ন প্রার্থীর অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ, সংঘর্ষ, বাধা, পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে ফেলাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে।

আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও বিদ্রোহী  প্রার্থীদের পোস্টার-ব্যানারসহ নানা প্রচারপত্রে প্রধান সড়ক, উপসড়ক ও অলিগলি ছেয়ে গেলেও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা এ ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে। তবে ভোটারদের কাছে যেতে দলটির নেতাকর্মীরা নানা কৌশল নিচ্ছেন।

বেশির ভাগ ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের শোডাউন চলছে। নির্বাচনী মাঠে কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। এদিকে আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, নগরের রামপুর ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক কাউন্সিলর এরশাদউল্লাহ ও গোসালডাঙ্গা ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলর সাইফুল আলম শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ শুরু করছেন। এখনো ৩৪টি সাধারণ ও ১৩টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকায় দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা বিপাকে পড়েছেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কঠোর নির্দেশনা না মেনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা মাঠে থাকায় অনেক ওয়ার্ডে দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা কোণঠাসা। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর প্রচারণায় শুধু দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী থাকার কথা থাকলেও সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থীরাও যুক্ত থাকছেন।

এদিকে বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা কিছুটা বেকাদায় থাকলেও বিএনপিতে প্রায় ওয়ার্ডে একক প্রার্থী থাকায় দলটি সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচনে ৪০ সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৯টি এবং ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মধ্যে ১২টিতে বিএনপি সমর্থিত একক প্রার্থী রয়েছেন। তবে এসব ওয়ার্ডে একক প্রার্থী থাকলেও গণসংযোগ ও প্রচারণায় লোকসমাগম কম। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, বিভিন্ন ওয়ার্ডে তাঁদের প্রার্থী ও অনুসারী-সমর্থকদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার পাশাপাশি হামলা করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির কয়েকজন নেতা জানান, আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ও বিদ্রোহীরা এলাকায় শোডাউন করে প্রচারণা চালালেও বিএনপি নেতারা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। নানা প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে দল সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ী করতে নীরবে ভোটারদের কাছে গিয়ে মন জয়ের চেষ্টা করছেন।

মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু বলেন, ‘সিটি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিএনপি বিভিন্ন অভিযোগ করছে। বিএনপির প্রার্থীরা মাঠে আছেন, তাঁরা আমাদের প্রার্থীদের মতো প্রচারণা চালাচ্ছেন। হুমকি-ধমকি, পোস্টার-ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এগুলো বিএনপির অপপ্রচার।’ দলীয় প্রার্থীদের শোডাউনের ব্যাপারে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ও দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা যেখানে গণসংযোগে যাচ্ছেন, সেখানে সাধারণ লোকজনের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এতেই প্রমাণিত হয় আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা।

একই কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শফিকুল ইসলাম ফারুক ও চন্দন ধর বলেন, দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর বাইরে যাঁরা নির্বাচন (কাউন্সিলর পদে) করছেন, তাঁদের কেউ আওয়ামী লীগের নন। আমরা সবাই কাজ করছি দল মনোনীত মেয়র ও সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের জন্য। এটা নগর থেকে একেবারে ইউনিট পর্যন্ত দল ও সহযোগী সংগঠনের সব নেতাকর্মীকে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে।

পাঠানটুলী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী সাবেক কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম বাহাদুর বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থীর অনুসারীরা ভোটারদের নানা হুমকি দিচ্ছেন। ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। এলাকায় আমার জনপ্রিয়তা থাকলেও প্রচারণায় বিভিন্নভাবে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।’

দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী গাজী শফিউল আজিমের পাশাপাশি সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক কাউন্সিলর তৌফিক আহমদ চৌধুরী প্রচারণা চালাচ্ছেন। শফিউলের অনুসারী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, গত শুক্রবার দলের মেয়র প্রার্থীর প্রচারণার সময় মাঠ অনেকটাই ছিল তৌফিকের অনুসারীদের দখলে।

একই পরিস্থিতি নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে। যেখানে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরী যাচ্ছেন, সেখানে দল সমর্থিত প্রার্থী থাকার কথা থাকলেও বিদ্রোহী প্রার্থীরা শোডাউন করছেন। অন্যদিকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে শুধু দলের একক কাউন্সিলর প্রার্থী থাকছেন।

দলের কাউন্সিলর প্রার্থীরা মাঠে কম দেখা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চসিক নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও দলটির দক্ষিণ জেলা শাখার আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান বলেন, ‘প্রার্থীদের সবাই তো গণসংযোগ-প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে প্রার্থীরা স্থানীয়ভাবে খুব চাপের মধ্যে আছেন। গত রাতে (সোমবার) পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডে প্রার্থী ও সমর্থকদের ওপর হামলা হয়েছে। এর আগে মোহরা ওয়ার্ডে আমাদের কর্মীদের ওপর হামলা করে উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় পেশিশক্তি দিয়ে প্রচারে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।’

নির্বাচিত হলে ব্যবসাবান্ধব নগরী গড়ে তুলব : আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল

আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেছেন, ‘উন্নয়নের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামকে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন। আপনাদের ভোটে ও দোয়ায় মেয়র নির্বাচিত হলে সব শ্রেণির প্রতিনিধির পরামর্শক্রমে ব্যবসাবান্ধব নগরী গড়ে তুলব। শেখ হাসিনার স্বপ্নের চট্টগ্রাম গড়তে সবাই নৌকা প্রতীকে ভোট দিন।’ গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচনী গণসংযোগকালে বিভিন্ন স্থানে পথসভায় বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

নগরের পশ্চিম ষোলশহর, শুলকবহর ও চকবাজার ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগের সময় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, নোমান আল মাহমুদ, মো. বেলাল উদ্দিন, ফরিদ মাহমুদ, মো. মোবারক আলী, মোরশেদ আলম, সায়েদ গোলাম হায়দার মিন্টু, জেসমিন পারভীন জেসী, রুমকি সেনগুপ্ত প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাচিত হলে বিশেষায়িত করোনা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করব : বিএনপির প্রার্থী ডা. শাহাদাত

বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। জনগণের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিমুক্ত রাখাই আমাদের কাছে মুখ্য। তাই চট্টগ্রামবাসীর নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত একটি শহরের জন্য আমরা জনগণের দল হিসেবে জনগণের পাশে আছি। আমি মেয়র নির্বাচিত হলে ইনশাআল্লাহ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রামে একটি আধুনিক বিশেষায়িত করোনা হাসপাতাল ও একটি ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করব।’ গতকাল দুপুরে নগরের ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চেয়ে গণসংযোগকালে তিনি এসব কথা বলেন।

পাহাড়তলী আমবাগান জনতা ব্যাংকের সামনে থেকে গণসংযোগ শুরু করে ফ্লোরাপাস রোড, সর্দারনগর, ঝাউতলা বাজার, ঝাউতলা কলোনি, ওয়্যারলেস মোড় হয়ে তিনি সেগুনবাগান এলাকায় এসে পথসভায় মিলিত হন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এস কে হুদা তোতন, শফিকুর রহমান স্বপন, ইয়াছিন চৌধুরী লিটন, জাহাঙ্গীর আলম দুলাল, মনজুর আলম চৌধুরী মনজু, মো. কামরুল ইসলাম, জাহিদ মাস্টার, এস এম আজাদ, ছখিনা বেগম প্রমুখ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা